ঢাকা
১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
রাত ১১:৫৯
logo
প্রকাশিত : এপ্রিল ১৪, ২০২৬

বেড়েই চলেছে হামের প্রকোপ

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েই চলেছে। এর সঙ্গে দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর সারি। পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুরাই এই রোগে সংক্রমিত হচ্ছে বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও দুর্বল করে দেয়, ফলে অন্যান্য রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এটি নিউমোনিয়া, শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত ও স্নায়ুবিক জটিলতা, ডায়রিয়া, বধিরতা, অন্ধত্ব এবং মস্তিষ্কে ফোলা (এনসেফালাইটিস)-এর মতো গুরুতর অসুস্থতার কারণ হতে পারে, যা প্রাণঘাতীও হতে পারে।

চলতি বছর ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত ১৭ হাজার ২২ জন সন্দেহজনক হাম রোগী পাওয়া গেছে। এ রোগে এখন পর্যন্ত ১৮৬ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও উপসর্গ নিয়ে আরো সাত মৃত্যু মিমুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মারা গেছে ঢাকা বিভাগে। ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে মৃত্যু হয়েছে চার জনের। গতকাল ১৩ এপ্রিল সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম বিষয়ক নিয়মিত বুলেটিনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

বুলেটিনে আরো বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা এক হাজার ৩৭১ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঢাকায় ৬১৫ জন। একই সময়ে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ৮২ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঢাকায় ৮৬ জন, যা গতকাল ছিল ১২৩ জনে। এদিকে, এ সময় হাসপাতালে সন্দেহজনক হামে ভর্তি হয়েছে ৭২৯ জন। আর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে ৭১৩ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ১৫ মার্চ থেকে আজ পর্যন্ত হাম ও উপসর্গ নিয়ে ১৮৬ জন মারা গেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সুপারিশ করে যে, হাম আক্রান্ত সব শিশুকে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ভিটামিন এ-এর দুটি ডোজ দেওয়া উচিত। চিকিত্সক এটা দেবেন। ভিটামিন এ চোখের ক্ষতি, দৃষ্টিহীনতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে এবং শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। বিশেষ করে দুই বছরের কম বয়সি শিশু এবং যেসব এলাকায় অপুষ্টি বেশি, সেখানে ভিটামিন এ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম ভাইরাসজনিত রোগ, যা নাক, গলা ও ফুসফুস (শ্বাসতন্ত্র) সংক্রমিত করে এবং পরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এর উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে উচ্চ জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং সারা শরীরে ফুসকুড়ি বের হওয়া।

রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে হাম আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় ১৩ মাস বয়সি আবদুল্লাহর। চলতি বছর ২ এপ্রিল মারা যায় সে। আবদুল্লাহ মা ইতিমনি জানান, ‘আমার বাচ্চার অবস্থা অনেক খারাপ হয়ে গেছিল, ডাক্তাররা আমাদের বাচ্চাকে আইসিউইতে নিতে বলে; ঐ হাসপাতালের আইসিইউতে কোনো সিট ফাঁকা ছিল না। ডাক্তাররা কোনো ব্যবস্থা না করে বলেন, বাচ্চাকে আইসিইউতে নিতে। এরপর আমরা ঢাকার সব সরকারি হাসপাতালে খোঁজ নিই, কোথাও আইসিইউর বেড ফাঁকা নেই। বাধ্য হয়ে ধানমন্ডির এক প্রাইভেট হাসপাতালে একটা বেড পাই। সেখানে নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুল্যান্স ঠিক করি, অ্যাম্বুল্যান্স আসে বাবুকে অন্য হাসপাতালে নিতে কিন্তু ততক্ষণে বাবু আমার মারা যায়। বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে আমার বাচ্চার মৃত্যু হয়। আমরা ঐ অ্যাম্বুল্যান্সে করে বাবুকে গ্রামে নিয়ে আসি।’

