

গণপরিবহনের নাজুক অবস্থা ও যানজট এড়িয়ে স্বস্তিতে যাতায়াতের জন্য দেশে দিন দিন বাড়ছে মোটরসাইকেলের জনপ্রিয়তা। তুলনামূলক কম দাম এবং জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ সাশ্রয়ী হওয়ায় দুই চাকার এই বাহনটি এখন অনেকের সঙ্গী হয়ে উঠছে। এছাড়া রাইড-শেয়ারিং সেবা ঘিরে এটি কারও কারও কর্মসংস্থানের উৎসেও পরিণত হয়েছে। মোটরসাইকেল নিয়ে জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক এমদাদুল হক তুহিনের তিন পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের প্রথম পর্ব আজ।
দিন দিন বড় হচ্ছে মোটরসাইকেলের বাজার। বাড়ছে বিক্রি। এর সঙ্গে নতুন যোগ হয়েছে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রচারের বিষয়টি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর মোটরসাইকেল বিক্রিতে খরা নামলেও এখন ভোটের হাওয়াকে কেন্দ্র করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে এ শিল্প। অনেকেই নতুন মোটরসাইকেল কিনছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
দেশে মোটরসাইকেল বিক্রির তথ্য রাখে এ শিল্পের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও বিপণন কোম্পানিগুলো। তাদের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বাইক বিক্রি হয়েছে সোয়া চার লাখের বেশি। এটি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮১ হাজার বেশি। গত নভেম্বর মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় আড়াই হাজারের বেশি মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছে। কোম্পানিগুলো বলছে, এই বিক্রি ২০৩০ সাল নাগাদ বছরে ৬ লাখে উন্নীত হতে পারে।
বিক্রি ও প্রবৃদ্ধির চিত্র
গত জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে ৪ লাখ ২৭ হাজার ৮০টি মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছে। ২০২৪ সালের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৪৬ হাজার ৩২টি। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৪ শতাংশ। গত নভেম্বর মাসে ৩৩ হাজার ৭২৭টি মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছে, যেখানে আগের বছর একই মাসে বিক্রি হয়েছিল ৩১ হাজার ২৮৮টি। প্রবৃদ্ধির পরিমাণ ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থবছরের হিসাবে ২০২৫-২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) বিক্রির পরিমাণ ১ লাখ ৭৭ হাজার ৯১৭টি, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১ লাখ ৪৭ হাজার ৯০৪টি। প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ২১ শতাংশে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নির্বাচনের প্রভাবে বিক্রি বৃদ্ধি
রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন সভা-সমাবেশে মোটরসাইকেলের শোডাউন লক্ষ্য করা যায়। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিএনপির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মোটরসাইকেলের শোডাউন চোখে পড়ে। যেসব নেতাকর্মী এসব মোটরসাইকেলে শোডাউনে অংশ নেন তাদের অনেকেই গত ১৬ বছর এলাকায় থাকতে পারেননি। তাদের অনেকেই নতুন কিংবা পুরোনো মোটরসাইকেল কিনেছেন। আবার বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত এমন অনেকেই এখন নতুন মোটরসাইকেল কিনেছেন।
কোম্পানিগুলোও বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মোটরসাইকেলের নতুন ক্রেতা বেড়েছে। নির্বাচন সামনে রেখে বিক্রিও বেড়েছে।
