

সময়ের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাজেটের চেনা ধরন বদলে ফেলার মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন বা ঐতিহ্যগত খাতেই সীমাবদ্ধ না থেকে, মেধা ও প্রযুক্তিনির্ভর সৃজনশীল অর্থনীতিকে মূলধারা বিবেচনা করা হচ্ছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে দেশের জন্য একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
সূত্র জানায়, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্টার্টআপ ও ফ্রিল্যান্সিং খাতের বিকাশ, তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েশন, চারুকলা, ডিজাইন এবং ফ্যাশন শিল্পের মতো সৃজনশীল খাতগুলোকে কর রেয়াতসহ বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে শুধু শ্রমনির্ভর অর্থনীতির ওপর ভরসা না করে ‘নলেজ-বেজ্ড’ বা জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলাই এই রূপবদলের মূল লক্ষ্য।
জানা গেছে, জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান একেবারে তলানির দিকে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, শিক্ষা, উদ্ভাবন এবং তথ্যপ্রযুক্তিতে অগ্রগতির ওপর নির্ভর করে কোনো দেশের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে ওঠে। আর এই গাঁথুনিগুলোতে বাংলাদেশ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতির কাঠামো দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কৃষি ও শিল্পনির্ভর অর্থনীতির পাশাপাশি এখন গুরুত্ব পাচ্ছে সৃজনশীল অর্থনীতি, যেখানে মানব মেধা, সংস্কৃতি, উদ্ভাবন ও সৃজনশীল দক্ষতাই মূল সম্পদ।
জানা গেছে, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে সৃজনশীল অর্থনীতির উন্নয়নকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা দেশের অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তরুণ জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনা কাজে লাগানোর একটি কৌশলগত উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
জানা গেছে, বিএনপি সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে সৃজনশীল অর্থনীতির মাধ্যমে জিডিপিতে ১.৫ শতাংশ অবদান এবং এ খাতে প্রায় পাঁচ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। গতানুগতিক শিল্প ও সেবা নির্ভর অর্থনীতির গণ্ডি পেরিয়ে এবার সৃজনশীলতাকে নতুন অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে দাঁড় করানোর শক্ত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলডিসি-পরবর্তী বাস্তবতায় উচ্চ আয়ের দেশে উন্নীত হতে হলে শুধু সস্তা শ্রমনির্ভর উৎপাদন যথেষ্ট নয়, বরং উদ্ভাবন, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও মেধাভিত্তিক শিল্পই হতে পারে ভবিষ্যৎ অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি।
জানা গেছে, সৃজনশীল অর্থনীতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ উদ্যোগ। এ কারণে গত ১১ মে বাজেট নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সৃজনশীল অর্থনীতির বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এ বিষয়ে একটি পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেনটেশনও দিয়েছে অর্থ বিভাগ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সৃজনশীল অর্থনীতিকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি, সফটওয়্যার ও অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট, গ্রাফিক ডিজাইন, চলচ্চিত্র, ডিজিটাল মিডিয়া, অ্যানিমেশন, গেমিং, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যভিত্তিক শিল্প, ফ্যাশন, বিজ্ঞাপন ও কনটেন্ট ক্রিয়েশন খাতের জন্য পৃথক প্রণোদনা কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া সৃজনশীল পণ্য ও ডিজিটাল সেবা রপ্তানিতে নগদ সহায়তা, তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্পসুদে ঋণ, স্টার্টআপ সহায়তা এবং বিশেষ ভেঞ্চার ক্যাপিটাল তহবিল গঠনের প্রস্তাব থাকতে পারে।
একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সৃজনশীল দক্ষতা উন্নয়ন, ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সহযোগিতা এবং দেশজুড়ে ‘ক্রিয়েটিভ হাব’ বা ‘ইনোভেশন জোন’ গড়ে তোলার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। অর্থবিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ইতোমধ্যে সৃজনশীল শিল্প বড় একটি অবস্থান তৈরি করেছে। বর্তমানে বিশ্বে সৃজনশীল অর্থনীতির বার্ষিক আয় ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি এবং প্রায় ৫ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান এ খাতের সঙ্গে যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপিতে এ খাতের অবদান প্রায় ৪.২ শতাংশ, ফিলিপাইনে ৭.৩৪ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ায় ৭.২৮ শতাংশ। ফলে বাংলাদেশের জন্যও এ খাতে বড় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, সৃজনশীল অর্থনীতিতে উত্তরণ সময়োপযোগী হলেও সফল বাস্তবায়নের জন্য শক্তিশালী নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন। জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি থেকে সৃজনশীল অর্থনীতিতে উত্তরণ একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। শুধু গার্মেন্ট কিংবা প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল না থেকে রপ্তানি বাড়াতে বহুমুখী উদ্যোগ নিতে হবে। এ জন্য দক্ষতা উন্নয়ন এবং সৃজনশীল খাতে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
এদিকে প্রস্তাবিত বাজেটে ‘ক্রিয়েটেড ইন বাংলাদেশ’ নামে একটি জাতীয় ব্র্যান্ডিং উদ্যোগ চালুর কথাও রয়েছে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ফেস্টিভ্যাল, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের সৃজনশীল পণ্য ও সেবাকে তুলে ধরার পরিকল্পনা করছে সরকার। এ ছাড়া ‘বাংলাদেশ ক্রিয়েটিভ ডেভেলপমেন্ট অথরিটি’ নামে একটি বিশেষ সংস্থা গঠনের উদ্যোগও আলোচনায় রয়েছে। যা সৃজনশীল খাতের নীতি সমন্বয়, বিনিয়োগ সহায়তা, বাজার সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারে কাজ করবে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি বড় কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে এখনও মেধাস্বত্ব সুরক্ষার দুর্বলতা, পাইরেসি, কপিরাইট লঙ্ঘন, পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব এবং দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি রয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মানের স্টুডিও, অ্যানিমেশন ল্যাব, ডিজিটাল মনিটাইজেশন কাঠামো এবং কপিরাইট বাণিজ্য ব্যবস্থাও দুর্বল।
জানা গেছে, সৃজনশীল অর্থনীতি এমন একটি খাত যেখানে তুলনামূলক কম পুঁজিতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। বাংলাদেশের তরুণরা ইতোমধ্যে ফ্রিল্যান্সিং, সফটওয়্যার, গ্রাফিক ডিজাইন ও ডিজিটাল কনটেন্টে বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। এ খাতকে এগিয়ে নিতে হলে তিনটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের- উচ্চগতির ইন্টারনেট, আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ের সহজলভ্যতা এবং বৈশ্বিকমানের প্রশিক্ষণ।

