ঢাকা
৭ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
দুপুর ২:১৯
logo
প্রকাশিত : মে ৭, ২০২৬

মাছ শিকারিরাই মানুষ শিকারে

নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় মাছ শিকার করে জীবন কাটত শাকের মাঝির। একসময় দেখলেন, নদী বা সাগরে আগের মতো মাছ নেই। আয় গেল কমে। ২০০৭ সালের দিকে খেয়াল করলেন, বছর দুয়েক আগে শুরু হওয়া সমুদ্রপথে মানবপাচারের জুয়া খেলাটা বেশ জমে উঠেছে।

তাঁর চোখের সামনে দিয়েই মাছ ধরার ট্রলারে করে বিদেশে যাচ্ছে লোকজন। মাছ শিকারিরাই মানুষ শিকারেএকদিন পাচারচক্রের মূল হোতার তরফে শাকের মাঝির কাছে একটি লোভনীয় প্রস্তাব আসে—ট্রলারে একজন যাত্রী দিতে পারলেই মিলবে ২০ হাজার টাকা। শাকেরের চোখ কপালে ওঠার দশা। গভীর সমুদ্রে ঝড়ঝঞ্ঝার সঙ্গে লড়াই করে দিনের পর দিন জাল ফেলেও যে আয় হয় না, সেই টাকা মিলবে মাত্র একজন মানুষ জোগাড় করলেই।

এর পরই শুরু হয় শাকেরের আরেক জীবিকা—যাত্রী শিকার। সুখের জীবনের গল্প শুনিয়ে মগজ ধোলাই করে সহজেই রাজি করিয়ে ফেলতে থাকেন দরিদ্র বাঙালি ও রোহিঙ্গা তরুণদের।

কিছু সাফল্যের পর শুধু প্রলোভনেই সীমাবদ্ধ থাকে না এই পেশা, যুক্ত হয় অপহরণ। আরো বেশি যাত্রী শিকার, আরো বেশি আয়।

গড়ে ওঠে এক চক্র। প্রায় ১৯ বছরের ‘ক্যারিয়ারে’ এলাকায় এত বেশি প্রভাব পড়েছে যে, শাকেরকে এখন সবাই চেনে মানবপাচারের মাঝি নামে। এভাবে ধীরে ধীরে একজন সাধারণ জেলে থেকে হয়ে ওঠেন মানুষ শিকারি। কেজি দরে মাছ বিক্রির মতো মাথা দরে মানুষ বিক্রি শুরু হয় সাগরপারে।

গত ৮ এপ্রিল আন্দামান সাগরে প্রায় পৌনে ৩০০ যাত্রী নিয়ে ট্রলারডুবির পর কক্সবাজারে মানবপাচার ও অপহরণের ঘটনাগুলো নতুন করে আলোচনায় আসে।

মাসব্যাপী অনুসন্ধানকালে এসব অপকর্মের নাটের গুরুদের খুঁজে বের করা হয়। বেরিয়ে আসে অপহরণ-প্রলোভন, দালাল, ঘাট আর ট্র্যাজেডির পেছনের এক ভয়ংকর চক্র।

জানা গেছে, শুরুর দিকে বেশ কয়েক বছর ‘শান্তিপূর্ণভাবে’ মানবপাচারের মাধ্যমে বাজার তৈরি করে চক্রটি। মালয়েশিয়ায় পৌঁছানো কিছু যাত্রীর সফলতার গল্প বেশি বেশি প্রচার করে বাজারমূল্য বাড়ায় ওরা। তারপর যাত্রী বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্রলারের সংখ্যাও বাড়ে। কিন্তু বিভিন্ন সময় মাঝসাগরে ট্রলারডুবিতে অনেক মানুষের মৃত্যু বা নিখোঁজের ঘটনা স্থানীয়দের কিছুটা সচেতন করে তোলে। দেখা দেয় যাত্রীসংকট। আর তখনই ট্রলার পূর্ণ করতে প্রলোভনের সঙ্গে যুক্ত হয় অপহরণের ঘটনা।

দেশে-বিদেশে জিম্মি করে রেখে মুক্তিপণ আদায়ই এই চক্রের মূল উদ্দেশ্য। এই মরণযাত্রায় কেউ বিদেশে পৌঁছাতে পারলেও অনেকেই উধাও হয়ে যায় সমুদ্রে, আবার কেউ মারা যায় নির্যাতনে। এর পেছনে রয়েছে কয়েক স্তরের সংঘবদ্ধ মানবপাচার সিন্ডিকেট, যেখানে অপহরণকারী, দালাল, মাঝি, প্রবাসফেরত, মাদক কারবারি—সবাই মিলে গড়ে তুলেছে ‘মানুষ শিকারের চক্র’।

