

২০২২ কাতার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে টাইব্রেকারে সেই হৃদয়বিদারক পরাজয়। নেইমারের চোখে জল, আর কোটি সেলেসাও ভক্তের বুকে হেক্সা (ষষ্ঠ বিশ্বকাপ) জয়ের স্বপ্নভঙ্গের বেদনা। ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে এই আক্ষেপ নতুন কিছু নয়। ২০০২ সালে শেষবার সোনালী ট্রফিটা ছোঁয়ার পর থেকে গত দুই দশক ধরে প্রতিবারই ফেবারিট হিসেবে যাত্রা শুরু করে সেলেসাওরা, কিন্তু নকআউট পর্বের কোনো এক পেনাল্টি শুটআউট বা রক্ষণভাগের সামান্য ভুলে থমকে যায় সব স্বপ্ন। কাতার বিশ্বকাপের পর তিতে অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। এরপর দীর্ঘ আলোচনা, জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ব্রাজিলের ডাগআউটের দায়িত্ব নেন রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক মাস্টারমাইন্ড কোচ কার্লো আনচেলত্তি।
আমেরিকা, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে আসন্ন ২০২৬ বিশ্বকাপে এবার সম্পূর্ণ নতুন এক রূপান্তর ও ভিন্ন ট্যাকটিকস নিয়ে মাঠে নামছে ব্রাজিল। গ্রুপ ‘ডি’-তে সেলেসাওদের মিশন শুরু হচ্ছে আগামী ১৩ জুন, যেখানে নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে তাদের প্রথম প্রতিপক্ষ মরক্কো। এরপর ১৯ জুন ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়ামে তারা মুখোমুখি হবে হাইতির। আর ২৪ জুন মায়ামি স্টেডিয়ামে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে লড়বে কার্লো আনচেলত্তির দল।
কিন্তু কেমন হতে যাচ্ছে আনচেলত্তির ব্রাজিলের বিশ্বকাপ রণকৌশল? রিয়াল মাদ্রিদে সফলতার পাহাড় গড়া এই ইতালিয়ান কোচের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো— তিনি কোনো নির্দিষ্ট ছকে খেলোয়াড়দের আটকে রাখেন না। বরং খেলোয়াড়দের নিজস্ব সৃজনশীলতা ও পারস্পরিক রসায়নকে বেশি প্রাধান্য দেন, যাকে ফুটবলের ভাষায় বলা হয় ‘রিলেশনাল প্লে’।
আসন্ন বিশ্বকাপে বল পজিশন বা আক্রমণে থাকার সময় ব্রাজিলের মূল ফর্মেশন হতে পারে ৪-৩-৩। তবে মাঠের খেলায় এটি দ্রুত রূপ নেবে ৩-৩-৪ কিংবা ২-৩-৫ ফর্মেশনে, যেখানে উইঙ্গার ও ফুলব্যাকরা ওপরে উঠে এসে প্রতিপক্ষের ডিফেন্সে ঝড় তুলবেন। আবার যখন দল বল হারিয়ে রক্ষণে মনোযোগ দেবে, তখন আনচেলত্তির দল দ্রুত নেমে আসবে একটি কমপ্যাক্ট ৪-৪-২ ব্লকে। দুই প্রান্তের উইঙ্গাররা নিচে নেমে এসে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারদের সাথে যোগ দিয়ে প্রতিপক্ষের পাসিং লেনগুলো পুরোপুরি বন্ধ করে দেবেন। প্রয়োজনে বড় ম্যাচে রিয়ালের মতো এখানেও তিনি ৫-৪-১ বা ৪-৪-২ এর গভীর রক্ষণাত্মক ব্লক ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করার সুযোগ দিয়ে মোক্ষম কাউন্টার অ্যাটাকের জন্য ওত পেতে থাকবেন।
