

বিদেশ সফর শেষে দেশে ফিরে ম্যালেরিয়া আক্রান্ত হয়ে সম্প্রতি মৃত্যুবরণ করেছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমান। প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তার এমন মৃত্যু সবাইকে নাড়া দিয়েছে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আমলারা জানিয়েছেন, বিদেশ ভ্রমণ, বিশেষ করে রোগব্যাধির ঝুঁকি আছে এমন দেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আরও সতর্ক হতে হবে। সফর সংশ্লিষ্ট দেশের স্বাস্থ্য প্রোটোকল মানার ক্ষেত্রে কোনো গাফিলতি করা যাবে না। সফর শেষে দেশে ফেরার পর কোনো স্বাস্থ্য জটিলতা দেখে দিলেই নিতে হবে চিকিৎসকের পরামর্শ।
এমনকি সরকারের পক্ষ থেকে এসব বিষয় মনে করিয়ে দিয়ে সরকারের একটি নির্দেশনা জারি করা উচিত বলেও মনে করছেন তারা।
প্রশাসনের কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, নিজের সুরক্ষার জন্যই কর্মকর্তাদের নিজেকে সতর্ক ও দায়িত্বশীল হতে হবে। তবেই ভবিষ্যতে আরও এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়ানো সম্ভব হবে।
গত ১৭ এপ্রিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমান রাজধানীর বেসরকারি এক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। মাহবুবুর রহমান ১৩তম বিসিএস শুল্ক ও আবগারি ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা ছিলেন। তার বয়স হয়েছিল ৫৮ বছর। রক্তের প্লাটিলেট কমে যাওয়ায় গত ১৩ এপ্রিল তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। পরে তার ম্যালেরিয়া শনাক্ত হয়।
বিদেশ ভ্রমণ, বিশেষ করে রোগব্যাধির ঝুঁকি আছে এমন দেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আরও সতর্ক হতে হবে। সফর সংশ্লিষ্ট দেশের স্বাস্থ্য প্রোটোকল মানার ক্ষেত্রে কোনো গাফিলতি করা যাবে না। সফর শেষে দেশে ফেরার পর কোনো স্বাস্থ্য জটিলতা দেখে দিলেই নিতে হবে চিকিৎসকের পরামর্শ।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে জানা যায়, গত ২৬ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত ক্যামেরুনে অনুষ্ঠিত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ১৪তম মিনিস্ট্রিয়াল কনফারেন্সে যোগ দিতে গিয়েছিলেন মাহবুবুর রহমান। সফর শেষে দেশে ফেরার পর তিনি মৃদু জ্বরে আক্রান্ত হন। পরে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
সরকারের ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির এপিডেমিওলজিস্ট মশফিকুর রহমান বিটু সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, আফ্রিকার ম্যালেরিয়া প্যারাসাইট অত্যন্ত শক্তিশালী ও ভিন্ন ধরনের। যে কারণে সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও বাণিজ্য সচিবকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আমলা মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া বলেন, বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের নিজের স্বার্থেই নিয়ম-কানুনগুলো মানতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ দেশের ক্ষেত্রে ভ্যাকসিন কিংবা কোনো রোগের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের গাফিলতি করা যাবে না। কর্মকর্তাকে নিজেকেই এটা নিশ্চিত করতে হবে, এটা তো সরকার নিশ্চিত করতে পারবে না।
তিনি বলেন, এ বিষয়ে কর্মকর্তাদের সচেতন করতে সরকার একটি নির্দেশনা জারি করতে পারে। বিদেশ সফরের আগে কোন কোন বিষয় বাধ্যতামূলক অনুসরণ করতে হবে, সে বিষয়ে তাগাদা দেওয়া যেতে হবে। স্বাস্থ্য প্রোটোকলগুলো মানার ক্ষেত্রে যাতে কারও গাফিলতির সুযোগ না থাকে। ভাবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে। প্রয়োজনে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ দেশ ভ্রমণের আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
কোনো ঝুঁকিপূর্ণ দেশ ভ্রমণের পর কর্মকর্তাদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। দেশে ফিরে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে। আর কোনো ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে যেতে হবে। তবেই এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা এড়ানো সম্ভব হবে, যোগ করেন প্রশাসন বিষয়ক বহু গ্রন্থের রচয়িতা ফিরোজ মিয়া।
