

রাণীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধি: একাত্তরের সেই দুঃসহ স্মৃতি আর সমাজের দীর্ঘদিনের অবজ্ঞা সঙ্গী করে লড়াই চালিয়ে যাওয়া অকুতোভয় বীরাঙ্গনা টেপরি রাণী আর নেই। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার নন্দুয়ায় ইউনিয়নের বলিদ্বারা গ্রামে নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর।
বুধবার সকাল ১০টায় পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় এই বীর নারীর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে তাঁকে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদানের মাধ্যমে শেষ বিদায় জানানো হয়। এ সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খাদিজা বেগম, রাণীশংকৈল থানার ওসি (তদন্ত) রফিকুল ইসলামসহ বীর মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
সেই কালরাত ও এক বাবার অসহায়ত্ব
১৯৭১ সালে টেপরি রাণী ছিলেন ১৬-১৭ বছরের এক কিশোরী। এপ্রিলের শেষ দিকে পরিবারের অস্তিত্ব রক্ষায় এক প্রভাবশালী ব্যক্তির কু-পরামর্শে এবং জীবন বাঁচাতে বাবা বাধ্য হয়ে নিজের হাতে আদরের মেয়েকে তুলে দিয়েছিলেন পাকিস্তানি ক্যাম্পে। সেই দুঃসহ যাত্রার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে স্থানীয়রা জানান, ক্যাম্পের পথে বাবা ও মেয়ে কেউ কোনো কথা বলেননি; কেবল চোখের জলে ভিজেছিল পথ। দীর্ঘ সাত মাস সেই নরককুণ্ডে বন্দি থেকে পাকিস্তানি হায়েনাদের পাশবিক নির্যাতনের শিকার হন টেপরি। নিজের সম্ভ্রমের বিনিময়ে সেদিন তিনি আগলে রেখেছিলেন পরিবারের অন্য সদস্যদের প্রাণ।
যুদ্ধশিশুর লড়াই ও সামাজিক গ্লানি
দেশ স্বাধীনের পর অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় যখন বাড়ি ফেরেন, তখন সমাজ তাঁর অনাগত সন্তানকে গ্রহণ করতে চায়নি। ভ্রূণ নষ্ট করার পরামর্শ এলেও বাবা সেদিন মেয়ের পাশে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, এ-ই হবে তোর বেঁচে থাকার অবলম্বন। জন্ম হয় সুধীর বর্মনের। তবে স্বাধীন দেশেও সুধীরকে সইতে হয়েছে চরম সামাজিক গ্লানি। শৈশব থেকেই তাঁকে ‘পাঞ্জাবির বাচ্চা’র মতো নিষ্ঠুর গঞ্জনা শুনতে হয়েছে।
পেশায় ভ্যানচালক সুধীর বর্মন আজ দেশের এক জীবন্ত ইতিহাস। অভাব আর অবহেলার মধ্যেও তাঁর রক্তে বহমান মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার। তাঁর পুরনো বাটন ফোনের রিংটোনে আজও বাজে— ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে…’।
শেষ বিদায়ে রাষ্ট্রীয় সম্মান
দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০১৭ সালে বীরাঙ্গনা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পান টেপরি রাণী। ২০১৮ সালে তাঁর জীবনের আত্মত্যাগের গল্প জনসমক্ষে এলে সারা দেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। তাঁর উত্তরসূরিরা আজ তাঁকে নিয়ে গর্ব করেন। নাতনি ‘জনতা’র কণ্ঠেও ঝরে সেই দৃঢ়তা— দেশের প্রয়োজনে সে-ও দাদীর মতো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত।
বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম বলেন, টেপরি রাণী কেবল একজন নারী নন, তিনি আমাদের স্বাধীনতার এক স্তম্ভ। তাঁর রেখে যাওয়া সন্তান সুধীর বর্মন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস।
জীবদ্দশায় টেপরি রাণীর শেষ ইচ্ছা ছিল লাল-সবুজের পতাকায় মোড়ানো বিদায়। বুধবার সকালে রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনারের মাধ্যমে তাঁর সেই শেষ ইচ্ছা পূরণ হলো। এক বুক অভিমান আর ত্যাগের মহিমা নিয়ে ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে রইলেন ঠাকুরগাঁওয়ের এই বীরাঙ্গনা।