এই মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে আনচেলত্তির স্কোয়াডে রয়েছে অভিজ্ঞ ও তরুণের দুর্দান্ত এক মিশ্রণ। গোলপোস্টের নিচে ব্রাজিলের গোলকিপিং পজিশন নিয়ে বিশ্বের যেকোনো দল হিংসা করতে পারে। অ্যালিসন ও এদেরসনের মতো বিশ্বের সেরা দুই গোলরক্ষক রয়েছেন স্কোয়াডে, সাথে অভিজ্ঞ ওয়েভারটন। রক্ষণে মারকুইনোস, গ্যাব্রিয়েল মাগালেস এবং ব্রেমারের মতো বিশ্বমানের সেন্টারব্যাক থাকলেও ব্রাজিলের মূল দুর্বলতার জায়গা হতে পারে তাদের ফুলব্যাক বা উইংব্যাক পজিশন। দানিলোর অভিজ্ঞতা কিংবা অ্যালেক্স সান্দ্রোর উপস্থিতি সত্ত্বেও আধুনিক ফুটবলের গতিশীল উইংব্যাকদের সাথে গতিতে কতটা তারা টেক্কা দিতে পারবেন, তা নিয়ে কিছুটা সংশয় রয়েছে। বিশেষ করে আনচেলত্তির কৌশলে যখন ফুলব্যাকদের ‘আন্ডারল্যাপ’ ও ওভারল্যাপ করে ওপরে উঠতে হয়, তখন কাউন্টার অ্যাটাকের সময় রক্ষণভাগ অরক্ষিত হয়ে পড়ার একটি দুর্বলতা থেকে যায়।
মিডফিল্ডে অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়ে থাকছেন ক্যাসেমিরো এবং ফ্যাবিনিও। তাদের সাথে ব্রুনো গিমারায়েস এবং লুকাস পাকেতার মতো ক্রিয়েটিভ মিডফিল্ডাররা যোগ দেবেন। আনচেলত্তি এখানে তার প্রিয় ‘অ্যাসাইমেট্রিক’ বা ডায়মন্ড মিডফিল্ড রোল ব্যবহার করতে পারেন, যেখানে পাকেতা বা নেইমারকে স্ট্রাইকারদের ঠিক পেছনে ফ্রি-রোমিং ‘প্লেমেকার’ হিসেবে খেলানো হতে পারে।
তবে এবারের ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা তাদের বিধ্বংসী আক্রমণভাগ। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও এন্ড্রিক মতো তারকাদের রিয়াল মাদ্রিদে খুব কাছ থেকে গড়ে তুলেছেন আনচেলত্তি। ভিনির গতি আর ড্রিবলিং হবে ব্রাজিলের কাউন্টার অ্যাটাক ভিত্তিক ফুটবলের প্রধান অস্ত্র। আক্রমণভাগে আরও থাকছেন গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি এবং তরুণ সেনসেশন এন্ড্রিক ও রায়ান।
সবচেয়ে বড় কৌতূহল থাকছে নেইমার জুনিয়রকে নিয়ে। নেইমারকে কোন পজিশনে খেলাবেন আনচেলত্তি, তবে সান্তোস এফসিতে নেইমার আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার এবং ফরোয়ার্ড প্রধানত একজন লেফট উইঙ্গার বা সেন্টার-স্ট্রাইকার হিসেবে খেলছেন তিনি। তবে একই পজিশন এ খেলেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়রও। আনচেলত্তির স্বাধীন ও মুক্ত ঘরানার ফুটবলে নেইমার হতে পারেন নিখুঁত এক ‘নাম্বার টেন’, যিনি মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগের সেতু হিসেবে কাজ করবেন।
বিগত বিশ্বকাপগুলোর ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে, রক্ষণ আর আক্রমণের ভারসাম্য বজায় রেখে আনচেলত্তি কি পারবেন ব্রাজিলের হেক্সা জয়ের স্বপ্ন পূরণ করতে? মরক্কো, হাইতি আর স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলোতেই মিলবে তার প্রথম আভাস। নেইমারের অভিজ্ঞতা আর ভিনিসিয়ুস-এন্ড্রিকদের তারুণ্যের শক্তিতে ভর করে কার্লো আনচেলত্তির ব্রাজিল এবার বিশ্বজয়ের নতুন গল্প লিখতে পুরোপুরি প্রস্তুত।