কিশোরগঞ্জ ও ঢাকায় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত মাজহারুল ইসলাম অনিক। তিনি বলেন, ‘৫ আগস্টের আগে অনেকেই এলাকায় থাকতে পারেননি। যারা মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন, তাদের সেই বাহনটিও পুরোনো হয়ে গেছে। আওয়ামী শাসনের অবসানের পর পরিবর্তিত অবস্থায় আমরা স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করতে পারছি। নেতাকর্মীদের অনেকেই এলাকায় ফিরেছেন, নতুন মোটরসাইকেল কিনেছেন। বিভিন্ন প্রোগ্রামে গেলে তা চোখে পড়ে। ঢাকার বিভিন্ন প্রোগ্রামেও তা চোখে পড়ে।’
ঢাকার বিমানবন্দর এলাকায় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত আল-আমিন। সম্প্রতি তিনি ইয়ামাহার নতুন একটি মোটরসাইকেল কিনেছেন। তিনি বলেন, ‘এত দিন ঢাকায় থাকতে পারিনি। গ্রামের বাড়িতে থেকেছি। এখানকার স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত রয়েছি। সামনে নির্বাচন, মিটিং-মিছিলে যেতে হয়। আবার যখন-তখন যেখানে ইচ্ছে সেখানে যাওয়া লাগে। ফলে একটি মোটরসাইকেল প্রয়োজন হয়। সেজন্যই কিছু টাকা জমিয়ে নতুন মোটরসাইকেল কিনেছি।’
জনবহুল দেশ হিসেবে বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে মোটরসাইকেল ব্যবহারের হার অনেক কম। কিন্তু এ বাহনটি খুবই সাশ্রয়ী। এটি ছোট রাস্তা দিয়েও যেতে পারে। আমাদের দেশে গত ২০ বছরে যেভাবে গ্রামাঞ্চলেও রাস্তাঘাট হয়েছে, সামনের দিনে আরও ভালো হবে। তখন মোটরসাইকেলের চাহিদা আরও বাড়বে। -ইফাদ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান তাসকীন আহমেদ
এ বিষয়ে টিভিএস অটোস বাংলাদেশ লিমিটেডের সিইও বিপ্লব কুমার রায় বলেন, ‘একটি সময় নির্বাচন সামনে রেখে মোটরসাইকেলের বিক্রি বাড়তো। কিন্তু এখন ততটা বাড়ে না। নির্বাচন যারা করেন, তারাও স্মার্ট হয়ে গেছেন। আগে কিনে দিতে হতো, এখন খরচ দিয়ে চলেন। আর প্রার্থীদের নির্বাচনের খরচের ব্যাপারেও ইসির একটি বাধ্যবাধকতা থাকে। তবে নির্বাচনের আগে বা নির্বাচন সামনে রেখে মোটরসাইকেলের বিক্রি কিছুটা বাড়ে, বাড়ে না বললে ভুল হবে। বাজারে যখন টাকার প্রবাহ বাড়ে, তখন উচ্চবিলাসী বা চাহিদাসম্পন্ন পণ্যের চাহিদা বাড়ে। এবারও সেটি হয়েছে।’
এসিআই মোটরস লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার হোসাইন মোহাম্মদ অপশন বলেন, ‘রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মোটরসাইকেলের অনেক নতুন ক্রেতা দেখা যাচ্ছে। বেশ কিছু সময় ধরেই বাজার একটি ইতিবাচক ধারায় রয়েছে। তবে শীতের কারণে ডিসেম্বরে বাজার কিছুটা নেতিবাচক। তবে নির্বাচন সামনে রেখে জানুয়ারিতে মোটরসাইকেল বিক্রিতে একটি ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যেতে পারে বলে আমরা মনে করছি।’
এসিআই মোটরস লিমিটেডের ইয়ামাহা মোটরসাইকেলের সেলস ডিরেক্টর মো. জাকির হোসাইন বলেন, ২০২৫ সালে মোটরসাইকেল বিক্রিতে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি রয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এখন অনেকেই নতুন মোটরসাইকেল কিনছেন। দেশের রাস্তাঘাটের অবস্থা ভালো নয়। গণপরিবহনের অবস্থাও নাজুক। ফলে মোটরসাইকেলে আগ্রহী হয়ে উঠছেন অনেকে।
জাকির হোসাইনের মতে, দেশ স্থিতিশীল ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভালো থাকলে মোটরসাইকেলের চাহিদা ও বিক্রি দুটিই বাড়বে।