আমাদের অনুসন্ধানে মানবপাচার ও অপহরণ চক্রের ১৫ জনেরও বেশি হোতার বিস্তারিত তথ্য জানা গেছে। এদের মধ্যে বেশির ভাগই শাকের মাঝির মতো জেলে বা সাধারণ মাঝি থেকে মানুষ শিকারে জড়িয়ে পড়ে। অনেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকের বেশে এই অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে। আগে তারা এলাকায় মানুষের মগজ ধোলাই করে দালালি করে বেড়ালেও একসময় হয়ে ওঠে অপহরক।

অনুসন্ধানে টেকনাফ-উখিয়ার ১১টি পয়েন্ট বা ঘাটের নাম জানা গেছে, যেগুলো থেকে যাত্রা শুরু হয় এই মরণখেলার। এগুলো হলো— টেকনাফের কচ্ছপিয়া, সাবরাং মুণ্ডা ডেইল, মহেশখালীপাড়া, রাজারছড়া, তুলাতলী, হাবিবছড়া, নোয়াখালীপাড়ার জুম্মাপাড়া, হাজমপাড়া, শীলখালী, ইলিয়াস কোবরা ঘাট ও উখিয়ার ইনানী। বাহারছড়ার নোয়াখালীপাড়া, সাবরাং ও মহেশখালীপাড়া থেকে সবচেয়ে বেশি পাচার হয়।

অনুসন্ধানে এক ভয়াবহ তথ্য বেরিয়ে আসে একজন রোহিঙ্গা নাগরিক আবু তৈয়বের বয়ানে। একজন দালালের সঙ্গে খাতির জমিয়ে তাঁর মাধ্যমে গত মার্চে কথা হয় তৈয়বের সঙ্গে। তিনি অকপটে স্বীকার করেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তাঁরা কয়েকজন মিলে আনুমানিক এক লাখ ২০ হাজার মানুষকে মালয়েশিয়ায় পাচার করেছেন। বাহারছড়ার একটি ঘাট থেকে ছোট নৌকা নিয়ে গভীর সমুদ্রে বড় ট্রলারে তোলা হতো।

গত ৯ এপ্রিল আন্দামান সাগরে ভাসমান ৯ জন ব্যক্তিকে উদ্ধারের পর কোস্ট গার্ড জানিয়েছে, তাঁরা অবৈধভাবে সমুদ্রপথে ট্রলারে করে মালয়েশিয়ায় যাচ্ছিলেন। ৮ এপ্রিল আন্দামান সাগরে ট্রলারটি ডুবে আড়াই শর বেশি মানুষ নিখোঁজ হয়। উদ্ধার ব্যক্তিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর ছয়জন মানব পাচারকারী চক্রের সদস্য বলে স্বীকার করেন। তাঁদের আসামি করে টেকনাফ থানায় একটি মামলা হয়। ‘এফভি তানজিনা সুলতানা’ নামের ওই বোটে (মাছধরা ট্রলার) অন্তত ২৬০ জন যাত্রী থাকার কথা জানায় কোস্ট গার্ড।

এক লাখ টাকায় ভাড়া খাটেন সৈয়দ মাঝি

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই ট্রলারের মাঝি ছিলেন সৈয়দ আলম ওরফে সৈয়দ মাঝি। উদ্ধার ৯ জনের মধ্যে তিনিও আছেন। বর্তমানে তিনি কক্সবাজার জেলা কারাগারে বন্দি। ভুক্তভোগী যাত্রী রোহিঙ্গা নাগরিক মো. রফিক একাধিকবার ট্রলারের মাঝি হিসেবে সৈয়দ মাঝির কথা উল্লেখ করেন। (গত সোমবার এই অনুসন্ধানের প্রথম পর্বে রফিকের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য আছে)

তথ্যের সত্যতা অনুসন্ধানে আমরা সৈয়দ মাঝির সঙ্গে সাক্ষাতের সিদ্ধান্ত নিই। সুযোগটি আসে গত ২৬ এপ্রিল। কারা কর্তৃপক্ষের সবুজ সংকেত পেয়ে আমরা বিকেল সোয়া ৪টার দিকে কারাগারে পৌঁছি। দর্শনার্থীকক্ষে সৈয়দ আলমের সঙ্গে প্রায় ৪০ মিনিট আলাপ হয়। বারবার প্রশ্নের পরও তিনি নিজেকে ট্রলারের যাত্রী বা ভুক্তভোগী বলে দাবি করেন। (সৈয়দ মাঝির সঙ্গে কারাগারে সাক্ষাতের বিস্তারিত পড়ুন পার্শ্ব প্রতিবেদনে)

কারাগারে সৈয়দ আলমের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমরা খুরুশকুল রাস্তার মাথায় অনেক খুঁজেও তাঁর বাড়ি খুঁজে পাইনি। এমনকি তিনি নিজেকে অটোরিকশাচালক দাবি করলেও এর সত্যতা পাওয়া যায়নি। অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে আমরা তাঁর বাবা আব্দুল গফফারের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করি। তখন তিনি দাবি করেন, তাঁর ছেলে সৈয়দ আলম রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। বাবা-ছেলের বক্তব্যের মধ্যে বিরাট গরমিল।

