

ভোটের মাঠে নেই মাইক, পোস্টার কিংবা সমাবেশের জমায়েত। আনুষ্ঠানিক প্রচার কার্যক্রম বন্ধ হলেও ভার্চুয়াল জগতে থামেনি নির্বাচনী লড়াই। ভোটারদের নজর এখন ডিজিটাল ডিভাইসের স্ক্রিনে, সেখানে চলছে ভোটের ভিন্ন এক ভার্চুয়াল যুদ্ধ। ফেসবুক, টিকটক, এক্স, টেলিগ্রাম, ইউটিউবের ডিজিটাল রণক্ষেত্রে নির্বাচনের শেষ ৪৮ ঘণ্টাজুড়ে চলছে শীর্ষ নেতাদের ভোটার বাড়ানোর জোরালো চেষ্টা।
এর মাঝে নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপতথ্য ছড়ানোর মাত্রা বাড়ছে।
৪ কোটি তরুণ ভোটার আকৃষ্ট করতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নজর
শেষ মুহূর্তে প্রার্থীরা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি নিয়ে সরাসরি হাজির হচ্ছেন ভোটারের স্মার্টফোনে। বিশেষ করে দেশের প্রায় চার কোটি তরুণ ভোটারকে নিজেদের পক্ষে টানতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছেন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্য মতে, দেশে বর্তমানে ইন্টারনেট গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ১৩ কোটি।
এর মধ্যে অন্তত ছয় কোটি ৫০ লাখ মানুষ ফেসবুক এবং পাঁচ কোটি মানুষ ইউটিউব ব্যবহার করেন। এ ছাড়া একটি বড় অংশ সক্রিয় রয়েছে ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপ অনুযায়ী, দেশে ১৩ কোটি ৬৯ লাখ মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করলেও বিটিআরসির হিসাবে এই সংখ্যা ১৮ কোটি ৭০ লাখ। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে শেষ মুহূর্তে ডিজিটাল মাধ্যমকেই সবচেয়ে কার্যকর মনে করছেন প্রার্থীরা।
ডিজিটালি যাঁরা এগিয়ে
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বর্তমানে প্রায় ৫৮ লাখ অনুসারী রয়েছেন, যা দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ ডিজিটাল উপস্থিতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে অনুসারীর সংখ্যা ২৯ লাখ। অন্যদিকে নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আলোচনায় থাকা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা নাহিদ ইসলামের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে রয়েছে প্রায় ১৩ লাখ অনুসারী; পাশাপাশি তাঁর আরেকটি ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টে অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। অন্যদিকে ঢাকা-৯ আসনের প্রার্থী তাসনিম জারার ভেরিফায়েড পেজের ফলোয়ার ৭৩ লাখ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনুসারীর সংখ্যা সরাসরি ভোটের ফল নির্ধারণ করে না।
তবে ডিজিটাল যুগে জনমত গঠন, রাজনৈতিক বার্তা দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া এবং বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগের সক্ষমতা পরিমাপে এই উপস্থিতি দিন দিন গুরুত্ব পাচ্ছে।
ডিজিটাল মার্কেটিং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফলোয়ার এখন রাজনৈতিক মূলধন। একজন নেতার ভার্চুয়াল রিচ যত বড়, তাঁর বার্তা তত দ্রুত ও ব্যাপকভাবে পৌঁছায়। প্রচার বন্ধের এই সময় এটাই একমাত্র সক্রিয় প্রচারমাধ্যম। তবে এই ফলোয়ার ও ইন্টার্যাকশনের পেছনে জৈবিক (অর্গানিক) সক্রিয়তা কতটা, আর পেইড প্রোমোশন বা বটের ভূমিকা কতটা, সে প্রশ্নও উঁকি দিচ্ছে।
এআই অপতথ্যের বিস্তার : দুই মাসে ৪৩টি ভুয়া দাবি শনাক্ত
জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে অপতথ্য ছড়ানোর প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। ফ্যাক্ট চেকিং ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের সর্বশেষ তথ্য বলছে, গত ১১ ডিসেম্বর থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশ বিষয়ক ৯টি ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে নির্বাচনসংক্রান্ত ৪৩টি ভুয়া দাবিতে এআই কনটেন্ট ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে।
বিশেষ করে ফেব্রুয়ারির প্রথম আট দিনেই ১৫টি এআই জেনারেটেড কনটেন্টের মাধ্যমে অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে, যা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে।
ডিসমিসল্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ থেকে ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকে ৮০০টির বেশি এআই ভিডিও শনাক্ত করা হয়েছে। এসব ভিডিওর বড় একটি অংশ রাজনৈতিক প্রচারের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং একাধিক প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব ভিডিওর বেশির ভাগে এটি যে এআই দিয়ে তৈরি, সে সংক্রান্ত কোনো সতর্কবার্তা বা ডিসক্লেইমার নেই। সাধারণ মানুষ এগুলোকে প্রকৃত ভিডিও ভেবে বিভ্রান্ত হচ্ছেন।
খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআইয়ের অপপ্রয়োগ মোকাবেলায় দেশে আইন ও বিধি-বিধান থাকলেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কারিগরি সক্ষমতা এবং বিশেষজ্ঞ জনবলের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। এই সুযোগে সাইবার অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এমনকি জনসমাবেশকে কৃত্রিমভাবে বিশাল দেখানোর জন্যও এখন এআই ব্যবহার করা হচ্ছে। ডিসমিসল্যাবের গবেষণা কর্মকর্তা আহমেদ ইয়াসীর আবরার বলেন, ‘নির্বাচনে মাঠের প্রচারণা বন্ধ হলেও অনলাইনের কার্যক্রম বাড়ছে। একই সঙ্গে অপতথ্যও ছড়াচ্ছে। এই সময় যেকোনো তথ্য যাচাই না করে শেয়ার করা উচিত নয়।’ তিনি বলেন, কোনো ছবি বা ভিডিও দেখে তাৎক্ষণিক উত্তেজিত না হয়ে সেটি সত্য কি না তা যাচাই করা জরুরি। নির্বাচনসংক্রান্ত যেকোনো তথ্যের জন্য কেবল নির্বাচন কমিশন এবং নির্ভরযোগ্য মূল ধারার গণমাধ্যমের ওপর নির্ভর করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, নির্বাচন সামনে রেখে সুসংগঠিত অপপ্রচার বা ডিসইনফরমেশনের ৯০ শতাংশের বেশি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে ছড়ানো হচ্ছে। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার পতনের পর প্রথম এই নির্বাচনে জনমত প্রভাবিত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে তৈরি করা অসংখ্য ভুয়া ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করা হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে এর আগে জাতিসংঘ মানবাধিকার প্রধানের কাছে সহযোগিতা চেয়েছিলেন।
এএফপির প্রতিবেদন বলছে, অপপ্রচারের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাংলাদেশের হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর কথিত নির্যাতনের দাবি। ‘হিন্দু জেনোসাইড’ হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে আগস্ট ২০২৪ থেকে জানুয়ারি ২০২৬ সালের মধ্যে এক্স (সাবেক টুইটার) প্ল্যাটফর্মে প্রায় সাত লাখেরও বেশি পোস্ট করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট’-এর প্রধান রকিব নায়েক জানিয়েছেন, এই অপতথ্যের ৯০ শতাংশই ভারত থেকে তৈরি হয়েছে এবং বাকি অংশ যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় থাকা হিন্দুত্ববাদী নেটওয়ার্ক থেকে ছড়ানো হয়েছে। অথচ গত জানুয়ারিতে প্রকাশিত পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে সংখ্যালঘুদের ওপর ঘটা ৬৪৫টি ঘটনার মধ্যে মাত্র ১২ শতাংশ ছিল সাম্প্রদায়িক বা ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক।
তবে বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, এই ব্যাপক অপপ্রচারের পেছনে সরাসরি ভারত সরকারের সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। নির্বাচন কমিশন এই বিপুল পরিমাণ অপতথ্য মোকাবেলায় মেটার (ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান) সঙ্গে মিলে একটি বিশেষ মনিটরিং ইউনিট গঠন করেছে। তবে কমিশনের মুখপাত্র রুহুল আমিন মল্লিক স্বীকার করেছেন, অনলাইন জগতের এই বিশাল স্রোত সামলানো একটি দুঃসাধ্য কাজ। নির্বাচন বিশেষজ্ঞ জেসমিন তুলি সতর্ক করেছেন, বাংলাদেশে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ব্যাপক হারে বাড়লেও তথ্য যাচাই করার সচেতনতা অনেকের মধ্যেই কম। ফলে এআই-নির্ভর এই ভুয়া দৃশ্যগুলো সাধারণ ভোটারদের ভুল সিদ্ধান্ত নিতে প্ররোচিত করার বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সাবেক সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর বলেন, ‘এআই অপতথ্য নিয়ে যাঁরা সচেতন নন, তাঁরা বিভ্রান্ত হচ্ছেন। নির্বাচনের দিনগুলোতে এমনকি পরেও যা বড় সমস্যার কারণ হতে পারে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতনতা বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে।’ অপতথ্য মোকাবেলায় সরকারের পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী বলেন, ‘নির্বাচনকালীন অপতথ্য, গুজব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সৃষ্ট কনটেন্ট মোকাবেলার জন্য আইসিটি বিভাগ জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির মাধ্যমে একটি জাতীয় ইন্সিডেন্ট রিপোর্টিং পোর্টাল পরিচালনা করছে। সরকারের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা এই পোর্টালের মাধ্যমে সন্দেহজনক কনটেন্ট রিপোর্ট করতে পারবেন। একটি বিশেষায়িত প্রযুক্তিগত দল এসব রিপোর্ট যাচাই করবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিটিআরসির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম প্ল্যাটফর্মকে অবহিত করবে। প্রয়োজনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সহায়তা গ্রহণ করা হবে।’ এদিকে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, নির্বাচনসংক্রান্ত যেকোনো গুজব বা অপপ্রচারের তথ্য জানাতে ইসি একটি ‘আইন-শৃঙ্খলা সমন্বয় সেল’ গঠন করেছে, যা ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সার্বক্ষণিক (ফোন : ০২৫৫০০৭৪৭০-৭৪ ও ০২৫৫০০৭৫০৬) চালু থাকবে।

