

নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর: ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট), গাজীপুরে নতুন ভিসি নিয়োগকে কেন্দ্র করে চলমান আন্দোলন রোববার দফায় দফায় সংঘর্ষে রূপ নেয়। সকাল থেকে উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে ক্যাম্পাসজুড়ে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। আহত হয়েছেন পুলিশ সদস্যরাও। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ক্যাম্পাস ও আশপাশ এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সন্ধ্যা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল।
সরকার সম্প্রতি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবালকে ডুয়েটের নতুন ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেয়। নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনে নামে। গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন, সড়ক অবরোধ, প্রতিবাদ সমাবেশ ও ‘লাল কার্ড’ কর্মসূচিসহ বিভিন্ন আন্দোলন কর্মসূচি পালন করে আসছিলেন। তাদের মূল দাবি, ডুয়েটের ভিসি ডুয়েটের অভ্যন্তরীণ জ্যেষ্ঠ ও যোগ্য শিক্ষকদের মধ্য থেকেই নিয়োগ দিতে হবে।
পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে রোববার সকাল থেকেই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা শহিদ মিনার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক এলাকায় অবস্থান নেন। একপর্যায়ে নবনিযুক্ত ভিসির যোগদানের খবর ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আন্দোলনকারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন। পরে সেখানে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। সংঘর্ষের সময় দুই পক্ষের মধ্যে ব্যাপক ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সংঘর্ষ চলাকালে পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি হেলমেট পরিহিত কিছু বহিরাগত ব্যক্তিকেও ঘটনাস্থলে দেখা গেছে। তবে তারা কারা বা কোন পক্ষের ছিলেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বহিরাগতদের হামলায় অনেক শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন এবং ক্যাম্পাসে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে তারাও হামলার শিকার হয়েছেন।
একাধিক ভিডিও ফুটেজ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সংঘর্ষের সময় ঢাকা-শিমুলতলী সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে এসএসসি পরীক্ষার্থী, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েন। দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয় আশপাশের এলাকায়।
গাজীপুর সদর মেট্রো থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ আমিনুল ইসলাম জানান, শিক্ষার্থীদের ইট-পাটকেল নিক্ষেপে তিনি নিজেসহ অন্তত পাঁচজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। এছাড়া কয়েকজন পথচারীও আহত হয়েছেন বলে তিনি জানান। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। পুলিশ প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমঝোতার লক্ষ্যে আলোচনা চলছে বলেও জানান তিনি।
গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আরএমও ডাক্তার ফরহাদ হোসেন জানান, হাসপাতালটিতে আহত অবস্থায় অন্তত ৮ শিক্ষার্থী ও ৬ পুলিশ সদস্য চিকিৎসা নিয়েছেন।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা দাবি করেন, তাদের কর্মসূচি সম্পূর্ণ সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন। তারা বলেন, ডুয়েট একটি বিশেষায়িত প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় এখানকার শিক্ষা ব্যবস্থা, গবেষণা কার্যক্রম, প্রযুক্তিনির্ভর একাডেমিক কাঠামো ও প্রশাসনিক বাস্তবতা সম্পর্কে অভ্যন্তরীণ শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা বেশি। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন, গবেষণার পরিবেশ ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে অভ্যন্তরীণ শিক্ষক থেকেই ভিসি নিয়োগ দেয়া প্রয়োজন।
এদিকে সংঘর্ষের ঘটনায় বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন পৃথক পৃথক বিবৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, ডুয়েট শাখার সভাপতি ও সেক্রেটারি এক বিবৃতিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়ে দাবি করেন, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বহিরাগতদের মাধ্যমে হামলা চালানো হয়েছে। তারা হামলায় জড়িতদের দ্রুত চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
পরে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি, নূরুল ইসলাম ও সেক্রেটারি জেনারেল, সিগবাতুল্লাহ এক যৌথ বিবৃতিতে অভিযোগ করেন, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রদল, যুবদল ও বহিরাগত সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি তারা অভিযোগ করেন, আন্দোলনকারীদের ওপর টিয়ার শেল ও গুলি নিক্ষেপ করা হয়েছে এবং সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেয়া হয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের পক্ষ থেকে দেয়া পৃথক বিবৃতিতে দাবি করা হয়, সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে ছাত্রশিবির সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মী পরিকল্পিতভাবে ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতারা এ ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন। তবে এসব অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের স্বতন্ত্র সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ডুয়েট সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো ও গবেষণাগার উন্নয়নের জন্য প্রায় ৮৬৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকার একটি বড় প্রকল্প বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের একটি অংশের দাবি, এ বড় প্রকল্পকে কেন্দ্র করেও বিভিন্ন মহল সক্রিয় থাকতে পারে। যদিও এ বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, উদ্ভূত পরিস্থিতির মধ্যে নবনিযুক্ত ভিসি ক্যাম্পাসে সরাসরি প্রবেশ না করে ডুয়েট সংলগ্ন ইউএনও অফিসে অবস্থান করে যোগদানপত্রে স্বাক্ষর করেছেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন গাজীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, মোঃ সাজ্জাত হোসেন এবং গাজীপুর সদর মেট্রো থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, মোঃ আমিনুল ইসলাম। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি রাজনৈতিক নয়, উদ্ভূত পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের চেষ্টা চলছে।
এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় উভয়পক্ষ নিজ নিজ অবস্থানে ছিল। ক্যাম্পাসজুড়ে উত্তেজনা বিরাজ করলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে। নবাগত ভিসি ইউএনও অফিসে অবস্থান করছিল। শিক্ষা মন্ত্রণালয় কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তখনও আনুষ্ঠানিক বিস্তারিত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