মা ইতিমনি বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ, ঐ হাসাপাতাল থেকে আমার বাচ্চার কোনো চিকিত্সা পাইনি। আমি সাখাওয়াত্ ডাক্তারের আন্ডারেই ছিলাম। তিনি যদি কেরানীগঞ্জ তার চেম্বারে চিকিত্সা না দিয়া, আরো দুই দিন আগে আমাদের হাসপাতালে ভর্তি দিত; তাহলে আমার পুত মারা যেত না।’ শিশুর মা ইতিমনি বলেন, ‘আমার বাচ্চার হাম হয়েছিল, কিন্তু বুকটা শুধু ধড়পড় করত, মুখে খাইতে পারত না। আইসিইউতে তো গরিবের বাচ্চা রাখতে পারে না—অনেক ট্যাকা লাগে। তখন বাচ্চা মারা যায়।’

‘ছোট্ট জাবেরের বাবা মো. জাহাঙ্গীর আলম ফোন করেন—জিগ্যেস করি—জাবের ক্যামন আছে। ওপাশ থেকে জাবেরের বাবা কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে জানান, জাবের তো নাই; জাবের মারা গেছে। প্রাইভেট হাসপাতালে নিছিলাম, অনেক ট্যাকা গেছে, ডিএসসিসি হাসপাতালে বলেছিল, ওর আর কোনো চিকিত্সা নাই। পরে বিজয় সরণিতে একটা প্রাইভেট হাসপাতলে ভর্তি করেছিলাম।’ জাবেরের মা ও বাবার সঙ্গে কথা হয় ডিএনসিসি কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালের আইসিইউর সামনে।

‘জাবেরের প্রথমে জ্বর ছিল, পরে হাম হয়েছিল, এরপর গায়ের রক্ত সব নষ্ট হয়ে গেছিল। রক্ত দিলাম কিন্তু কিছুই হইলো না। অন্য হাসপাতালে নিতে পারেন বলেছিল চিকিত্সকরা। আমরা ঢাকা মেডিক্যালে যাই, সেখানে বেড খানি নাই, সেখান থেকে প্রাইভেটে নিই। সেখানেই মারা যায় জাবের। আমাদের একটাই পোলা ছিল—ঢাকায় আমরা মিরপুর ১৪ নম্বরে থাকি।’ ছেলেকে হারিয়ে মা জান্নত অনেক অসুস্থ বলে জানান তিনি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার) পরিচালক ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান বলেন, ‘হামের রোগী মারা গেলেও আমাদের সক্ষমতা আছে। আমরা এখন একটা করে ওয়ার্ড চালু করেছি, রোগী বেশি হলে দুটা করে ওয়ার্ড চালু করব। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে রোগী বেশি হওয়ায় আমরা ডিএসসিসি হাসপাতালে রোগী পাঠিয়েছি।’

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম বলেন, ‘বয়সভিত্তিক আক্রান্ত রোগী, ছয় মাসের নিচের বাচ্চারাই বেশি সংক্রমিত হচ্ছে। খুব অদ্ভুত ও আতঙ্কজনক ব্যাপার যে—ছয় মাসের নিচের বাচ্চা আমরা হাম আক্রান্ত পাচ্ছি সবচেয়ে বেশি। এতে বোঝা যাচ্ছে বয়সভিত্তিক হামের যে পরিস্থিতি, সেটা ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে গেছে। এটা একটা বড় কারণ।’ এই বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক জানান, ‘যেহেতু হাম আমাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল, সে কারণে এটা নিয়ে আমরা চিন্তিত ছিলাম না। কিন্ত এখন হার্ড ইমিউনিটি কমে যাওয়াতে এক জায়গায় যদি হাম হয়, তাহলে দেখা যাচ্ছে, তা বিশাল এক জনসংখ্যা নিয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে। ঢাকায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হামের রোগী। এর কারণ ঘনবসতি। এছাড়া পাঁচ/সাত বছর টিকার কাভারেজ না থাকার কারণে এই হাম দ্রুত ছড়িয়েছে।’

তিনি বলেন, টিকা দেওয়ার পর কম করে এক মাস পর শরীরে এন্টিবডি তৈরি হয়। কারো কারো ক্ষেত্রে তিন সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। হামে আতঙ্কিত না হয়ে তিনটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে—হামে প্রথমত জ্বর থাকতে হবে। জ্বরের সঙ্গে চোখ লাল হয়ে যাওয়া, নাক দিয়ে পানি পড়া, কফ থাকে, সঙ্গে গায়ে লাল র্যাশ থাকে।

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram