ঢাকা
১৯শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
দুপুর ১২:৫৯
logo
প্রকাশিত : এপ্রিল ১৯, ২০২৬

বিচার দূরে, দায় খোঁজাই শুরু হয়নি

জনগুরুত্বপূর্ণ কোনো নেতিবাচক ঘটনার দায় নিরূপণ কিংবা করণীয় ঠিক করতে সরকার চাইলে ‘তদন্ত কমিশন’ গঠন করে সে বিষয়ে অনুসন্ধান চালাতে পারে। ১৯৫৬ সালের ‘দ্য কমিশনস অব ইনকোয়ারি অ্যাক্ট’-এ সরকারকে এই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

বিচার দূরে, দায় খোঁজাই শুরু হয়নিগত আড়াই-তিন মাসে অতি সংক্রামক হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে দেশে দুই শতাধিক শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। প্রতিদিনই আরো মৃত্যুর খবর আসছে।

শিশুর জন্মের পর থেকে ছয় ধরনের নিয়মিত টিকা না পেয়ে দেশের আরো অন্তত ৩০ লাখ শিশু ভয়ানক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে গেছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এর জন্য ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে সাবেক অন্তর্বর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত ভুল সিদ্ধান্ত ও টিকা অব্যবস্থাপনাই দায়ী বলে অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে তথ্য মিলেছে। অন্তর্বর্তী সরকারপক্ষ থেকে আবার খুবই দুর্বল কণ্ঠে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের ওপরও কিঞ্চিত দোষ চাপানোর সুর শোনা যাচ্ছে। বর্তমান বিএনপি সরকারের তরফ থেকে অবশ্য দুই আমলকেই দায়ী করা হচ্ছে।

প্রায় মহামারি আকার ধারণ করা হামের পাশাপাশি টিকাবঞ্চিত লাখ লাখ শিশুর মধ্যে অনেক রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার পেছনে সরাসরি শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. ইউনূস ও সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টাসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তীর তীব্রভাবে ছোড়া হচ্ছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে বিস্তর প্রতিবেদনও হয়েছে, হচ্ছে। এ বিষয়ে এরই মধ্যে হাইকোর্টে একটি রিট মামলা এবং সরকারকে একটি লিগ্যাল নোটিশ; পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদকে একটি আবেদন দাখিল করা হয়েছে। এত কিছুর পরও বিষয়টি খতিয়ে দেখতে সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।

এই পরিস্থিতিতে পক্ষ থেকে খতিয়ে দেখা হয়, দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মৃত্যুর মিছিল ও গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলার মতো ঘটনার তদন্ত, বিচার ও শাস্তির পদক্ষেপগুলো কী হতে পারে। এ বিষয়ে আইন বিশেষজ্ঞরা তদন্ত কমিশন গঠনসহ আরো কিছু জরুরি আইনি পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেছেন।

যা বলছেন সরকারের দায়িত্বশীলরা : দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের জন্য পূর্ববর্তী সরকারগুলোর ভুল ব্যবস্থাপনা ও নীতিগত ব্যর্থতাকে দায়ী করে গত ৬ এপ্রিল জাতীয় সংসদে বক্তব্য দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল। এক নোটিশের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘গত সাড়ে পাঁচ বছর হাম-রুবেলা টিকার কোনো ক্যাম্পেইন না হওয়ায় এবং টিকা মজুদে অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে বর্তমানে শিশুদের প্রাণ ঝুঁকিতে পড়েছে। অতীতের সরকারগুলোর সম্পূর্ণ ভুল ব্যবস্থাপনা ও ব্যর্থতার কারণে সরকারগুলো বলতে ফ্যাসিস্ট সরকার ও সর্বশেষ অন্তর্বর্তী সরকারকে ইঙ্গিত করছি, তাদের ভুল ব্যবস্থাপনার কারণে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে।

