

শিবব্রত চক্রবর্তী: ফেনীতে অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ের কারণে একের পর এক ঘটছে দুর্ঘটনা। আর এসব দুর্ঘটনায় গত কয়েক বছরে কমপক্ষে ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে অনেকে। সর্বশেষ গত ২৮ জুন শনিবার সন্ধ্যায় ফেনী গোডাউন সংলগ্ন রেলক্রসিংয়ে ট্রেন-সিএনজি সংঘর্ষে দুজন নিহত ও পাঁচজন আহত হয়েছে। স্থানীয়দের দাবী, অরক্ষিত রেলক্রসিং এবং নিয়োজিত গেটম্যানের গাফিলতির কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে।
ফেনী রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ফেনী অংশের রেলপথের দৈর্ঘ্য প্রায় ৫০ কি:মি। প্রতিদিন ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, চাঁদপুর, সিলেট ও ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন গন্তব্যে নিয়মিত চলাচল করছে ট্রেন। ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়ময়নসিংহ, চাঁদপুর ও সিলেটে আন্তঃনগর এবং লোকাল মিলে ২০ বারেরও বেশি ট্রেন চলাচল করে। সেই সঙ্গে দেশের বৃহত্তম চট্টগ্রাম বন্দরের মালসামগ্রী আনা নেওয়া এবং বৃহত্তম কদমতলী রেলওয়ে কারখানায় মেরামতের জন্য বিভিন্ন স্হান থেকে প্রায় প্রতিদিনই ওয়াগন ও বগি ওই রেলওয়ে লাইন দিয়ে আনা নেওয়া হয়। প্রতিবারই রেল ক্রসিং এ নিয়োজিত গেটম্যানরা সচেতন ভাবেই দায়িত্ব পালন করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ফেনী রেলওয়ের এক কর্মকর্তা জানান, এ অংশে বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে রেলক্রসিংয়ের সংখ্যা প্রায় ১৫টি। এর মধ্যে মাত্র সাতটি রেলক্রসিংয়ে গেটম্যান থাকলেও বাকিগুলো রয়েছে অরক্ষিত। তবে স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, এর বাইরেও ফেনী অংশে অন্তত ২০টি অরক্ষিত রেলক্রসিং রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছর ফেনীর বিভিন্ন স্থানে ট্রেনে কাটা পড়ে নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ১০ জন। এর মধ্যে ফেনী সদর অংশেই মৃত্যুর সংখ্যা বেশি রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রেলক্রসিং অরক্ষিত থাকা, গেটম্যান না থাকা বা গেটম্যান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণেই মূলত ট্রেনে কাটা পড়াসহ সংঘর্ষের মতো দুর্ঘটনা ঘটছে।
ওই সুত্র জানায়, ট্রেন আসার অনেক আগেই গেটম্যান গেইট বারের খুঁটি দিয়ে চলে যান এবং ট্রেন চলে যাওয়ার অনেক পরে এসে খুঁটি বার অপসারণ করেন। কোন তদারকি করেননা। ফলে সিএনজি, টমটম, রিক্সা চালকেরা তাদের খুশিমতো রেললাইন পার হয়ে যায়। এমনও দেখা গেছে দ্রুতগতিতে ট্রেন প্রায় সন্নিকটে এসময়ও সিএনজি, টমটম, রিকশা পার হচ্ছে এবং পথচারীরা দৌড়ে রেললাইন পার হচ্ছেন। অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ে দ্রুত স্হায়ী গেটম্যান নিয়োগ ও নিরাপদ গেইট স্থাপনের দাবি জানান তারা। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে রেলক্রসিংয়ের কাছে অবৈধভাবে দোকান গড়ে ওঠার কারণে অনেক সময় ট্রেনের আসা-যাওয়া সহজে চোখে পড়ে না। ফলে দুর্ঘটনা ঘটে থাকে।