নভেম্বর পর্যন্ত মোটরসাইকেল বিক্রি ২৪ শতাংশ বাড়লেও ইয়ামাহার প্রবৃদ্ধি ২৭ শতাংশ বলে জানিয়েছেন এসিআই মোটরস লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার হোসাইন মোহাম্মদ অপশন। তিনি জানান, অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসেও ভালো অবস্থানে রয়েছে এ শিল্প। এসময় প্রবৃদ্ধি ২০ শতাংশের ওপর আছে। ২০২৫ সালে শেষ পর্যন্ত সাড়ে চার লাখের বেশি মোটরসাইকেল বিক্রি হতে পারে।
ঘুরে দাঁড়িয়েছে মোটরসাইকেল শিল্প
টিভিএস অটোস বাংলাদেশ লিমিটেডের সিইও বিপ্লব কুমার রায় বলেন, দেশের মোটরসাইকেল শিল্প গত এক দশকে অসাধারণভাবে বেড়েছে। যদিও ২০২৪ সালে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও ডলারের অস্থিরতার কারণে বিক্রি বড় ধাক্কা খায়। কিন্তু ২০২৫ সালে বাজার আবার ঘুরে দাঁড়ায়। মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি, রাইড-শেয়ারিং খাতের বিস্তার এবং শহর-গ্রামে চলাচলের প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধির ফলে এ বাহনটি এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে মোটরসাইকেল বিক্রি বছর শেষে চার লাখের ওপর দাঁড়াবে।
এদিকে, দেশে আনুষ্ঠানিক বিক্রি শুরুর এক বছরের মধ্যে ১৩ হাজারের বেশি রয়্যাল এনফিল্ড মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে দেশে এই মোটরসাইকেল বাজারজাত শুরু করে ইফাদ মোটরস।
কোম্পানিটি জানায়, প্রথম বছরে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি চাহিদা এসেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কোম্পানির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকতা বলেন, ‘দেশে বহু বছর রয়্যাল এনফিল্ডের অনুমতি ছিল না। ফলে এর প্রতি মানুষের বিরাট একটি উত্তেজনা ছিল। প্রথম দিকে সরবরাহ দেওয়ার সময় সাত মাস পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। তবে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের মধ্যে আগে বুকিং দেওয়া সব মোটরসাইকেল সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে।’
এখন পর্যন্ত মোটরসাইকেল বিক্রিতে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি রয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেকেই নতুন মোটরসাইকেল কিনছেন। দেশের রাস্তাঘাটের অবস্থা ভালো নয়। গণপরিবহনের অবস্থাও নাজুক। ফলে মোটরসাইকেলে আগ্রহী হয়ে ওঠছেন অনেকে।- এসিআই মোটরস লিমিটেডের ইয়ামাহা মোটরসাইকেলের সেলস ডিরেক্টর মো. জাকির হোসাইন
নিবন্ধিত বাইক ৪৮ লাখ
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্যমতে, দেশে এখন নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা ৪৮ লাখ ১৬ হাজার ৫৩১টি। অক্টোবর পর্যন্ত ২০২৫ সালে নিবন্ধন নেওয়া হয়েছে দুই লাখ ৩৫ হাজার ৫৮১টি। এর আগে ২০২৪ সালে নিবন্ধন করা মোটরসাইকেলের সংখ্যা ছিল দুই লাখ ৬২ হাজার ৭১৫টি। তিন লাখ ১০ হাজার ৪১৮টি নিবন্ধন দেওয়া হয় ২০২৩ সালে। ২০২২ সালে এ সংখ্যা ছিল পাঁচ লাখ ৬ হাজার ৯১২টি, যা এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ। এর আগে ২০২১ সালে তিন লাখ ৭৫ হাজার ২৫২টি, ২০২০ সালে তিন লাখ ১১ হাজার ১৬টি ও ২০১৯ সালে চার লাখ এক হাজার ৪৫২টি মোটরসাইকেল নিবন্ধিত হয়।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, দেশে যত মোটরসাইকেল বিক্রি হয় তার সব তাৎক্ষণিভাবে নিবন্ধনের আওতায় আসে না। অনেক সময় ক্রেতা নয়, বিভিন্ন ডিলার পয়েন্টে থাকা বাইকগুলোও বিক্রির হিসাবের মধ্যে পড়ে। আবার গ্রামগঞ্জের যারা কেনেন তাদের বেশিরভাগই নিবন্ধনের বাইরে থাকেন। ফলে ২০২৫ সালে চার লাখের বেশি মোটরসাইকেল বিক্রি হলেও অক্টোবর পর্যন্ত নিবন্ধন হয়েছে দুই লাখ ৩৫ হাজারের কিছু বেশি। বিআরটিএ গত নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসের তথ্য এখনো জানাতে পারেনি।