একটি গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রে জানা গেছে, এই সৈয়দ আলমই ডুবে যাওয়া ট্রলারটির মাঝি ছিলেন। এক লাখ টাকা ভাড়ায় তাঁকে এই কাজে যুক্ত করেন শাকের মাঝি। আর এতে তাঁর বড় ভাই নানা মাঝিও সম্পৃক্ত ছিলেন।

আমাদের অনুসন্ধানের মধ্যেই গত ৩ মে আসামিদের দুই দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চালায় পুলিশ। টেকনাফ মডেল থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে তিনি তদন্তের স্বার্থে কিছু বলতে রাজি হননি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই সনজীব কান্তি নাথ বলেন, দুই দিনের রিমান্ডে আসামিদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তবে কেউই নিজেদের দোষ স্বীকার করেনি; বরং একে অপরের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করেছে। তবু জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে, যা তদন্তের স্বার্থে এই মুহূর্তে প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

নাম প্রকাশে অপারগ তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, রিমান্ডে অন্য আসামিরা সৈয়দ আলম মাঝিকে দোষারোপ করেছেন। এই চক্রের সঙ্গে কক্সবাজারের ফয়েজ ওরফে নানা মাঝির সম্পৃক্ততা রয়েছে। নানা মাঝি ও সৈয়দ মাঝি আপন ভাই বলেও তদন্তে জানা গেছে। নানা মাঝি মানবপাচার কার্যক্রম সমন্বয় করে। ডুবে যাওয়া ট্রলারের প্রধান সমন্বয়ক হিসেবেও তাঁর ভূমিকা রয়েছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, তাঁদের আরেক ভাই নজরুল ইসলামও এই চক্রে জড়িত। তাঁকে এরই মধ্যে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

অবশ্য একটি গোয়েন্দা সূত্র তাদের অনুসন্ধানে জাকারিয়া নামে সৈয়দ মাঝির এক ভাই এই চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য পেয়েছে বলে জানিয়েছে।

টেকনাফকেন্দ্রিক চক্রের মূল হোতা হিসেবে বিভিন্ন সূত্র থেকে নানা মাঝির বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। কক্সবাজার সদরে তাঁর বাড়ি হলেও তিনি টেকনাফের দক্ষিণ মুহুরীপাড়ায় ভাড়া বাসায় থাকেন বলে জানা গেছে। পাচারচক্রের নাটের গুরু মালয়েশিয়াপ্রবাসী মৌলভি আব্দুর রহিমের হয়ে তিনি এখানে সবকিছু দেখভাল করেন। তাঁর দায়িত্ব হলো ট্রলারের যাত্রী সংগ্রহ, ট্রলার প্রস্তুত করা এবং সরাসরি মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে পাচার কার্যক্রম পরিচালনা। সূত্র বলছে, গত ৮ এপ্রিল এই ট্রলারডুবির আগে একটি ট্রলার ভর্তি মানুষ মালয়েশিয়া-থাইল্যান্ডে পৌঁছে দিয়ে আবার বাংলাদেশে ফিরে আসেন নানা মাঝি।

সরেজমিন অনুসন্ধানে রফিক নামে একজন রোহিঙ্গা নাগরিকের নামও পাওয়া যায়। তিনি এখন মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন। টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ পূর্ব বাজারপাড়ার বাসিন্দা জাহিদ হোসেনের ছেলে জিয়াউর রহমানকে (১৭) পাচারের ঘটনা অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমরা রফিক নামটি খুঁজে পাই।

জিয়াউরের ভাই আব্দুর রহমান বলেন, ৮ এপ্রিল ট্রলার ডুবে গেলেও ১২ এপ্রিল সকাল ৮টা ২৬ মিনিটে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপে মিসডকল আসে। ৮টা ৪০ মিনিটে কলব্যাক করলে ওই ব্যক্তি নিজেকে রফিক পরিচয় দিয়ে জিয়াউরের ছবি চান। ছবি পাঠানোর পর ওই দিনই বিকেল ৪টা ৪৯ মিনিটে আবার কল আসে আব্দুর রহমানের নম্বরে। রফিক তখন রহমানকে জানান, জিয়াউরকে পেতে হলে সাড়ে তিন লাখ টাকা দিতে হবে।

এই কথার পর জিয়ার পরিবারের সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। কেননা, তারা জানে যে ৮ এপ্রিল জিয়াউরকে বহনকারী ট্রলারটি ডুবে গেছে। অবশ্য এরপর থেকে রফিক আর তাদের ফোন রিসিভ করেনি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রফিক মূলত রোহিঙ্গা নাগরিক, বাড়ি মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মুংডুতে। একসময় নাফ নদ পাড়ি দিয়ে টেকনাফে চলে আসেন, পরে মালয়েশিয়ায় গিয়ে মানবপাচার চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে যান।