এদিকে ফেনী শহরের সহদেবপুর থেকে সালাউদ্দিন মোড় পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকায় রেললাইন ঘেঁষে অসংখ্য স্হাপনা গড়ে উঠেছে। এতে যেমন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে ট্রেন, তেমনি বাড়ছে দূর্ঘটনা। যদি ও বাংলাদেশ রেলওয়ে আইন অনুযায়ী রেললাইনের উভয় পাশের ২০ ফুট এলাকা বিপজ্জনক এবং সংরক্ষিত এলাকা।
অবৈধ এসব স্থাপনার মধ্যে রয়েছে হোটেল, বেডিং দোকান, কামার দোকান, মাংস দোকান, কাগজের বাক্স তৈরির কারখানা, টেইলার্স আসবাবপত্র তৈরির কারখানাসহ রেললাইনের ওপরে পুরাতন কাপড়ের পশরা। এইসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছাড়া ও রেললাইন ঘেঁষে গড়ে উঠেছে অবৈধ পিক আপ স্ট্যান্ড ও ফলের পাইকারি দোকান।
রেললাইনের দুপাশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কেনাকাটার জন্য ক্রেতারা সাধারণত রেললাইন ব্যবহার করে থাকেন। আর এসব দোকান পাটের ময়লা আবর্জনা রেলওয়ে লাইনের উপর ফেলা হচ্ছে। এতে রেললাইন, ক্লিপ এবং পাথর ক্ষতি গ্রস্থ হচ্ছে। এছাড়াও লাইনের উপর প্রতিদিন ভ্রাম্যমান ফেরিওয়ালা বসে। তারা লাইনের উপর বসে দৈনন্দিন বেচাবিক্রি করে। ট্রেন আসার হুইসেল শুনে কিছু সময়ের জন্য সরে পড়ে। এতে রেললাইনের ওপর মানুষের সরব উপস্থিতি থাকছে। ফলে দূর্ঘটনা ঘটে।
ফেনী রেলওয়ের উর্ধতন সহকারী প্রকৌশলী অফিস সূত্র জানায়, সুষ্ঠভাবে ট্রেন চলাচলের জন্য অবৈধ স্হাপনা বারবার উচ্ছেদ করা হয়েছে এবং এই প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে।
ফেনী স্টেশনে উপস্থিত যাত্রীসহ সর্বসাধারণরা জানান, রেললাইনের ওপর দোকানপাট বসায় দূর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে ট্রেন। রেললাইনের দুপাশে অবৈধ স্হাপনা গড়ে উঠায় স্বাভাবিক ট্রেন চলাচল মারাত্মক ঝুঁকি পূর্ণ হয়ে পড়েছে। তারা আরো জানান, অবৈধ স্থাপনার কারণে অনেক সময় ট্রেন চালকেরা সামনে ঠিক ভাবে দেখতে পান না। এর ফলে সময়ে সময়ে দূর্ঘটনা ঘটছে।
ফেনী রেলওয়ে থানা সূত্র জানায়, এই রেলপথ দিয়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, কুমিল্লা সিলেট ও ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন রুটে ট্রেন চলাচল করে এবং মাঝেমধ্যেই অসচেতনতার কারণে ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যাচ্ছে মানুষ। এভাবে গত এক বছরে কয়েক জনের মতো মারা গেছে। এ নিয়ে মামলাও হয়েছে।
রেলওয়ের ফেনী সহকারী প্রকৌশলী অফিস সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে তারা অবৈধ রেলক্রসিং বন্ধে কাজ করছেন। যেসব স্থানে গেটম্যান নেই সেসব স্থানে গেটম্যান রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছে। তবে রেলক্রসিং যেখানে আছে সেখানে গেটম্যানরা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবেই পালন করছে। কিছু কিছু সিএনজি ও টমটম চালক ট্রেন আসার সময় গেইট পড়লে বা সতর্ক করলেও তারা রেল লাইনের কাছাকাছি চলে আসে অথবা লাইন ক্রসিংয়ের চেষ্টা করে।
ওই সূত্র জানায়, তবে লেভেল ক্রসিংয়ে গাড়ীর চালক পথচারীসহ জনসাধারণের সাবধানে চলাচল করা উচিত। অযথা গেটম্যানের উপরে দোষ চাপানোটা অপ্রাসঙ্গিক।
