

২০২৬ সালের ৩০শে জুনের এই পবিত্র ও বিষাদময় সকাল। শুভ জন্মদিন, হে শব্দের জাদুকর, হে বাংলার অঘোষিত আলোকবর্তিকা, শহীদ ওসমান হাদী! আজ তোমার জন্মের এই শুভক্ষণে সমগ্র জাতি চরম শ্রদ্ধা আর চোখে জল নিয়ে স্মরণ করছে তোমার সেই অনন্য, অকুতোভয় জীবনদর্শনকে। ঠিক এক বছর আগে এই দিনে যে মায়ের কোল আলো করে তোমার জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানো হতো, আজ সেই জরাজীর্ণ ঘরের কোণে বসে তোমার বৃদ্ধা মা তোমার একজোড়া পুরোনো জুতো বুকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে ডুকরে কাঁদছেন। চারপাশের মানুষ যখন ক্ষমতার ভাগাভাগি আর মেকি উৎসবে মত্ত, তখন তোমার শূন্য পড়ার টেবিল, তোমার ব্যবহৃত কলম আর ডায়েরির প্রতিটি পাতা যেন এক জীবন্ত কান্নায় ভেঙে পড়ছে। আমরা কি তবে এমন এক নির্মম ও আত্মবিস্মৃত যুগে বাস করছি যেখানে একটি খাঁটি রক্তের আত্মত্যাগ আর বুদ্ধিবৃত্তিক দর্শনকে আমরা প্রথাগত রাজনীতির লোভের চাদরে ঢেকে দিচ্ছি? এই দৃশ্যটি কোনো কাল্পনিক গল্প নয়, বরং আমাদের সমাজের এক অসাম্প্রতিক, বুকফাটা হাহাকার ও বাস্তবতার সবচেয়ে নির্মম দর্পণ।
জাতির অপূরণীয় ক্ষতির মহাকাব্য
আমরা যদি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি ফাউন্ডেশনের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করি, তবে এই অপূরণীয় মেধা ও সামাজিক ক্ষতির আসল কঙ্কালটি দেখতে পাব। এই তরুণেরা যখন দেশের জন্য বুক পেতে দিয়েছিল, তখন তাদের মধ্যে ওসমান হাদী ছিলেন তাত্ত্বিক মননশীলতার এক অনন্য প্রতীক। চব্বিশের সেই রক্তঝরা ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর সমাজবিজ্ঞানীদের প্রারম্ভিক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, সঠিক নেতৃত্ব এবং বুদ্ধিবৃত্তিক মূল্যায়ন কাঠামোর অভাবে বিপ্লব-পরবর্তী এই ১৮ মাসে দেশের যুবসমাজের একটি বড় অংশ চরম হতাশা ও দিকভ্রান্তির মধ্যে পতিত হয়েছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (BIDS)-এর ২০২৬ সালের ‘জাতীয় বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষয় ইনডেক্স’ অনুযায়ী, শহীদ ওসমান হাদীর মতো প্রতিভাবান চিন্তাবিদদের অকাল প্রয়াণে দেশের উচ্চশিক্ষা ও সামাজিক সংস্কারের গতিপথ অনেকটাই থমকে দাঁড়িয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, তাঁর ব্যক্তিগত ডায়েরিতে থাকা রাষ্ট্র সংস্কারের মৌলিক প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক রূপরেখাগুলো আজ ফাইলবন্দি হয়ে ধুলো জমছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিসি রিসার্চ সেন্টারের সর্বশেষ মনস্তাত্ত্বিক সমীক্ষা থেকে দেখা যায় যে, হাদীর মতো একজন নিঃস্বার্থ ও আদর্শিক শিক্ষকের চিরবিদায়ের পর তাঁর সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক গভীর মানসিক অবসাদ তৈরি হয়েছে। এই যে পদ্ধতিগত ও মননশীল অবক্ষয়, তা আমাদের পুরো জাতিকে এক গভীর অন্ধকারের সংকটে ফেলছে।
হাদী ছিলেন বাংলার বাস্তবমুখী ধারায়
আমরা সমাজতাত্ত্বিক, দার্শনিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখতে পাই, শহীদ ওসমান হাদীর জীবন ও কর্মের প্রতিটি পরত ছিল এই পচা-গলা সমাজের বিরুদ্ধে এক নীরব এবং তীব্র বুদ্ধিবৃত্তিক বিদ্রোহ। তিনি কেবল রাজপথের লড়াকু সৈনিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন এই বন্ধ্যা গণ্ডির ভেতর এক নতুন ভোরের রূপকার। রাষ্ট্র পুনর্গঠনে তিনি প্লেটোর 'রিপাবলিক'-এর ন্যায়পরায়ণতা এবং আল্লামা ইকবালের 'খুদি' বা আত্মদর্শনের মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙার আগে মনের শৃঙ্খল ভাঙা জরুরি, তাই তরুণ সমাজকে রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি থেকে মুক্ত করে স্বাধীনচেতা নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার এক সুনিপুণ মনস্তাত্ত্বিক ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করেছিলেন। তিনি মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার তাত্ত্বিক কাঠামো তৈরি করেছিলেন, যেখানে ক্ষমতার চাবিকাঠি কোনো চাটুকার বা অর্থলোভীর হাতে থাকবে না।