প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব এবং পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানি সম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের প্রধান (অতিরিক্ত সচিব) মো. বাবুল মিঞা বলেন, বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে আইনে সুরক্ষার কোনো ঘাটতি নেই। একজন কর্মকর্তা যখন কোনো দেশে যাবেন, সে দেশের তো প্রোটেকল আছে। সেগুলো মেনেই তো যেতে হয়।
বাণিজ্য সচিবের এভাবে মৃত্যুর বিষয়টি আশ্চার্যন্বিত করেছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, আমাদের নিজেদের নিজেকে নিরাপদ করার জন্য সতর্ক থাকতে হবে। যে দেশে যাচ্ছি, সেই দেশের প্রোটোকল যাতে ঠিকভাবে মেনে চলি। ব্যক্তিক সচেতনতার কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হবে।
বিদেশ ভ্রমণে মানতে হয় যেসব নিয়ম
২০১১ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণের অনুমতি ও অনুসরণীয় আনুষঙ্গিক বিষয়াদি নিয়ে একটি পরিপত্র জারি করা হয়। এ পরিপত্র অনুযায়ী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, সচিব, অতিরিক্ত সচিব, বিভাগীয় কমিশনার, ডিসি-এসপি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার প্রধানসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন বাধ্যতামূলক। এছাড়া ৩ থেকে ৫ নম্বর গ্রেডের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর অনুমোদন এবং ৬ থেকে ৯ নম্বর গ্রেডের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে সচিব বা মুখ্য সচিব অনুমোদন দেবেন।
বিশেষ ক্ষেত্রে জাতীয় সংসদের স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, নির্বাচন কমিশনার, দুদক চেয়ারম্যান, সিএজি ও পিএসসি চেয়ারম্যান তাদের অধীনস্থদের ভ্রমণ অনুমোদন দিতে পারবেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরও নিজ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের ভ্রমণ অনুমোদন দেবেন।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সিটি মেয়র ও পার্বত্য অঞ্চলের চেয়ারম্যানদের ভ্রমণে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন লাগবে। অন্যদিকে পৌর মেয়র, কমিশনার ও ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে মন্ত্রী বা বিভাগীয় কমিশনার অনুমোদন দেবেন।
পরিপত্রে বলা হয়েছে, বিদেশ ভ্রমণের প্রস্তাব পাঠানোর সময় ভ্রমণের উদ্দেশ্য, সময়কাল, ব্যয়ের উৎস, গত এক বছরের ভ্রমণ বিবরণীসহ বিস্তারিত তথ্য দিতে হবে। ঋণ চুক্তির আওতায় ভ্রমণ হলে এর সুফলও উল্লেখ করতে হবে।
এছাড়া দলগত ভ্রমণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তার অনুমোদনই সবার জন্য প্রযোজ্য হবে। স্বামী বা স্ত্রী সঙ্গে গেলে তাদের জন্যও একই অনুমোদন প্রয়োজন, তবে এ ক্ষেত্রে সরকারি অর্থ ব্যয় করা যাবে না।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ বছরে সর্বোচ্চ চারবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। একই সঙ্গে মন্ত্রী ও সচিবের একসঙ্গে বিদেশ সফর সাধারণত নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
দেশভেদে মানতে হয় স্বাস্থ্য সংক্রান্ত নিয়ম
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদেশ সফরে সরকারি কর্মকর্তা বা সাধারণ ভ্রমণকারীদের জন্য স্বাস্থ্য প্রস্তুতি দেশভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে। আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার কিছু দেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে ইয়েলো ফিভার টিকা বাধ্যতামূলক হলেও ম্যালেরিয়ার জন্য কোনো টিকা সনদ প্রয়োজন হয় না; বরং প্রতিরোধমূলক ওষুধ ও ব্যক্তিগত সুরক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়। এছাড়া পোলিওসহ কিছু সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট দেশের জন্য অতিরিক্ত টিকা বা সনদ লাগতে পারে। ফলে গন্তব্য দেশের স্বাস্থ্যবিধি ও আন্তর্জাতিক নির্দেশনা অনুসরণ করেই ভ্রমণ প্রস্তুতি নিতে হয়।
স্বাস্থ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আফ্রিকার দেশ ক্যামেরুনে ভ্রমণের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটিতে প্রবেশের জন্য ইয়েলো ফিভার টিকা বাধ্যতামূলক এবং এর আন্তর্জাতিক সনদ (ইয়েলো কার্ড) দেখাতে হয়। পাশাপাশি ক্যামেরুন ম্যালেরিয়া ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হওয়ায় ভ্রমণকারীদের প্রতিরোধমূলক ওষুধ গ্রহণ ও মশা থেকে সুরক্ষা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এছাড়া হেপাটাইটিস, টাইফয়েডসহ কিছু টিকা আগেভাগে নিয়ে রাখাও নিরাপদ ভ্রমণের জন্য সহায়ক।
সুত্র: জাগো নিউজ

