

মো: নাজমুল হোসেন ইমন, চট্টগ্রাম: দিনের ব্যস্ততা শেষে যখন চট্টগ্রাম নগরী ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে আসে, তখনই শুরু হয় আরেকটি কর্মব্যস্ত অধ্যায়। রাতের আঁধারে জেগে ওঠে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, মাছের আড়ত, পাইকারি বাজার, পরিবহন ব্যবস্থা, হাসপাতাল, সংবাদমাধ্যম এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা সেবা। নগরবাসীর অগোচরেই হাজারো মানুষ রাতভর কাজ করে সচল রাখেন দেশের অন্যতম অর্থনৈতিক কেন্দ্র চট্টগ্রামকে।
চট্টগ্রামকে বলা হয় বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। দেশের আমদানি-রপ্তানির বড় অংশ পরিচালিত হয় এই নগরী দিয়ে। তাই সূর্য ডুবে গেলেও থেমে থাকে না বন্দর এলাকার কর্মচাঞ্চল্য। কনটেইনার ওঠানো-নামানো, ট্রাকে পণ্য পরিবহন, জাহাজে মালামাল খালাস, কাস্টমস-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম—সবই চলতে থাকে রাতভর।
বন্দর এলাকার এক শ্রমিক বলেন, "আমরা যদি রাতে কাজ না করি, তাহলে সকালে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পৌঁছাতে দেরি হবে। আমাদের রাত জেগে কাজ করার কারণেই অনেক ব্যবসা সময়মতো চলে।"
শুধু বন্দর নয়, রাত জাগে চট্টগ্রামের ফিশারিঘাটও। গভীর সমুদ্র থেকে মাছভর্তি ট্রলার ভিড়তে শুরু করে মধ্যরাতের পর। এরপর শুরু হয় মাছ নামানো, নিলাম, বাছাই, সংরক্ষণ এবং দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানোর প্রস্তুতি। রাত শেষ হওয়ার আগেই হাজার হাজার কেজি মাছ দেশের বিভিন্ন বাজারের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
এদিকে নগরীর বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম বুথে দায়িত্ব পালন করেন নিরাপত্তাকর্মীরা। গভীর রাতেও তারা সতর্ক দৃষ্টিতে পাহারা দেন, যাতে গ্রাহকরা নিরাপদে অর্থ লেনদেন করতে পারেন। ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও দায়িত্ব পালনে কোনো শৈথিল্য দেখান না তারা।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ নগরীর বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ডবয়, অ্যাম্বুলেন্স চালক ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা রাতভর দায়িত্ব পালন করেন। যখন অধিকাংশ মানুষ ঘুমিয়ে থাকেন, তখনই জরুরি বিভাগে চলে জীবন বাঁচানোর নিরলস সংগ্রাম।
সংবাদমাধ্যমের কর্মীরাও এই রাতজাগা কর্মযোদ্ধাদের অন্যতম। কোনো দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, অপরাধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার খবর সংগ্রহে রাতভর ছুটে বেড়ান সাংবাদিক, ক্যামেরাপারসন ও ভিডিও জার্নালিস্টরা। অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতেও দায়িত্ব পালন করতে হয় তাদের।
অন্যদিকে, রাতের শহরকে নিরাপদ রাখতে কাজ করেন পুলিশ, র্যাব, কোস্ট গার্ড, ফায়ার সার্ভিস, আনসার ও বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীরা। টহল, জরুরি সাড়া, উদ্ধার অভিযান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তাদের নিরবচ্ছিন্ন দায়িত্ব পালনেই নগরবাসী অনেকটা নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেন।
রাতভর ছুটে চলেন ট্রাকচালক, কাভার্ডভ্যান চালক, পিকআপচালক এবং পণ্যবাহী যানবাহনের সহকারীরাও। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পণ্য এনে চট্টগ্রামে পৌঁছে দেওয়া কিংবা বন্দর থেকে দেশের নানা প্রান্তে পণ্য সরবরাহের বড় অংশই সম্পন্ন হয় রাতের বেলায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি শহরের অর্থনীতি কেবল দিনের কর্মব্যস্ততার ওপর নির্ভর করে না; রাতের অর্থনীতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। চট্টগ্রামের বন্দর, শিল্পকারখানা, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সচল রাখতে যে হাজারো মানুষ রাত জেগে কাজ করেন, তাদের অবদান জাতীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত মূল্যবান।
তবে এই কর্মযোদ্ধাদের অনেকেই দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, সীমিত বিশ্রাম, কম বেতন, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পর্যাপ্ত সামাজিক নিরাপত্তার অভাবের মতো সমস্যার মুখোমুখি হন। শ্রম বিশেষজ্ঞদের মতে, তাদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি, স্বাস্থ্যসেবা, জীবনবিমা এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম যখন ঘুমিয়ে থাকে, তখনও শহরটি থেমে থাকে না। রাতের নীরবতার আড়ালে অসংখ্য অদৃশ্য কর্মযোদ্ধার শ্রম, ঘাম ও দায়িত্ববোধে সচল থাকে দেশের প্রধান বন্দর, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং জনজীবন। তারা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে না থাকলেও, তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে বন্দরনগরীর রাতের অর্থনীতি এবং দেশের উন্নয়নের একটি বড় ভিত্তি।