রুট আবিষ্কার ও শুরু যেভাবে

মাছ শিকারিরাই মানুষ শিকারেকখন কিভাবে শত শত মানুষ নিয়ে সমুদ্রপথে এই মরণযাত্রা শুরু হয়েছিল, এই তথ্যের সন্ধান করতে গিয়ে পাওয়া গেল মৌলভি আব্দুর রহিমের নাম। একসময় শাহপরীর দ্বীপ দক্ষিণপাড়ায় বাস করতেন তিনি। আদম ব্যবসায়ী হিসেবে এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিরা চেনেন তাঁকে। ২০০৫ সালের দিকে নিজেই একটি ট্রলারে করে কিছু মানুষ নিয়ে মালয়েশিয়ার পথে যাত্রা শুরু করেন। এতে সফলও হন। আবিষ্কার করেন সমুদ্রের সহজ রুট। রপ্ত করেন নানা কৌশল। এভাবে ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন সাগরপথে মানবপাচারের কেন্দ্রীয় চরিত্র।

জানা গেছে, কক্সবাজার থেকে মালয়েশিয়ার পথে ভয়ংকর সমুদ্রযাত্রার ঘটনা বাড়তে থাকে ২০১০ সাল থেকে। আর এটি প্রথম আলোচনায় আসে ২০১৫ সালে, থাইল্যান্ডের শংখলা প্রদেশের গহিন জঙ্গলে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের গণকবরের সন্ধান পাওয়ার পর। ওই ঘটনা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলকেও তাতিয়ে তোলে। এরপর কিছুদিন কমলেও কয়েক বছর ধরে অপহরণ ও মানবপাচারের ঘটনা বেড়ে গেছে।

আমরা খুঁজে বের করি আব্দুর রহিমের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সহযোগীকে। তাঁরা একসময় রহিমের সঙ্গে মিলে মানবপাচার নিয়ন্ত্রণ করলেও এখন স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন।

উখিয়ার জুম্মাপাড়ায় তেমনই একজনের সঙ্গে আলাপ হয়। এখন তিনি কৃষিকাজ করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘মৌলভি আব্দুর রহিম যখন দেশে অবস্থান করতেন, থাইল্যান্ডে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতাম আমি।’ তাঁর ভাষ্য, বেশির ভাগ সময় তাঁকে থাইল্যান্ডে অবস্থান করতে হতো। ট্রলারের যাত্রীদের থাইল্যান্ড উপকূল থেকে রিসিভ করে গহিন জঙ্গলে তাঁদের আস্তানায় নেওয়া হতো। মুক্তিপণের জন্য তাঁদের সেখানে জিম্মি রাখা হতো। গণকবর কাহিনির পর তিনি এই কাজ ছেড়ে দেশে ফিরে আসেন।

টেকনাফ শাহপরীর দ্বীপ মাঝেরপাড়ার জেলে নৌকাঘাটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল গফুর। পঞ্চাশোর্ধ্ব গফুরের মুখ থেকে শোনা গেল মৌলভি রহিম সম্পর্কে নানা তথ্য। গফুর বলেন, ‘২০০৪ সালের আগে থেকেই শাহপরীর দ্বীপ দক্ষিণপাড়ায় বাস করতেন রহিম। যখন এ এলাকায় মোবাইল ফোন খুব কম ছিল, তখন তাঁর হাতে তিন-চারটি মোবাইল দেখেছি। তখন তিনি হুন্ডি ব্যবসা করতেন। ২০০৫ সালে নিজে ট্রলার চালিয়ে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যান।’

গফুর আরো বলেন, ‘এর আগে টেকনাফে কোনো মানবপাচারের ঘটনা ছিল না। ২০১০ সালে মৌলভি রহিমের একটি মালয়েশিয়াগামী ট্রলার ডুবে অনেক বাংলাদেশি মারা যায়। টেকনাফে তাঁর এক স্ত্রী ছিল, যিনি রোহিঙ্গা নাগরিক। তখন থেকে তাঁর সিন্ডিকেট বড় হতে থাকে। সর্বশেষ ২০১২ সালে তাঁকে টেকনাফে দেখা গিয়েছিল। এখন শুনি, থাইল্যান্ডে দামি গাড়ি আর কয়েকজন বডিগার্ড নিয়ে চলাফেরা করেন তিনি।’

অনুসন্ধানে মৌলভি রহিমের চারজন শীর্ষ সহযোগীর নাম জানা গেছে। তাঁরা হলেন মো. আইয়ুব, নাইমুল, ইসমাইল ও রহিমের জেঠাতো ভাই ইলিয়াস। রহিমের সঙ্গে তাঁরাও ঘুরেফিরে থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াতে অবস্থান করে।

