

সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বর্তমানে হাম (measles) সংক্রমণ নিয়ে একটি গুরুতর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মার্চের মাঝামাঝি থেকে এখন পর্যন্ত ৩২ হাজারেরও বেশি সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং ২৫০ জনেরও বেশি মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। মৃতদের বড় অংশই শিশু বলে জানানো হচ্ছে। এর ফলে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চাপ ও অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। ঢাকার সংক্রামক রোগ হাসপাতালসহ অনেক চিকিৎসাকেন্দ্রে রোগীর চাপ এত বেশি যে, অনেক ক্ষেত্রে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, টিকা সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনায় বিঘ্ন ঘটার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর টিকা সংগ্রহ ব্যবস্থায় কিছু সমস্যা দেখা দেয়। এরপর ২০২৫ সালে ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনার পরিবর্তে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ইউনিসেফ এই পরিবর্তনের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংস্থাটির বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করেছিলেন বলেও দাবি করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দরপত্র প্রক্রিয়ায় দেরি হওয়ায় টিকার সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে ২০২৫ সালে প্রায় ৫৯ শতাংশ শিশু হামের টিকা পেয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও পরে এই তথ্য সরকারি ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় বলে দাবি করা হয়।
এছাড়া জানানো হয়েছে, বছরের শুরুতে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী রোহিঙ্গা শিবিরে প্রথম প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় এবং পরে তা ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। এখন পর্যন্ত ৫৮টিরও বেশি জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়েছে এবং ২১ হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ২৩ এপ্রিল সতর্ক করে জানিয়েছে, এই রোগটি প্রতিবেশী মিয়ানমার ও ভারতের দিকে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
আইইডিসিআরের সাবেক উপদেষ্টা মোহাম্মদ মুশতাক হোসেন বলেছেন, ‘টিকার ঘাটতির বাইরেও বাংলাদেশের হামের সংকট দেশের গভীর কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন।’ তিনি সরকারকে জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘এটি ইতিমধ্যেই একটি জরুরি অবস্থা। তাহলে আনুষ্ঠানিকভাবে জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে দেরি কেন?’
নতুন সরকার এপ্রিলে আবার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনা শুরু করেছে। ৫ এপ্রিল ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের জরুরি টিকা দেওয়া শুরু হয়। ২০ এপ্রিল সারা দেশে এই অভিযান ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
তবে রোগ নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক বেনজির আহমেদ সতর্ক করে বলেছেন, এই গতিতে টিকা দিলে মহামারি দ্রুত থামবে না। তিনি বলেছেন, ‘এই হারে টিকা দিলে এখনই সংক্রমণ কমবে না।’
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য সায়েদুর রহমান বলেছেন, পুরনো টিকা কেনার ব্যবস্থাটি পরিবর্তন করা দরকার ছিল কারণ এটি জরুরি পরিস্থিতির জন্য তৈরি আইনি ধারার উপর নির্ভর করত। তিনি বলেছেন, ‘হামের মতো সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুদের মৃত্যু হৃদয়বিদারক। এটি একটি মানবিক বিপর্যয়। যে পরিবারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের প্রতি আমার গভীর সমবেদনা।’
সূত্র: সায়েন্স ম্যাগাজিন