’ওই দিন রাজধানীর গুলশানে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের এক সেমিনারে সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন হামের প্রাদুর্ভাবের প্রকৃত কারণ জানতে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার প্রস্তুতি খতিয়ে দেখার কথা উল্লেখ করেন। সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের আমল শুরুর ৪৯ দিনে দেশে হাম ছড়িয়ে যায়নি। ইউনূস সাহেব যাঁকে যেখানে বসিয়েছিলেন, তাঁরা ঠিকভাবে কাজ করেননি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় হামের ভ্যাকসিন ক্রয় ও প্রতিরোধমূলক প্রস্তুতি যথাযথভাবে নেওয়া হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখলেই বর্তমান পরিস্থিতির কারণ স্পষ্ট হবে।’

এর পরের দিন ৭ এপ্রিল ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস’-এর শোভাযাত্রা উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এবং বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভীও হামের প্রাদুর্ভাবের জন্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের গাফিলতির কথা উল্লেখ করেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের ‘টিকা ক্রয় ও প্রতিরোধমূলক প্রস্তুতি’ খতিয়ে দেখতে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে কি না, জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন গতকাল বলেন, ‘সরকার যে টিকা কেনেনি, এটার দায় নিরূপণ করে কি আমাদের কোনো লাভ আছে? আমাদের কাজ করতে হবে, হামের প্রাদুর্ভাবকে প্রতিরোধ করতে হবে। আলহামদুলিল্লাহ, প্লেন্টি অব ভ্যাকসিন (প্রচুর টিকা) আমাদের কালেকশনে আছে। আমরা সদর্পে এটার (হাম) বিরুদ্ধে ফাইট করতেছি।’

যা বলছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর : অন্তর্বর্তী সরকারকে দায়ী করে বর্তমান মন্ত্রী-উপদেষ্টারা এ পর্যন্ত যা বলেছেন, তাঁদের সেসব বক্তব্যের যৌক্তিকতা পাওয়া যায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাওয়া তথ্যে। ১৯৯৮ সাল থেকে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর সহায়তায় দেশে পাঁচ বছর মেয়াদি স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর প্রোগ্রাম (এইচপিএনএসপি) চালু করে সরকার। এটি গৃহীত হয় অপারেশন প্ল্যানের (ওপি) আওতায়।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত এইচপিএনএসপি চালুর আগ পর্যন্ত টিকাসহ জনস্বাস্থ্যের অন্যান্য কার্যক্রম চলত শতাধিক প্রকল্পের মাধ্যমে। সেগুলোর সব কটি এইচপিএনএসপির অধীনে নিয়ে আসা হয়। ২০২৪ সালের জুন মাসে চতুর্থ ধাপের এইচপিএনএসপি শেষ হয়। কিন্তু তার আগেই করোনাকালীন সংকটসহ নানা সমস্যার কারণে চতুর্থ ধাপ শেষ না করে আরো দুই বছরের জন্য বর্ধিত করা হয়।

এর পর থেকে পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য এক লাখ ছয় হাজার ১০০ কোটি টাকার পঞ্চম এইচপিএনএসপি শুরু হওয়ার কথা ছিল। এই ধাপের প্রস্তুতি শুরু হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন করা স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন ওপির কার্যক্রম নিয়ে নানা আপত্তি তোলায় সেটি বাতিল করে এবং দুই বছর মেয়াদের একটি ডেভেলপমেন্ট প্রোজেক্ট প্রোফর্মা বা প্রোপোজাল (ডিপিপি) কর্মসূচি হাতে নেয়। এর অধীনে প্রথম বছরের জন্য এক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দও করা হয়। কিন্তু টিকা কিনতে দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর নেমে আসে ট্র্যাজেডি।