সূত্র জানায়, দেশে মৌলভি রহিমের রয়েছে বিশাল একটি নেটওয়ার্ক। প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেন মো. ফয়েজ ওরফে নানা মাঝি। সম্প্রতি তাঁর নাম বেশি শোনা যাচ্ছে। টেকনাফজুড়ে তাঁর শতাধিক সদস্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। এর বাইরে প্রলোভন দেখিয়ে এলাকার তরুণদের টেনে আনার কাজে সম্পৃক্ত আরো অনেকে।

অন্যদিকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ৩৩টি ক্যাম্পের প্রতিটিতে তিন-চারজন করে এজেন্ট রয়েছে এই চক্রের। তাদের নিয়ন্ত্রণ করেন সৈয়দ হোসেন নামের একজন রোহিঙ্গা।

ভয়ংকর অপহরক শাকের মাঝি

যাঁকে দিয়ে প্রতিবেদনের শুরু, সেই শাকের মাঝির বাড়ি টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের মুণ্ডা ডেইল এলাকায়। নিরক্ষর শাকের মাঝির মূল নাম শাকের আহমদ। বাবা কবির আহমদ কৃষিকাজ করেন আর ছেলে শাকের শৈশব থেকেই মাছ শিকারি। বয়স ৪৫ বছর।

সরেজমিন গেলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো শাকের মাঝির নাম বেশি উচ্চারণ করেছে। ৮ এপ্রিল ট্রলারডুবিতে নিখোঁজ অনেকেই তাঁর প্রলোভনের শিকার বলে অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১২ সালের দিকে ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়লেও আগে থেকেই মানবপাচারে যুক্ত এই শাকের। শুরুর দিকে তিনি এলাকা থেকে তরুণদের এনে ছোট নৌকায় তুলে ট্রলার পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার কাজ করতেন।

স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘শাকের মাঝি একসময় শান্ত স্বভাবের জেলে ছিল। কিন্তু ২০০১ সালে মিয়ানমারে একটি গরুবাহী ট্রলার ডাকাতির ঘটনায় জড়ানোর পর থেকেই তার মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বাড়তে থাকে। পরে ধীরে ধীরে মানবপাচার ও ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে।’

মাদক ব্যবসার বিস্তার যখন চরমে, তখন সরকার ইয়াবা কারবারিদের একটি তালিকা তৈরি করে। সেই তালিকায় শাকের মাঝির নামও অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০১৯ সালে সরকারের ডাকে সাড়া দিয়ে ১০২ জন ইয়াবা ব্যবসায়ীর সঙ্গে তিনিও আত্মসমর্পণ করেন এবং প্রায় দুই বছর কারাভোগ করেন। কারাগার থেকে বেরিয়ে আবার অপহরণচক্র ও মানবপাচারে জড়িয়ে পড়েন। অল্প সময়েই বিপুল অর্থের মালিক হয়ে ওঠেন তিনি।

সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, বর্তমানে মুণ্ডা ডেইল এলাকায় তাঁর রয়েছে দোতলা বিলাসবহুল বাড়ি, তিনটি নৌকা এবং প্রায় ৫০ লাখ টাকা মূল্যের জমি। স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব সম্পদের মূল্য কোটি টাকারও বেশি।

পুলিশ জানায়, শাকের মাঝির বিরুদ্ধে পাঁচটি ইয়াবা ও তিনটি মানবপাচারের মামলা রয়েছে। টেকনাফ থানার এসআই সনজীব কান্তি নাথ বলেন, ‘গত ১৩ এপ্রিল শাকের মাঝির দুটি নৌকা জব্দ করা হয়েছে। নৌকাগুলো মানবপাচারে ব্যবহৃত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।’

শাকের মাঝির থাবায় লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে টেকনাফের বহু পরিবার। তেমনই একটি পরিবার হলো টেকনাফের মাছ ব্যবসায়ী শামসুল আলম কাজলের। গত মার্চে তাঁর ছেলে সাদ কামালকে (২০) অপহরণ করেন শাকের। আরেক ছেলে সাইফুল ভাইকে খুঁজতে গিয়ে নিজেও রেংগুর বিল এলাকায় একটি গুদামে (বন্দিশালা) জিম্মি হয়ে যান। পরে দুজনকেই একসঙ্গে ট্রলারে করে থাইল্যান্ডে পাচার করে দেওয়া হয়।

কাজল জানান, থাইল্যান্ডের জঙ্গলে জিম্মি রেখে তাঁদের কাছে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ চান শাকের মাঝি। অনেক কষ্টে জোগাড় করে চার লাখ টাকা তাঁর হাতে তুলে দিলে সাদকে ছেড়ে দিয়ে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। আর নির্মম নির্যাতনে সাইফুল থাইল্যান্ডের বন্দিশালাতেই প্রাণ হারান। গত ১৭ এপ্রিল ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে মুষড়ে পড়ে গোটা পরিবার। এখন তাদের একটাই চাওয়া—অন্তত ছেলের মরদেহটা যেন দেখতে পায়।

