

মেহেদী হাসান, পুঠিয়া (রাজশাহী) প্রতিনিধি: বাগানে আমের প্রাচুর্য। গাছভর্তি ফল দেখে মৌসুমের শুরুতে স্বপ্ন বুনেছিলেন চাষিরা। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন যেন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যাচ্ছে। রাজশাহীর পুঠিয়ায় চলতি মৌসুমে আমের বাম্পার ফলন হলেও বাজারে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত দাম। তার উপর পাইকারদের অতিরিক্ত ‘ঢলন’ নেওয়ার প্রথা চাষিদের ক্ষোভ ও হতাশা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
পুঠিয়া ও আশপাশের আমবাগানগুলোতে এ বছর ফলন হয়েছে আশানুরূপ। কৃষি বিভাগের হিসাবও বলছে, উৎপাদনের দিক থেকে মৌসুমটি বেশ সফল। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন। আম নিয়ে বাজারে এলেও অনেক চাষিকেই ফিরতে হচ্ছে মন খারাপ করে। কারণ, উৎপাদন খরচের সঙ্গে বিক্রয়মূল্যের ফারাক দিন দিন বাড়ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, চলতি বছরের তীব্র গরমে বিভিন্ন জাতের আম প্রায় একই সময়ে পেকে গেছে। ফলে মৌসুমের শুরুতেই বাজারে তৈরি হয়েছে আমের বাড়তি সরবরাহ। এর সঙ্গে ঈদুল আজহার ছুটিতে দেশের বিভিন্ন এলাকার পাইকারি ক্রেতারা নিয়মিত বাজারে না আসায় বিক্রি কমে যায়। ঈদের পরও বাজারে প্রত্যাশিত সংখ্যক ক্রেতা না ফেরায় দামের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
চাষিদের অভিযোগ, গত বছরের তুলনায় এ বছর অনেক জাতের আমের দাম প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। তার উপর প্রতি মণ আমের সঙ্গে অতিরিক্ত চার থেকে পাঁচ কেজি করে ‘ঢলন’ দিতে হচ্ছে। ফলে একদিকে কম দাম, অন্যদিকে অতিরিক্ত ওজন—দুই দিক থেকেই লোকসানের মুখে পড়ছেন তারা।
পুঠিয়া উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ বছর উপজেলায় ১ হাজার ৫৪০ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে গড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১২ দশমিক ৫ মেট্রিক টন। সেই হিসেবে মোট উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ১৯ হাজার ২৫০ মেট্রিক টনে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন ভালো হলেও বাজারে চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত সরবরাহ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
বর্তমানে বানেশ্বর আমবাজারে প্রতি মণ গোপালভোগ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায়, লোকনা ৬৫০ থেকে ৮৫০ টাকায়, খিরসা ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকায়, ল্যাংড়া ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায় এবং রানীপ্রসাদ ৮০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায়। জুনের শেষ দিকে বাজারে আসার কথা থাকলেও ইতিমধ্যে কিছু ফজলি আমও বাজারে উঠেছে। ফজলির দাম প্রতি মণ ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। তবে গত কয়েক দিনের তুলনায় খিরসা আমের দামে সামান্য ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে।
পুঠিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা স্মৃতি রানী বলেন, ‘‘এ বছর ফলন ভালো হয়েছে। তবে অতিরিক্ত গরমে মানুষের আম কেনার আগ্রহ কিছুটা কমে গেছে। বাজারে চাহিদার ঘাটতির কারণেই মূলত দরপতন ঘটেছে। তবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বাজার পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করছি।’’
আমের জন্য খ্যাত রাজশাহীর এই জনপদে এখন এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। বাগানে ফলের প্রাচুর্য, কিন্তু চাষির মুখে নেই তৃপ্তির হাসি। তাঁদের আশা, দ্রুত বাজারে ক্রেতা ফিরবে, দাম বাড়বে এবং মৌসুমের শেষভাগে হলেও ঘুরে দাঁড়াবে পুঠিয়ার আমের বাজার।