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) পরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ মনে করেন, বাজেট ও ক্রয়পদ্ধতির পরিবর্তনই সংকটের মূল কারণ। এই কর্মকর্তা বলেন, ‘১৯৭৯ সাল থেকে টিকা কেনা হতো উন্নয়ন বাজেট থেকে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেটা পরিবর্তন করে রাজস্ব খাতে নেওয়ার ফলে টাকা ছাড়ের পদ্ধতিটা দীর্ঘমেয়াদি হয়ে যায়। এর ফলে আমরা যেমন হিমশিম খাচ্ছি, যারা এই কাজে জড়িত হচ্ছে, তারাও হিমশিম খাচ্ছে।

চলতি অর্থবছরে ইপিআইয়ের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৮৪২ কোটি টাকা। রাজস্ব খাত থেকে এই টাকা পাওয়ার জন্য আগে টিকা ক্রয় পরিকল্পনা তৈরি করতে হয়। এই পরিকল্পনা তৈরি হতেই সময় লেগে যায় গত বছর ১৫ আগস্ট পর্যন্ত। এটি আবার মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হয়েছে। ধাপে ধাপে তা পাস করার পর সিদ্ধান্ত হয়, ৫০ শতাংশ টিকা কেনা হবে ইউনিসেফের মাধ্যমে, বাকি ৫০ শতাংশ কেনা হবে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে। ইউনিসেফের মাধ্যমে ৫০ শতাংশ টিকা কেনা নিশ্চিত করতে সময় লেগে যায় দেড় থেকে দুই মাস। তা ছাড়া ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কিনতে হলে টাকা অগ্রিম পরিশোধ করতে হয়। ১০৯টি দেশে এই নিয়মেই কাজ করে আসছে ইউনিসেফ।

আবার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনার একটি সুবিধাও আছে। সেটি হচ্ছে—আমাদের যখন টিকার সংকট হয়, তখন টাকা অগ্রিম পরিশোধ না করার পরও প্রি-ফিন্যান্সিংয়ের (প্রাক-অর্থায়ন) মাধ্যমে কিছু টিকা দিতে পারে ওরা। এই ৪১৯ কোটি টাকার মধ্যে এরই মধ্যে ২০০ কোটি টাকার টিকা প্রাক-অর্থায়নের মাধ্যমে দিয়ে দিয়েছে ইউনিসেফ। সেই টিকা এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেছে। বাকি ২১৯ কোটি টাকা ছাড় হলে আগামী এক-দেড় মাসের মধ্যে বাকি টিকা পাওয়া যাবে। আর উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কেনার প্রক্রিয়াও চলমান। সম্ভবত আগামী ৯ মে দরপত্র আহবান করা হবে।’

দরাইট টু লাইফ’-এ সরাসরি আঘাত : অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসা এবং কর্মসংস্থানকে জনগণের জীবন ধারণের মৌলিক উপকরণ ঘোষণা করে সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদন শক্তির ক্রমবৃদ্ধিসাধন এবং জনগণের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতিসাধন।’ এই অনুচ্ছেদের (ঘ)-তে বলা আছে, ‘সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার, অর্থাৎ বেকারত্ব, ব্যাধি বা পঙ্গুত্বজনিত কিংবা বৈধব্য, মাতাপিতৃহীনতা বা বার্ধক্যজনিত কিংবা অনুরূপ অন্যান্য পরিস্থিতিজনিত আয়ত্তাতীত কারণে অভাবগ্রস্ততার ক্ষেত্রে সরকারি সাহায্য লাভের অধিকার।’

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদের ব্যাখ্যা হচ্ছে, ‘হাম একটি অতি সংক্রামক ব্যাধি। এটি সংবিধানস্বীকৃত বেঁচে থাকার অধিকারকে খর্ব করছে, অসংখ্য শিশুর মৃত্যু হয়েছে এতে। ফলে হাম প্রতিরোধে সরকারি সাহায্য লাভের অধিকার জনসাধারণের সংবিধানস্বীকৃত অধিকার। কোনো সরকার এমন কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত বা ব্যবস্থাপনা নিতে পারে না, যা এই অধিকারকে ক্ষুণ্ন করে।’