এর আগে টেকনাফের রেংগুর বিলে অস্ত্রের মুখে তাঁর দুই ছেলেকে জিম্মি করে রাখে বলেও অভিযোগ করেন কাজল। তাঁর ভাষ্য, শাকেরকে অনেক অনুনয় করেও পার পাননি। টাকা জোগাড় করতে দেরি হওয়ায় তাঁর দুই ছেলেকে পাচার করে দেন।

গত ৮ এপ্রিলের ঘটনার পর গা ঢাকা দিলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইভে এসে শাকের মাঝি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি গরিব অসহায় ছেলেদের সহযোগিতা করেছি। আমি একজন জেলে। ইয়াবা ব্যবসার পর আত্মসমর্পণ করেছি এবং জেল খেটে এখন স্বাভাবিক জীবন যাপন করছি। কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তি নিজেদের লোকজনকে বাঁচাতে আমাদের ফাঁসানোর চেষ্টা করছে।’

হোসেনের টার্গেটে রোহিঙ্গা তরুণী

মানবপাচার ও অপহরণ চক্রটিতে রোহিঙ্গা নাগরিকদের টার্গেট করে যে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, সেটির নেতৃত্বে সৈয়দ হোসেন নামের একজন রোহিঙ্গা। অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৭ সাল থেকে স্থায়ীভাবে উখিয়ায় বসবাস করছেন তিনি। এর আগে নাফ নদ পাড়ি দিয়ে নিয়মিতই আসা-যাওয়ার মধ্যে ছিলেন। মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রাচিডং থানার শিলখালীর নাটমোড়াপাড়ায় তাঁর বাড়ি ছিল। তখন থেকে তিনি বাংলাদেশ রুটে মাদক কারবারে যুক্ত ছিলেন। রোহিঙ্গা হলেও ক্যাম্পের বদলে থাকেন এপিবিএন কক্সবাজারে হাউজিংয়ের পাশে একটি ভাড়া বাসায়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, উখিয়া ও টেকনাফে ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সৈয়দ হোসেনের অন্তত এক শ সদস্য সক্রিয়। একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে চলে তাঁদের কার্যক্রম। ভয়েস মেসেজেই আদান-প্রদান হয় যাবতীয় তথ্য। এই দলের সদস্যদের নজর থাকে রোহিঙ্গা নাগরিকদের মধ্যে অবিবাহিত তরুণীদের প্রতি।

অনুসন্ধান বলছে, খুচরা দালালদের নেতা হলেন এই সৈয়দ হোসেন। যে যেখান থেকেই প্রলোভনে হোক বা অপহরণ করে কাউকে তুলে নিয়ে আসে, তাকে হোসেনের কাছে বিক্রি করতে হয়। তারপর হোসেন আন্তর্জাতিক চক্রের প্রধান আবদুর রহিমের সঙ্গে যোগাযোগ করে ট্রলারভর্তি করে ভুক্তভোগীদের সমুদ্রের দিকে ঠেলে দেন।

আরো যত জেলে ও মাঝি

টেকনাফ ও উখিয়ার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে চক্রের অসংখ্য হোতার নাম জানা গেছে। আর এদের বেশির ভাগই একসময় ছিলেন জেলে বা নৌকার মাঝি। অর্থের লোভে তাঁরা নাম লিখিয়েছেন ভয়ংকর এই চক্রে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মানবপাচার ও অপহরণ সিন্ডিকেটের যে বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে, সেখানকার আলোচিত নাম আব্দুল আমিন ও মাহবুবুর রহমান ওরফে মাম্মা। তাঁরা দুজন সম্পর্কে জামাই-শ্বশুর। জানা গেছে, শ্বশুরই মাম্মাকে এই চক্রে যুক্ত করেন। মাম্মা একসময় কিশোর গ্যাংয়ের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। এলাকার কিশোরদের প্রলোভন দেখিয়ে পাচার করেন। অপহরণের ঘটনায়ও আছে তাঁর নাম।

সাবরাংয়ের বাসিন্দা ছৈয়দ আলম বলেন, জামাই-শ্বশুর মিলে এলাকার ফুলের মতো কিশোর ও তরুণদের নিয়ে গেছেন। আজ অনেক পরিবার নিঃস্ব। অনেক সন্তান এতিম হয়েছে। কিন্তু তাঁরা এখনো ধরা পড়ে না।

আরেক হোতা মো. তাহেরের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি প্রলোভন দেখিয়ে কিশোরদের নিয়ে ট্রলারে তুলে দেন। পরে থাইল্যান্ডে জিম্মি করে বিশাল অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করেন।