টিভিএস অটোস বাংলাদেশের সিইও বিপ্লব কুমার রায় বলেন, ‘বাংলাদেশের মোটরসাইকেল বাজার আগামী পাঁচ বছরে সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল ভোক্তা শিল্পগুলোর একটি হয়ে উঠবে। যদি বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি ৫ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে বজায় থাকে, তাহলে ২০৩০ সাল নাগাদ দেশে বছরে সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় লাখ মোটরসাইকেল বিক্রি হতে পারে। প্রিমিয়াম সেগমেন্ট, ইলেকট্রিক টু-হুইলার প্রযুক্তি, ডিজিটাল ফাইন্যান্সিং ও শক্তিশালী আফটার সেলস নেটওয়ার্ক- সব মিলিয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে এটি একটি পরিণত এবং উচ্চমূল্যবান বাজারে পরিণত হবে।’
এ নিয়ে ইফাদ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান ও ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ‘জনবহুল দেশ হিসেবে বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে মোটরসাইকেল ব্যবহারের হার অনেক কম। কিন্তু এ বাহনটি খুবই সাশ্রয়ী। এটি ছোট রাস্তা দিয়েও যেতে পারে। আমাদের দেশে গত ২০ বছরে যেভাবে গ্রামাঞ্চলেও রাস্তাঘাট হয়েছে, সামনের দিনে আরও ভালো হবে। তখন মোটরসাইকেলের চাহিদা আরও বাড়বে। জাপানের একটি পূর্বাভাস ছিল- ২০২৫ সালের মধ্যে দেশে মোটরসাইকেলের চাহিদা বছরে ১০ লাখে পৌঁছাবে, এটি সম্ভব হয়নি। বিক্রি এখনো চার থেকে সাড়ে চার লাখের মধ্যে ঘোরাঘুরি করছে। আমরা মনে করি ২০৩০ সালের মধ্যে এই বাজার আরও ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বাড়বে।’
দাম তেমন বাড়েনি
এসিআই মোটরস লিমিটেডের ইয়ামাহার সেলস ডিরেক্টর জাকির হোসাইন জানান, দাম যতটুকু বাড়ানোর দরকার ছিল, তারা সেভাবে বাড়াতে পারেননি। অনেক ক্ষেত্রে তাদের জিরো মার্জিনে ব্যবসা করতে হচ্ছে। তারা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ মূল্য সমন্বয় করতে পেরেছেন। কিন্তু ডলারের দাম বেড়েছে ২৫ শতাংশ। ডলার ও বেতনসহ সব খরচের জন্য দাম বাড়াতে হচ্ছে। কোনো কোনো মোটরসাইকেলে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়াতে পেরেছেন। যেখানে বাড়ানোর কথা অন্তত ৫০ হাজার টাকা। অর্থাৎ ডলারের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তারা মূল্যবৃদ্ধি করতে পারেননি। গত দেড় বছরে ইয়ামাহা মোটরসাইকেলের দাম তেমন বাড়েনি।
দেশে মোটরসাইকেল উৎপাদনের অন্তত নয়টি কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে আছে জাপানের ইয়ামাহা, হোন্ডা ও সুজুকি এবং ভারতের হিরো, বাজাজ ও টিভিএস। সেই সঙ্গে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে রয়েছে রয়্যাল এনফিল্ডের সংযোজন কারখানা। দেশীয় ব্র্যান্ড হিসেবে রয়েছে রানার অটোমোবাইলসের কারখানাও। তারা দেশীয় বাজারে অবস্থান পোক্ত করতে না পারলেও উচ্চ সিসির মোটরসাইকেল রপ্তানি করে বলে প্রতিষ্ঠানটির দাবি।