জুলাই-পরবর্তী সময়ে যখন চারদিকের মানুষ বড় বড় পদের হাতছানি আর ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে দৌড়াচ্ছিল, তখন তিনি সব লোভ হেলায় পায়ে ঠেলে দিয়ে মাঠের একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে কাজ করে গেছেন। নিজের জীবনযাপনে এনেছিলেন এক পরম সুফিবাদী সাদামাটা ভাব; এক চিলতে ঘর, সাধারণ পোশাক আর যৎসামান্য আহারেই তিনি কাটিয়ে দিতেন দিনের পর দিন। প্রাতিষ্ঠানিক ফান্ড বা দুস্থদের জন্য আসা অনুদানের একটা একক পয়সাও কখনো নিজের বা পরিবারের পেছনে ব্যয় করেননি। একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি অন্তর থেকে বিশ্বাস করতেন, দেশের মেরুদণ্ড সোজা করতে হলে বর্তমান ঘুণে ধরা শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। বিজাতীয় অপসংস্কৃতির আগ্রাসনে যখন যুবসমাজ দিশেহারা, তখন তিনি আমাদের হাজার বছরের নিজস্ব ঐতিহ্য ও নৈতিকতাকে পুনরুজ্জীবিত করার লড়াই চালিয়েছিলেন। তিনি তাঁর প্রিয় ছাত্রদের শেখাতেন যে, সততাহীন মেধা সমাজের জন্য সবচেয়ে বড় অভিশাপ, কারণ চোর যদি শিক্ষিত হয়, তবে সে কলম দিয়ে কোটি মানুষের অধিকার চুরি করে।
তাঁর ডায়েরির পাতায় রক্ত দিয়ে লেখা ছিল একটি আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার সম্পূর্ণ গাইডলাইন। সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি, দর্শন ও ভূ-রাজনীতির ওপর প্রায় ৩,০০০ বইয়ের এক বিরল সংগ্রহ ছিল তাঁর ব্যক্তিগত পাঠাগারে। বিশ্বের সফল বিপ্লবের ইতিহাস ও কালজয়ী সমাজতাত্ত্বিক প্রবন্ধগুলো বাংলায় রূপান্তরের এক গোপন প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। তিনি বলতেন যে, ভেতরে স্রষ্টার প্রতি ভয় এবং মানুষের প্রতি খাঁটি ভালোবাসা ছাড়া জনসেবা অসম্ভব। নিজের উপার্জনের সিংহভাগ টাকা তিনি সম্পূর্ণ গোপনে বিলিয়ে দিতেন দুস্থ ও অসহায় শিক্ষার্থীদের মাঝে। শহরের ফুটপাতে শুয়ে থাকা গৃহহীন মানুষের দুঃখ নিজে অনুধাবন করার জন্য মাঝেমধ্যেই গভীর রাতে ছদ্মবেশে শহরের অলিগলিতে ঘুরে বেড়াতেন এই মহান মানুষটি।
এক বুকফাটা নীরবতা
আমরা যখন সেই অভিশপ্ত মুহূর্তের কথা স্মরণ করি, তখন পাথরের বুকও ফেটে জল আসে। যে মানুষটি সারাটা জীবন মানুষের অধিকারের কথা বললেন, সেই মানুষটির বুক ঝাঁঝরা করে দেওয়া হলো বুলেটের আঘাতে। যখন তাঁর রক্তাক্ত দেহটি পিচঢালা রাজপথে পড়ে ছিল, তখনও তাঁর এক হাত শক্ত করে চেপে ধরেছিল তাঁরই লেখা সেই স্বপ্নের ডায়েরিটি। পশুর চেয়েও নিষ্ঠুরভাবে তাঁর সেই নিষ্পাপ দেহটাকে যখন মর্গে নেওয়া হচ্ছিল, তখন আকাশের সূর্যটাও যেন মুখ লুকিয়ে কেঁদেছিল। কসাইয়ের চেয়েও নিষ্ঠুর একদল হায়েনার দল তাঁর মেধা ও তাঁর কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দিল।
সবচেয়ে বড় ট্রমা হলো তাঁর সেই বৃদ্ধ বাবার জন্য, যিনি নিজের কাঁধে করে তাঁর একমাত্র প্রজ্ঞাবান সন্তানের লাশের খাটিয়া বহন করেছেন। কবরের অন্ধকার মাটিতে যখন তাঁকে শুইয়ে দেওয়া হচ্ছিল, তখন উপস্থিত হাজারো মানুষের কান্না আর আকাশের বাতাস মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। আমরা কি তবে তাঁর রক্তের সাথে বেইমানি করছি? আজ ক্ষমতার মসনদে বসে যারা বড় বড় বুলি আওড়াচ্ছেন, তারা কি একবারও শহীদ ওসমান হাদীর সেই ছেঁড়া জামা আর তাঁর মায়ের শূন্য চোখের জলের হিসাব রেখেছেন?
এক চিরন্তন শূন্যতার আর্তি
বিপ্লবের এতগুলো মাস পার হয়ে গেলেও আজ প্রতিটি স্তরে শুধু হাদির অনুপস্থিতি আমাদের কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। তাঁর ব্যক্তিগত পাঠাগারের বইগুলো আজ একা একা কাঁদে, ধুলোবালি জমে নষ্ট হচ্ছে তাঁর সেই অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপিগুলো। আমরা আজ সোশ্যাল মিডিয়ায় শো-অফ করি, ফেসবুকে বিপ্লবের বড় বড় ছবি দিই, কিন্তু হাদির সেই গোপন কল্যাণ তহবিলের এতিম শিশুগুলো আজ টাকার অভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাঁদছে। চামড়া শিল্পের মতো দেশের মননশীলতার খাতগুলো আজ ধ্বংসের মুখে, কারণ হাদীর মতো দূরদর্শী চিন্তাবিদেরা আজ মাটির নিচে শুয়ে আছেন। আমরা আজ উৎসব করি, ক্ষমতার দম্ভ দেখাই, কিন্তু হাদির সেই শূন্য ঘর আমাদের নৈতিক দেউলিয়া পনাকেই উপহাস করে।
আজ তাঁর জন্মদিনে দাঁড়িয়ে আমাদের কলিজা ছিঁড়ে যায় যখন দেখি, তাঁর খুনিরা আজও বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়, আর হাদির ডায়েরির পাতাগুলো অযত্নে এক কোণে পড়ে থাকে। হে অকুতোভয় সিপাহসালার, তুমি ওপারে ভালো থেকো। এই স্বার্থপর, ভোগবাদী সমাজ হয়তো তোমার মর্ম বোঝেনি, কিন্তু এই বাংলার মাটি ও নদী কোনোদিন তোমার রক্তের ঋণ ভুলবেনা।
স্ট্যাটিক্যাল তথ্যের গভীর বিশ্লেষণ
এই মহান মেধার ত্যাগের মূল্য এবং দেশের সামষ্টিক সামাজিক অবস্থা বুঝতে আমাদের কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ও সোর্সভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক ডাটার দিকে নজর দিতে হবে:
বিআইডিএস (BIDS) প্রতিবেদন: ২০২৬ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশের মেধাবী তরুণদের প্রায় ৪২% এখন বিদেশের মাটিতে ক্যারিয়ার গড়তে আগ্রহী, যা হাদীর মতো প্রেরণাদায়ী নেতৃত্বের অভাবকে নির্দেশ করে।
শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS): উচ্চশিক্ষা স্তরে গবেষণায় বরাদ্দকৃত বাজেটের মাত্র ১৮% ব্যবহৃত হচ্ছে প্রকৃত মৌলিক চিন্তায়, যা হাদীর তাত্ত্বিক দর্শনের সাথে সাংঘর্ষিক।
মানসিক স্বাস্থ্য উইং (MoHFW): বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী বিষণ্ণতার হার গত এক বছরে ১৫% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নৈতিক শিক্ষক ও পথপ্রদর্শকের অভাবে ঘটছে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন: বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে রাজনৈতিক সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রায় ৬০% এখনও সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনর্বাসনের অপেক্ষায়।
গবেষণা জার্নাল 'সোসিও-ইকোনমিক রিভিও': তৃণমূল পর্যায়ে পাঠাগার ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সংখ্যা গত দশকে ৩০% হ্রাস পেয়েছে, যার ফলে তরুণরা অপসংস্কৃতির দিকে ঝুঁকছে।
সমাজসেবা অধিদপ্তর: ব্যক্তিগত পর্যায়ের গোপন দাতব্য তহবিলগুলোর মাধ্যমে বছরে প্রায় ২০০ কোটি টাকার শিক্ষাবৃত্তি অভাবী মানুষের কাছে পৌঁছায়, যা হাদীর রেখে যাওয়া আদর্শের একটি অংশ।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর: নেতৃত্বের প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারী তরুণদের মধ্যে ৬৫% মনে করেন যে বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামো তাদের মেধার সঠিক মূল্যায়ন করছে না।
ইবাদতের মননশীলতা
আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের বলছে জগত এখন ‘ডিজিটাল রূপান্তর’ ও ক্ষমতার আধুনিকায়নের দিকে যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের সমাজ আজও অ্যানালগ যুগের সেই আদিম জাঁকজমক ও চরম স্বার্থপরতার বৃত্তেই আটকে আছে। আমাদের প্রজ্ঞা আজ আমাদের বলছে—জাতীয় পুনর্গঠনের এই আঙিনা সোনার হলেও তা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ যদি সেখানে ‘শহীদদের রক্তের প্রতি সততা ও সহমর্মিতার’ অভাব থাকে।
নিজের মুখোমুখি হওয়া মানে হলো এই যৌথ সামাজিক ব্যর্থতার দায় স্বীকার করা। ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের যে শৃঙ্খলার পাঠ দেয়, তা যেন কেবল পাঠ্যবইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং আমাদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি স্তরে প্রতিফলিত হয়। ২০২৬ সালের এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমাদের প্রজ্ঞা বলছে, লোকদেখানো বড় বড় বুলি আর ক্ষমতার চেয়ে একটি পরিচ্ছন্ন, সৎ ও পবিত্র নিয়তই স্রষ্টার কাছে এবং দেশের মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় ইবাদত।
যখন মাটি ও নদী কথা বলবে
কল্পনা করুন, ২০৩০ সালের একটি সকাল। হাদীর আদর্শকে পুরোপুরি ভুলে যাওয়ার কারণে আপনার চারপাশের সমাজটা সম্পূর্ণ নৈতিকভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। চারদিকে শুধু লোভ, দুর্নীতি আর ক্ষমতার নগ্ন নৃত্য। আপনার নিজের সন্তানই এক তীব্র নৈতিকতাহীন ও হিংস্র অমানুষ হিসেবে বড় হয়ে আপনার বুকেই ছুরি বসাচ্ছে। তখন কি আপনি আপনার এই বিলাসবহুল জীবন আর ক্ষমতার চেয়ার তৃপ্তি সহকারে ভোগ করতে পারবেন? আমরা কি সত্যিই একটি সুস্থ ও বৈষম্যহীন সমাজ হিসেবে বাঁচতে চাই, নাকি কেবল একটি ভোগবাদী উৎসবে মেতে উঠে নিজেদের ভবিষ্যৎকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে চাই? যখন এই দেশের মাটি ও নদী কথা বলবে, তখন শহীদ ওসমান হাদির রক্তের এক একটি ফোঁটা আমাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেবে।
সুন্দর এক প্রাণবন্ত উপসংহার
দিনশেষে, ২০২৬-২৭ অর্থ বছরের এই ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে আমাদের একটি রূঢ় সত্য বুঝতে হবে যে, পৃথিবীর কোনো বাহ্যিক শক্তি বা শাসক আপনার সমাজকে সুন্দর করতে পারবে না, যদি না আপনার নিজের মানসিকতার পরিবর্তন হয়। এই যান্ত্রিক ভোগবাদের মায়া আমাদের চোখে ধাঁধা লাগিয়ে দিয়েছে, তাই আমরা আজ জীবন্ত আলোকবর্তিকাদের ভুলে কাগজের প্রদীপের পেছনে ছুটছি। কিন্তু সত্য হলো, শহীদ ওসমান হাদী কোনো সাধারণ মানুষ ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি চেতনা। এই সামষ্টিক উদাসীনতা আসলে আমাদের নৈতিক দেউলিয়া শক্তিরই বহিঃপ্রকাশ।
আপনি যদি কেবল ক্ষমতার আকার আর পদের ওজন দিয়ে হাদির মতো শহীদদের মূল্যায়ন করেন, তবে আপনি কখনোই এই স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ পাবেন না। প্রজ্ঞা কেবল আইনের কিতাবে নেই, প্রজ্ঞা আছে একটি মানুষের প্রতি মানবিক হওয়া এবং শহীদদের পরিবারের অধিকার রক্ষা করার মাঝে। মনে রাখবেন, খাঁচা সোনার হলেও তা শেষ পর্যন্ত খাঁচাই; আর বিপ্লবের আসল সৌন্দর্য তার বিনয়ী ও ত্যাগী পথচলায়। আসুন আমরা সাশ্রয়ী হই অহংকারে, আর ইনভেস্ট করি হাদির দর্শনে। আজই আপনার জীবনের লক্ষ্যটি নতুন করে সাজান; হাদির স্বপ্নের ডায়েরিটি নিজের বুকে ধারণ করুন। সেই আত্মশুদ্ধি ও ত্যাগের শিক্ষাই হোক আপনার আগামীর শ্রেষ্ঠ ইবাদত এবং আমাদের সমাজ ও বিপ্লবের প্রকৃত সজীবতার একমাত্র পথ।
লেখক
ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব
সহকারী অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
দাউদ ইব্রাহিম হাসান,
রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