মাঝেরপাড়ার বাসিন্দা তারেকের বাবা বাদল বলেন, ‘আমার ছেলেকে জিম্মি করে তাহের তিন লাখ টাকা চায়। টাকা দিয়েও আমি ছেলেকে মুক্ত করতে পারিনি। এখন তাহেরকেও পাই না। আমার ছেলে বেঁচে আছে, নাকি মারা গেছে কিছুই জানি না।’

আরেক ঘটনায় নিহত রহমত উল্লাহর বাবা ছৈয়দ হোছাইন বলেন, ‘তাহেরই আমার ছেলেকে পাঠিয়েছিল। ট্রলার ডুবে মারা গেছে—এই কথা সে স্বীকারও করেছে। আমি গরিব মানুষ, ওদের বিরুদ্ধে মামলা করার সাহস ও অর্থ কোনোটাই নাই।’

তবে তাহের এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

টেকনাফ সদর ইউনিয়নের দক্ষিণ লম্বরীর বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম স্থানীয়দের কাছে পরিচিত শীর্ষ অপহরণকারী হিসেবে। টেকনাফে সংঘটিত বেশির ভাগ অপহরণের ঘটনায় তাঁর নাম উঠে আসে। তাঁর নেতৃত্বে প্রায় ২০ জন যুবকের একটি সংঘবদ্ধ চক্র বিভিন্ন স্থান থেকে অপরিচিত মানুষকে ধরে এনে মুক্তিপণের জন্য পাহাড়ি এলাকায় গড়ে তোলা তাঁর গোপন আস্তানায় আটকে রাখেন।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর তথ্য মতে, সাইফুলের বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা আছে। এর মধ্যে পাঁচটি অপহরণ, পাঁচটি মানবপাচার এবং বাকি তিনটি মাদক ও অস্ত্র সংক্রান্ত।

সাইফুলের নাম উল্লেখ করে উত্তরপাড়ার নিখোঁজ হারুনুর রশিদের বাবা জাফর আহমেদ বলেন, ‘দালাল সাইফুল আমার ছেলেটাকে নিয়ে মৌলভী শফিকের কাছে ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দিয়েছে। আমার ছেলে অপহরণের শিকার। ট্রলারে তোলার আগে আমরা সাইফুলকে চার লাখ টাকা দিয়েও ছেলেকে ফেরত পাইনি।’

সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদির ঘনিষ্ঠ আত্মীয় শামসুল আলম ওরফে শামীম (৩৮)। তিনিও ২০১৯ সালে ‘আলোর পথে’ ফেরার ঘোষণা দিয়ে আত্মসমর্পণকারী ১০২ জন ইয়াবা কারবারির একজন। ইয়াবা ছেড়ে পরে মানবপাচার ও অপহরণে নাম লেখান। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ইয়াবা ব্যবসায়ী ও মানবপাচারকারী হিসেবে তাঁর নাম রয়েছে।

স্থানীয় লোকজন জানায়, একসময় সাধারণ জেলে শামীম সাগর ও নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে প্রথমে মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েন। শাহপরীর দ্বীপের গোলারপাড়া চর ব্যবহার করে ছোট নৌকায় মানুষ পাচার এবং মায়ানমার থেকে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে সহায়তার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

শাহপরীর দ্বীপের পশ্চিমপাড়ার আজগর আলী ওরফে আজগর মাঝিও পেশায় একসময় জেলে ছিলেন। ২০০৫ সালে নৌকাযোগে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান তিনি। সেখানে প্রায় পাঁচ বছর শ্রমিক হিসেবে কাজ করার পর ২০১০ সালে মালয়েশিয়াগামী ট্রলারযাত্রা শুরু হলে পরিবারকেন্দ্রিক একটি মানবপাচার সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন তিনি।

জানা যায়, মানবপাচার কার্যক্রম সহজ করতে তিনি থাইল্যান্ডে বিয়ে করেন এবং সেই সংযোগ কাজে লাগিয়ে মালয়েশিয়ায় লোক পাঠানোর জন্য নিজস্ব ট্রলারও সংগ্রহ করেন। ২০১০ সালে তাঁর মাধ্যমে পাঠানো দুটি ট্রলার আন্দামান সাগরে ডুবে গেলে প্রায় ৭০ জন নিখোঁজ হয় বলে জানা যায়। পরে একসময় পাচার করা শ্রমিকদের থাইল্যান্ডে আটকে রেখে নিয়ন্ত্রণে রাখার অভিযোগ উঠলে তিনি মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন।

দেশে ফিরে আবারও জেলে হিসেবে মাছ শিকার শুরু করেন। তবে অল্প দিনেই তিনি আবার মানুষ শিকারে নেমে পড়েন। পুলিশ জানায়, আজগরের বিরুদ্ধে দুটি মানবপাচার মামলা এবং একটি মাদক মামলা রয়েছে।

