

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে বাংলাদেশের চলমান আলোচনা ও ভবিষ্যৎ ঋণ কর্মসূচিতে বাধা হতে পারে ভর্তুকিনীতি। সংস্থাটি দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও অন্যান্য খাতে সরকারি ভর্তুকি ধাপে ধাপে কমিয়ে আনার সুপারিশ করে আসছে।
কিন্তু ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সরকার ভর্তুকি ও প্রণোদনা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়েছে প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা। এতে একদিকে আইএমএফের সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে নতুন করে ৬.৫ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য ঋণ কর্মসূচির আলোচনাও জটিল হয়ে উঠছে বলে কেউ কেউ মনে করছেন।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি ও প্রণোদনা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে এক লাখ ২৬ হাজার ১২৫ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল প্রায় এক লাখ পাঁচ হাজার কোটি টাকা।
বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি করেছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সারের ভর্তুকি। কৃষি ভর্তুকি ২৭ হাজার কোটি টাকা অপরিবর্তিত রাখা হলেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের উচ্চ ব্যয়, এলএনজি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি এবং জ্বালানি খাতের আর্থিক চাপ সামগ্রিক ভর্তুকি ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে।
অর্থ বিভাগের একাধিক সূত্র জানায়, ১২ থেকে ১৬ জুলাই ঢাকায় সফর করা আইএমএফ প্রতিনিধিদল সরকারের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকে ভর্তুকি বাড়ানোর বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বিশেষ করে নতুন বাজেটে ভর্তুকি বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে তারা পূর্ববর্তী সংস্কার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মন্তব্য করেছে। আইএমএফের মতে, বাংলাদেশ যে কাঠামোগত সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তার অন্যতম প্রধান উপাদান ছিল ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা।
বাংলাদেশ বর্তমানে আইএমএফের বিদ্যমান কর্মসূচির আওতায় রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং খাত সংস্কার, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো ও জ্বালানি খাতে বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আইএমএফের দৃষ্টিতে ভর্তুকি কমানো এসব সংস্কারের কেন্দ্রীয় অংশ। সংস্থাটির যুক্তি হলো, দীর্ঘ মেয়াদে বড় আকারের সর্বজনীন ভর্তুকি বাজেট ঘাটতি বাড়ায়, সরকারি ঋণের চাপ বৃদ্ধি করে ও উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য অর্থের সংকট তৈরি করে।
আইএমএফ মনে করে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য ধাপে ধাপে বাস্তব ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হলে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির প্রয়োজন কমবে। একই সঙ্গে সর্বজনীন ভর্তুকির পরিবর্তে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করলে সরকারি অর্থের ব্যবহার আরো কার্যকর হবে। সংস্থাটির মতে, এতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ভর্তুকি কমানো ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। দেশে মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম অস্থির। এ অবস্থায় বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানির দাম বাড়ানো হলে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে, কৃষি খাতের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরো বাড়তে পারে। সরকারের যুক্তি হলো, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে হঠাৎ মূল্য সমন্বয় করলে শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যেতে পারে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্প, কৃষি এবং নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আপাতত ভর্তুকি বহাল রাখা ছাড়া সরকারের সামনে কার্যকর বিকল্প নেই।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বর্তমান তিন বছরের ঋণ কর্মসূচির বিভিন্ন অসম্পূর্ণ শর্ত নিয়ে আলোচনা চললেও একই সময় সরকার নতুন করে প্রায় ৬.৫ বিলিয়ন ডলারের একটি ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে দর-কষাকষি করছে। তবে নতুন কর্মসূচিতে যেতে হলে আগের সংস্কার বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে হবে বলে সংস্থাটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। বিশেষ করে ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতা এবং ব্যাংকিং খাত সংস্কারে অগ্রগতি না হলে নতুন কর্মসূচির অনুমোদন বিলম্বিত হতে পারে।
বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, ‘টেক্সটাইল ও স্পিনিং খাত বর্তমানে কঠিন সময় পার করছে। জ্বালানি ভর্তুকি কমিয়ে দাম বাড়ানো হলে উৎপাদন ব্যয় আরো বেড়ে যাবে, যা রপ্তানি খাতের জন্য নতুন চাপ তৈরি করবে।’
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী (পারভেজ) বলেন, ‘শিল্প খাত এখনো উচ্চ সুদহার, জ্বালানি সংকট এবং উৎপাদন ব্যয়ের চাপে রয়েছে। এই মুহূর্তে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনস্বার্থ রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের আস্থা বজায় রাখার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা।