‘জনস্বাস্থ্য ও নৈতিকতা’ শিরোনামে সংবিধানের ১৮(১) অনুচ্ছেদেও জনগণের পুষ্টির স্তর-উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতিসাধনকে রাষ্ট্রের অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য বলে উল্লেখ আছে। তা ছাড়া ‘জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতার অধিকার-রক্ষণ’ শিরোনামে ৩২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘আইনানুযায়ী-ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা হইতে কোনো ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাইবে না।’ জাতিসংঘের ‘শিশু অধিকার সনদ’ হচ্ছে শিশুদের সুরক্ষা ও বিকাশের জন্য গৃহীত একটি ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক দলিল। ১৯৮৯ সালের ২০ নভেম্বর এটি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয়। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সমর্থিত মানবাধিকার চুক্তি এটি।

১৯৯০ সালে বাংলাদেশ এই সনদে স্বাক্ষর ও অনুসমর্থন করে। এই সনদের আলোকেই বাংলাদেশে ‘শিশু আইন ২০১৩’ প্রণয়ন করা হয়। শিশু সনদের ২৪ অনুচ্ছেদটি ‘শিশু স্বাস্থ্য ও পুষ্টি’ সংক্রান্ত। এই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘শিশুর সর্বোচ্চ অর্জনযোগ্য মানের স্বাস্থ্য, রোগের চিকিৎসা, স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের সুবিধা লাভের অধিকারকে অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্র স্বীকার করে। এ ধরনের সেবার অধিকার থেকে কোনো শিশু যেন বঞ্চিত না হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্র সর্বাত্মক চেষ্টা করবে।’

আইনজ্ঞ মনজিল মোরসেদ বলেন, “সংবিধান, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী টিকাদান কর্মসূচি রাষ্ট্রের ‘দায়বদ্ধ কর্মসূচি’ হিসেবে স্বীকৃত। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ এবং মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকার বাধ্য। এমন বাধ্যবাধকতা থাকার পরও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় হামের টিকা নিয়ে যা ঘটেছে, তা ‘রাইট টু লাইফ’-এর ওপর সরাসরি আঘাত। দীর্ঘদিনের প্রচলিত ব্যবস্থা বাদ দিয়ে নতুন ব্যবস্থায় টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সম্ভাব্য ঝুঁকি ও সুযোগ খতিয়ে দেখার উচিত ছিল। তাহলে হয়তো দুই শতাধিক শিশুর মৃত্যু এড়ানো যেত। একটি শিশুর টিকা না পাওয়া শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়; এটি রাষ্ট্রের মানবাধিকার নিশ্চিতে ব্যর্থতার প্রতীক।”

তদন্ত কমিশন গঠন অতি জরুরি : জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তদন্ত কমিশন গঠন এবং কমিশনকে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষমতা দেওয়ার বিধান রেখে ১৯৫৬ সালে ‘দ্য কমিশনস অব ইনকোয়ারি অ্যাক্ট’ করা হয়। এই আইনের অধীনেই অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর পিলখানা হত্যাকাণ্ড পুনঃতদন্তে ‘জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন’ গঠন করেছিল। ৩৪০ দিন পর গত বছর ৩০ নভেম্বর এই কমিশন প্রতিবেদন দেয়।

বিদ্যমান আইনটির ৩(১) ধারায় বলা অছে—‘সরকার, যদি মনে করে যে তা করা আবশ্যক, তবে সরকারি গেজেটে একটি বিজ্ঞপ্তি দ্বারা জনগুরুত্বপূর্ণ কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে তদন্ত করার এবং বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত সময়সীমার মধ্যে কার্যাবলি সম্পাদন করার উদ্দেশ্যে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করতে পারবে এবং নিযুক্ত কমিশন সে অনুসারে তদন্ত করবে এবং কার্যাবলি সম্পাদন করবে।’

দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের কারণ উদঘাটনে সরকার এই আইনের অধীনে কোনো তদন্ত কমিশন গঠন করতে পারে কি না—জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বিভূতি তরফদার বলেন, ‘যেহেতু অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে টিকাদান কর্মসূচি হঠাৎ বদল এবং দুই শতাধিক শিশুর মৃত্যুর মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, তাই এটি নিঃসন্দেহে একটি জাতীয় জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করা শুধু উচিতই নয়, বরং বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি জরুরি বলে মনে করি। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো সিদ্ধান্তের কারণে যদি এই বিপর্যয় ঘটে থাকে, তবে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই কেবল প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে।’

হামে মৃত্যু হয়েছে, এমন অনেক শিশুর পরিবারকে বিচার দাবি করতে দেখা যাচ্ছে। সরকার তদন্ত করে দায় নিরূপণ করলে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে কি না, এমন প্রশ্নে এই আইনজীবী বলেন, ‘কমিশন যদি সুনির্দিষ্টভাবে কাউকে দায়ী করে এবং আর্থিক দুর্নীতির প্রমাণ পায়, তবে সরকার সেই প্রতিবেদনের সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়মিত ফৌজদারি মামলা বা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিতে বাধ্য থাকে। সুতরাং তদন্তে অপরাধ বা অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইনি কাঠামোতেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব।’

তিনি বলেন, “তদন্তে যদি উঠে আসে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ চরম অবহেলার মাধ্যমে বা জেনেশুনে টিকাদান কর্মসূচি বাতিল করেছিলেন, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির অধীনে ফৌজদারি মামলা করা সম্ভব। যেহেতু ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছে, তাই দণ্ডবিধির ৩০৪ক ধারা অনুসারে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ‘অবহেলাজনিত মৃত্যুর’ অভিযোগ আনা যেতে পারে।”

তিনি আরো বলেন, ‘কারো বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০৪ক ধারার অপরাধ প্রমাণিত হলে কী শাস্তি হতে পারে, তা-ও বলা আছে এই ধারাতে। কোনো ব্যক্তি যদি বেপরোয়াভাবে বা অবহেলা করে কারো মৃত্যু ঘটায় এবং তা যদি শাস্তিযোগ্য নরহত্যা না হয়, তবে সেই ব্যক্তি পাঁচ বছর সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’

দণ্ডবিধির পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশন আইনেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে বলে মনে করেন আইনজীবী বিভূতি তরফদার। তাঁর ভাষায়, ‘যদি তদন্তে বেরিয়ে আসে যে এই জনঘাতী সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো আর্থিক লেনদেন বা ব্যক্তিগত সুবিধা গ্রহণের বিষয় ছিল, তবে দুদক সরাসরি আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। ২০০৪ সালের দুর্নীতি দমন কমিশন আইন এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের বা অন্যের জন্য ‘আর্থিক সুবিধা’ অর্জন করা একটি গুরুতর দণ্ডনীয় অপরাধ।

এ ক্ষেত্রে দুদক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবৈধ সম্পদ অর্জনের অনুসন্ধান করতে পারে, আর অপরাধের প্রমাণ মিললে বিশেষ জজ আদালতে মামলা দায়ের, গ্রেপ্তার এবং সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা রাখে দুদক।’ ভুক্তভোগী পরিবার উচ্চ আদালতে রিট করে রাষ্ট্রের কাছে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দাবি করার অধিকার রাখে জানিয়ে বিভূতি তরফদার আরো বলেন, ‘বাংলাদেশে এ ধরনের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার বেশ কিছু নজির আছে। হামের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালত হস্তক্ষেপ করলে, তাতে কেবল ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো আর্থিক সহায়তাই পাবে না, ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে সরকার বা রাষ্ট্রকে বিরত রাখবে।’