সরকার ২০১৮ সালে মোটরসাইকেল শিল্প উন্নয়ন নীতিমালা করে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেয় এ খাতকে। এর ওপর ভিত্তি করেই প্রতিষ্ঠানগুলো দেশে কারখানা স্থাপন করেছে। সরকারের লক্ষ্য ছিল ২০২৭ সালের মধ্যে বছরে বাইক উৎপাদন ১০ লাখে উন্নীত করা। ২০২৫ সাল নাগাদ উৎপাদন করা অন্তত পাঁচ লাখ। কিন্তু এ শিল্পটি এখনো সেই লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে। বছরে এখনো মোটরসাইকেলের চাহিদা পাঁচ লাখে পৌঁছায়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে স্থাপিত কারখানাগুলোতে এখন মোটরসাইকেল সংযোজন বা উৎপাদন হয়। ১৫০ সিসি পর্যন্ত বাইক উৎপাদন করতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তেমন কোনো কিছু আমদানি করতে হয় না। ভবিষ্যতে দেশে এর সব যন্ত্রপাতি উৎপাদন হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশের মোটরসাইকেল বাজার আগামী পাঁচ বছরে সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল ভোক্তা শিল্পগুলোর একটি হয়ে উঠবে। যদি বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি ৫ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে বজায় থাকে, তাহলে ২০৩০ সাল নাগাদ দেশে বছরে সাড়ে ৫ থেকে ৬ লাখ মোটরসাইকেল বিক্রি হতে পারে।- টিভিএস অটোস বাংলাদেশের সিইও বিপ্লব কুমার রায়
ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ‘২০১৮ সালে সরকার একটি মোটরসাইকেল নীতি প্রণয়ন করে। নীতির অধীনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান উৎপাদনের জন্য এখানে তিন হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। সরকারের এটি একটি সুদূর প্রসারী উদ্যোগ ছিল। এ কারণে এখন বাংলাদেশে প্রতিটি বড় কোম্পানি স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করছে। ২০২৫ সালের শুরুতে দুটি কোম্পানি প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ থেকে মোটরসাইকেল রপ্তানিও করে। উৎপাদন শুরু হওয়ায় দেশে ধাপে ধাপে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজে আরও ছোট ছোট কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। মোটরসাইকেলের অনেক প্লাস্টিক আইটেম তৈরি হচ্ছে, সিট তৈরি হচ্ছে, স্পোক ও চেইন তৈরি হচ্ছে। এটি সামনের দিকে দেশের অটোমোবাইল খাত আরও বেশি বিকশিত করবে।’
এ বিষয়ে ডিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান বলেন, ‘মোটরসাইকেল শিল্পে নতুন অনেক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। উবার ও পাঠাওয়ের মতো অ্যাপ জনপ্রিয় হওয়ায় অনেকেই এ পেশায় (রাইড-শেয়ারিং) এসেছেন। মোটরসাইকেল শিল্পে অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠান এ দেশে বিনিয়োগ করেছে। অর্থনীতি যত ভালোর দিকে যাবে, এসব যানবাহনের চাহিদা তত বাড়বে। বেশিরভাগ মোটরসাইকেলের দাম এক থেকে তিন লাখ হওয়ায় অনেকেই তা সহজে কিনতে পারেন। ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও মালেশিয়ার অর্থনীতিতে মোটরসাইকেল বড় অবদান রাখছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও কর্মসংস্থান তথা জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে এ শিল্প অবদান রাখছে।’
আবুল কাসেম মনে করেন, দেশে এখন মোটরসাইকেল সংযোজন হলেও ভবিষ্যতে ইঞ্জিন থেকে শুরু করে সবকিছুই এখানে উৎপাদন হবে। শুধু মোটরসাইকেলই নয়, একসময় দেশে গাড়িও উৎপাদন হবে। দেশীয় প্রতিষ্ঠানসহ বাংলাদেশ থেকে পুরোদমে মোটরসাইকেল রপ্তানি হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