আমাদের হাতে আসা ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, থাইল্যান্ডে অবস্থানরত কয়েকজন রোহিঙ্গা নিজেদের শাহপরীর দ্বীপের ‘আজগর পক্ষ’ থেকে মালয়েশিয়ায় যাওয়া বলে দাবি করেছেন। ভিডিও চিত্রে তাঁরা অভিযোগ করেন, সিন্ডিকেটের সদস্যরা তাঁদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে এবং প্রত্যেককে প্রায় দেড় লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আজগর আলী বলেন, ‘গত বছর পাঁচ-ছয়জন মানুষ পাঠিয়েছি, তবে এখন এসব করি না। এগুলো আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র।’ ভিডিওতে তাঁর মাধ্যমে পাচারের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি দাবি করেন, ‘আমি কাউকে পাঠালেও অন্য দালালরা আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়েছে। আমি এখনো মাছ ধরি।’

সাবরাং কচুবনিয়ার বাসিন্দা আজম উল্লাহ আলোচিত নজির আহমদ ডাকাতের ছোট ভাই। কাটাবনিয়া নৌঘাট ব্যবহার করে আজম উল্লাহ এবং তাঁর সিন্ডিকেট মানবপাচার করছে। তাঁর বিরুদ্ধে মাদক ও হত্যাসংক্রান্ত একাধিক মামলা রয়েছে।

এদিকে একই ঘটনায় সাদ্দাম হোসেন নামের একজনের নাম আসে। সাবরাং হারিয়াখালীতে তাঁর বাড়ি। অভিযোগ রয়েছে, ডুবে যাওয়া ট্রলারে মানুষ পাচারের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন।

শাহপরীর দ্বীপ কোনারপাড়ার বাসিন্দা ইসমাইলও (২৮) মাছ শিকার বাদ দিয়ে মানুষ শিকারে নেমে পড়েন। তাঁর সঙ্গে সক্রিয় রয়েছে একটি নারী সিন্ডিকেটও। গত ৮ এপ্রিলের ঘটনায় পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, তাঁর সিন্ডিকেটের মাধ্যমে রোকসানা নামের এক নারীকে পাচার করা হয়। পরে বিদেশ থেকে তাঁর পরিবারের কাছে ফোন করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। রোকসানার মা মমতাজ বেগম বলেন, ‘এক মাস পর থাইল্যান্ড থেকে ফোন করে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে না পারায় এখনো মেয়েকে ফেরত আনতে পারিনি।’

চক্রে ছদ্মবেশে সিএনজিচালক নারী-শিশুরাও

অপহরণ ও মানবপাচার চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন পেশায় মিশে গেছেন। কক্সবাজার শহরে সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক থেকে শুরু করে টেকনাফ, উখিয়ায় সাধারণ মুদি দোকানি—সন্দেহের বাইরে নেই কেউ।

অনুসন্ধানে পাওয়া ভয়াবহ তথ্যটি হলো, কক্সবাজারের কলাতলী মোড় থেকে মেরিন ড্রাইভ হয়ে টেকনাফগামী সিএনজিচালিত অটোরিকশাগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে নতুন কেউ এই পথে একা বা দুজন গেলে ফাঁদে পড়ার আশঙ্কা বেশি। এ ধরনের বেশ কিছু ঘটনার তথ্যও পাওয়া গেছে।

উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পে দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে কাজ করছেন একটি উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম। তাঁর সঙ্গে আলাপে ধারণা পাওয়া গেল রাত ৯টা বাজলেই কিভাবে ভয়ংকর সড়কে পরিণত হয় মেরিন ড্রাইভ। তাঁর ভাষ্য, মেরিন ড্রাইভের পার্শ্ববর্তী বাড়িগুলোতে অতিথিরাও নিরাপদ নন। সন্ধ্যার পর অপহরণচক্রের সদস্যদের আনাগোনা বেড়ে যায়। এই কাজে যুক্ত করা হয়েছে শিশু-কিশোর এবং কিছু নারীকেও। এদের কাজ হলো টার্গেট ব্যক্তির গতিবিধি বোঝা এবং তাকে চোখে চোখে রাখা। অপরিচিত কাউকে দেখলেই এদের মিশন শুরু হয়ে যায়। ওই ব্যক্তির সঙ্গে খাতির জমানোর চেষ্টা চলে। তারপর সুযোগ বুঝে চক্রের অন্য সদস্যদের জানিয়ে তাকে চোখের পলকেই তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘এখানে একটি বহুল প্রচলিত কথা আছে, এক মাথার দাম ৫০ হাজার টাকা। আবার অনেক সময় ট্রলার ছাড়ার দিন ঘনিয়ে এলে ওরা পাগলের মতো হয়ে যায়। যাকে-তাকে ধরে নিয়ে ট্রলারে উঠিয়ে দেয়।’

সুত্র: কালের কণ্ঠ

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram