

এস এম নজরুল ইসলাম, গোপালগঞ্জ: শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে নিজেদের দক্ষ ও যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারবে। এর ফলে তারা মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করে দেশ ও জাতির উন্নয়নে অবদান রাখার পাশাপাশি ব্যক্তিগত সাফল্যও অর্জন করতে সক্ষম হবে। বর্তমান বিশ্ব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি-নির্ভর। আমাদের শিক্ষার্থীরা যাতে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে পারে, সে লক্ষ্যেই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এই বিজ্ঞানবিষয়ক সংলাপের উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। আমি আশা করছি, এ ধরনের উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানচর্চা ও জ্ঞানার্জনের প্রতি আরও বেশি আগ্রহী করে তুলবে।
এমনটি বলেছেন গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক আরিফ-উজ-জামান। গোপালগঞ্জ জেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আয়োজিত বিজ্ঞান ও মহাকাশবিষয়ক ব্যতিক্রমধর্মী সংলাপ ‘মহাবিশ্বের অনন্ত যাত্রা’ নিয়ে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
জেলা প্রশাসক আরো বলেন, বর্তমান যুগের শিক্ষার্থীদের একটি অংশ সোশ্যাল মিডিয়া ও আধুনিক প্রযুক্তির নেতিবাচক ব্যবহারে মেতে থেকে কেবল গেমস, নাচ-গান ও বিনোদনেই তাদের মূল্যবান সময় পার করছে। অথচ এই সোশ্যাল মিডিয়া ও ইউটিউবকে সঠিক উপায়ে ব্যবহার করে বিজ্ঞানের বিস্ময়কর সব আবিষ্কার সম্পর্কে জানা যায় এবং পৃথিবী, মহাকাশ ও সৌরজগৎ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান লাভ করা সম্ভব, তা অধিকাংশ শিক্ষার্থীরই ধারণার বাইরে। শিক্ষার্থীদের মাঝে বিজ্ঞানের প্রতি এই সুপ্ত আগ্রহ জাগিয়ে তুলতে এবং নতুন নতুন আবিষ্কারের অনুপ্রেরণা জোগাতেই জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই ব্যতিক্রমী সংলাপের আয়োজন বলে জানান তিনি।
জেলা প্রশাসক মো. আরিফ-উজ-জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এসব সংলাপে সমাজের বিভিন্ন স্তরের সুধীজন উপস্থিত ছিলেন। এই আয়োজনে জেলার বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ, সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ, বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদস্যবৃন্দ এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ অংশ নেন। এছাড়াও প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসব সংলাপে যুক্ত হয়ে তাদের মতামত তুলে ধরেন।
এই ইতিবাচক উদ্যোগের ফলে দিনশেষে শিক্ষার্থীদের মেধার বিকাশের পাশাপাশি দেশেরও এক বিরাট কল্যাণ সাধিত হবে বলে অভিভাবকবৃন্দ ও সচেতন মহল মনে করছেন। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও শিক্ষকবৃন্দ এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন।
ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসক জেলার বীনাপানি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, স্বর্ণকলি উচ্চ বিদ্যালয়, কাজুলিয়া এসইএসডিপি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়, যুগশিখা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, জেলা প্রশাসন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ওহাব আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, ঊলপুর পূর্ণ চন্দ্র বিদ্যালয়, টুঙ্গিপাড়া সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, বাঘিয়ার ঘাট স্কুল অ্যান্ড কলেজ, নওহাটা এ আর এম উচ্চ বিদ্যালয়, ওহাব আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, এম এ খালেক সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং এস এম মডেল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাথে সংলাপ সম্পন্ন করেছেন। এসব আয়োজনে জেলা প্রশাসক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের নানা প্রশ্নের উত্তর দেন।

সংলাপে অংশ নেওয়া যুগশিখা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী প্রত্যাশা তার অনুভূতি ব্যক্ত করে বলে, জেলা প্রশাসন কর্তৃক এমন আয়োজন সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। শিক্ষাজীবনে এই প্রথম বিজ্ঞান ও মহাবিশ্ব নিয়ে এত বিস্তারিত আলোচনা শোনার সুযোগ পেলাম। এতে আমরা সব শিক্ষার্থীই অত্যন্ত উপকৃত হয়েছি।
জেলা প্রশাসন স্কুল অ্যান্ড কলেজের উপাধ্যক্ষ প্রফেসর মাসুদ আহম্মেদ এবং যুগশিখা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হরিশঙ্কর বিশ্বাস জেলা প্রশাসনের এই আয়োজনকে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, প্রথাগত চার দেয়ালের ক্লাসরুমের বাইরে এসে সরাসরি জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে বিজ্ঞান ও মহাবিশ্ব সম্পর্কে জানার এই সুযোগ শিক্ষার্থীদের চিন্তা জগতের এক বিশাল দুয়ার খুলে দিয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটবে এবং নতুন নতুন উদ্ভাবন ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের প্রতি তাদের আগ্রহ বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
বীনাপানি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা নিভা বিশ্বাস জানান, এই সংলাপের পর শিক্ষার্থীরা নতুন কিছু শেখা ও আবিষ্কারের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে শুরু করেছে। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে এ ধরনের আয়োজন শিক্ষার্থীদের প্রতারণার হাত থেকেও রক্ষা করবে।
এদিকে শহরের পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুলগুলোতেও এইরূপ সংলাপ আয়োজনের দাবি উঠেছে। সদর উপজেলার টুঠামান্দ্রা হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক প্রদ্যুৎ কুমার বলেন, ফেসবুকের মাধ্যমে জেলা প্রশাসক মহোদয়ের এই উদ্যোগের কথা জানতে পেরে আমাদের শিক্ষার্থীরাও এই সংলাপে অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করছে।
একই স্কুলের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী এস এম মাঈনুল ইসলাম কিছুটা আক্ষেপের সুরে বলে, সাধারণত সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে আয়োজিত সকল বড় প্রোগ্রাম, সংলাপ, সেমিনার শহরের স্কুলগুলোতেই হয়। আমরা মফস্বলের শিক্ষার্থীরা এরূপ অনুষ্ঠান থেকে বরাবরই বঞ্চিত হই। আমাদের দাবি, জেলা প্রশাসক স্যার যেন আমাদের স্কুলেও এই ধরণের শিক্ষণীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন।
শুধু জেলা প্রশাসনই নয়, সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা যদি মাঝেমধ্যে জেলার সকল স্কুল-কলেজে গিয়ে বিজ্ঞান, আইন-শৃঙ্খলা ও সামাজিক সচেতনতা, গণিত এবং নীতি-নৈতিকতা বিষয়ক সেমিনার পরিচালনা করেন, তবে আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনে আরও দক্ষ, যোগ্য ও আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার প্রেরণা পাবে এমনটি প্রত্যাশা জেলার সচেতন মহলের।
