

জিহাদ রানা, বরিশাল: পদোন্নতির দাবিতে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের চলমান ‘ কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির পর এবার উপাচার্যের বিরুদ্ধে ‘সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের’ ঘোষণা দিয়েছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত শিক্ষকরা।
আজ মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) দুপুর ১২ টার পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন-১ এর নিচতলায় (গ্রাউন্ড ফ্লোর) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন তারা।
গত বুধবার (২২ এপ্রিল) থেকে শুরু হওয়া পূর্ণাঙ্গ কর্মবিরতি ও শাটডাউনের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস-পরীক্ষাসহ সব ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনরত শিক্ষকরা বলেন, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান আপগ্রেডেশন নীতিমালা অনুযায়ী ২০২৪ সালের মধ্যভাগেই অনেক শিক্ষক প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক এবং সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পদে উন্নীত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন। কিন্তু তৎকালীন উপাচার্য ড. শুচিতা শরমিন তার মেয়াদকালে এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেননি। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১৩ মে উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেন প্রফেসর ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম। ততদিনে আরও অনেক শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করেন। তারা বারবার আবেদন জানালেও উপাচার্য নানা টালবাহানায় প্রক্রিয়াটি বিলম্বিত করতে থাকেন।
শিক্ষকরা জানান, নীতিমালা অনুযায়ী কোনো শিক্ষক পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জনের পর ৪৫ দিনের মধ্যে আপগ্রেডেশন বোর্ডের সভা আহ্বানের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা মানা হয়নি। দীর্ঘ বিলম্বের পর ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পদে উন্নীত করার জন্য বোর্ড সভা শুরু করা হয়। তবে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী বোর্ড সভার পরপরই সিন্ডিকেট সভা আহ্বান করে সুপারিশ অনুমোদন দেওয়ার কথা থাকলেও উপাচার্য সেটিও বিলম্বিত করেন। একই সঙ্গে সহকারী থেকে সহযোগী অধ্যাপক পদে উন্নীত করার বোর্ড সভাও আয়োজন করা হয়নি।
তারা আরও বলেন, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট নিরীক্ষায় আসা ইউজিসির কিছু কর্মকর্তার মন্তব্যকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে উপাচার্য পদোন্নতির কার্যক্রম পুরোপুরি স্থগিত করে দেন। পরবর্তীতে ইউজিসির সঙ্গে বৈঠকের পর পাওয়া চিঠির ভিত্তিতে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যাতে বিশ্ববিদ্যালয় আইন নয়, বরং ইউজিসির নির্দেশনা ও উপাচার্যের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
শিক্ষকদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও অনুমোদিত প্রথম সংবিধি অনুযায়ী নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে নিয়োগ বা আপগ্রেডেশন বোর্ড, সিন্ডিকেট ও চ্যান্সেলরের বাইরে অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। অথচ ইউজিসির দোহাই দিয়ে পদোন্নতি কার্যক্রম স্থগিত রাখা হচ্ছে, যা শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আইনগত অধিকারের পরিপন্থী।
সংবাদ সম্মেলনে তারা আরও বলেন, ইউজিসির নির্দেশনার ফলে এখন সংকট শুধু পদোন্নতিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং পুরো একাডেমিক কার্যক্রমই অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ইউজিসির চিঠিতে বলা হয়েছে, চ্যান্সেলরের অনুমোদিত সংবিধি ছাড়া নিয়োগ, পদোন্নতি, পাঠ্যক্রম, পরীক্ষা ও ডিগ্রি প্রদানসহ বিভিন্ন কার্যক্রম বৈধ হবে না। কিন্তু বাস্তবে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই এসব সংবিধি চ্যান্সেলর কর্তৃক অনুমোদিত নয়। ফলে এ নির্দেশনা কার্যকর হলে শিক্ষাক্রম, পরীক্ষা এবং শিক্ষার্থীদের ডিগ্রির বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন শিক্ষকরা।
তারা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫টি বিভাগের মধ্যে প্রায় সবগুলোতেই একাধিক ব্যাচের পাঠদান চলছে, কিন্তু অনেক বিভাগে শিক্ষক সংখ্যা মাত্র তিন থেকে চারজন। একই সঙ্গে প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপক পর্যায়ে অন্তত ৫১টি শূন্যপদ দীর্ঘদিন ধরে পূরণ হয়নি। অনুমোদিত অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী ৪০১টি শিক্ষকের পদ থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে অনুমোদিত রয়েছে মাত্র ২৬৬টি। এই সংকট মোকাবিলায় দ্রুত সব শূন্যপদে নিয়োগের দাবি জানান তারা। পাশাপাশি ইউজিসির লোড ক্যালকুলেশন নীতিমালা অনুযায়ী নির্ধারিত সীমার বাইরে অতিরিক্ত ক্লাস না নেওয়ার সিদ্ধান্তও জানান শিক্ষকরা।
শিক্ষকরা অভিযোগ করে বলেন, উপাচার্য বিভিন্ন সময় শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী, সাংবাদিক ও সংশ্লিষ্টদের কাছে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা পরিবেশ নষ্ট করছেন।
এ অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, স্বায়ত্তশাসন ও শিক্ষার পরিবেশ রক্ষায় বর্তমান উপাচার্যের বিরুদ্ধে ‘সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন’ ঘোষণার কথা জানিয়ে দ্রুত এই সংকট সমাধানে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন আন্দোলনরত শিক্ষকরা।
তবে এ বিষয়ে পৃথক এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে উপাচার্য অধ্যাপক ড.তৌফিক আলম শিক্ষকদের অনুরোধ জানিয়ে বলেন, আপনারা ক্লাস পরীক্ষা বন্ধ রাখবেন না। আমি শিক্ষকদের অনুরোধ করব, এই কর্মকাণ্ড থেকে তারা যেন বিরত থাকে এবং ক্লাস পরীক্ষা যেন চালু করে। যদি এই ধরনের কার্যক্রম চলমান থাকে তাহলে আইনে যে ভাবে লেখা আছে সেভাবে ব্যবস্থা নিব।