‘আদেশ হতে পারে আদালত থেকেও’ : জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট রিট মামলা বা হাইকোর্টের সুয়োমোটো বা স্বতঃপ্রণোদিত আদেশ নাগরিক অধিকার রক্ষা এবং রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগকে জবাবদিহির আওতায় আনতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদকে জনস্বার্থের মামলার মূল ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। সংবিধানের ৪৪ অনুচ্ছেদে সে নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা আছে, মানুষের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হলে তা বলবৎ করার জন্য ১০২(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্টে মামলা করা যাবে। যদিও এই অনুচ্ছেদে বলা আছে, কোনো ‘সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির’ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত আদেশ দেবেন। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট বিভিন্ন রায়ে এই ব্যাখ্যাও দিয়েছেন যে যদি কোনো ঘটনায় জনস্বার্থ বা মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়, তবে আদালত সংবাদপত্রের প্রতিবেদন বা অন্য কোনো উৎসর ভিত্তিতে ‘আবেদনকারী’ ছাড়াই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আদেশ দিতে পারেন। স্বতঃপ্রণোদিত এমন বহু আদেশের নজিরও আছে।

নিরাপদ পানি নিয়ে ২০২০ সালের ২৫ মার্চ স্বতঃপ্রণোদিত রুল জারি করেছিলেন হাইকোর্ট। দেশের মানুষের জন্য বিনামূল্যে নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, জানতে চাওয়া হয়েছিল রুলে। সেই রুলটি যথাযথ ঘোষণা করে গত বছর ২৭ ফেব্রুয়ারি রায় দেন হাইকোর্ট। রায়ে নিরাপদ (পানযোগ্য) পানিকে নাগরিকের ‘মৌলিক অধিকার’ ঘোষণা করে এক বছরের মধ্যে দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ জনপরিসরে (পাবলিক প্লেস) বিনামূল্যে নিরাপদ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ছাড়া ২০২৩ সালের ৬ আগস্ট এস আলম গ্রুপের মালিক মোহাম্মদ সাইফুল আলম ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে অনুমতি ছাড়া বিদেশে অর্থ বিনিয়োগ, স্থানান্তরের অভিযোগ অনুসন্ধানের বিষয়ে রুলসহ আদেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট।

আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘হামের প্রাদুর্ভাবের কারণ এবং শিশু মৃত্যুর দায়টা নির্ধারণ করা দরকার। বর্তমান সরকারের কেউ কেউ সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার এবং আওয়ামী লীগ সরকারকে মিলিয়ে কথা বলছেন। কিন্তু দায়টা আসলে কোন সরকারের বা কার কতটুকু, তা তদন্তের মাধ্যমে নিরূপণ হওয়া উচিত। এর জন্য সরকারের উচিত একটি তদন্ত কমিশন গঠন করা। কমিশনের মাধ্যমে দায়টা নিরূপণ হলে যে কেউ দায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে, ক্ষতিপূরণও চাইতে পারবে।’

সরকার যদি কমিশন গঠন না করে, তবে আদালতের মাধ্যমে কমিশন গঠনের আদেশ আসতে পারে বলে মনে করেন জনস্বার্থে বহু রিট মামলা পরিচালনাকারী এই আইনজীবী। ‘এ বিষয়ে (তদন্ত কমিশন গঠন) উচ্চ আদালত স্বতঃপ্রণোদিত আদেশ দিতে পারেন। সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ ও সুপ্রিম কোর্ট রুলসে স্বতঃপ্রণোদিত আদেশের ক্ষমতা হাইকোর্টকে দেওয়া হয়েছে। আবার জনস্বার্থমূলক আবেদনের মাধ্যমেও আদেশ আসতে পারে। আমার জানা মতে এসংক্রান্ত একটি রিট মামলা হয়েছে।’

খোঁজ করে জানা গেল, হাম এবং হামের উপসর্গ নিয়ে অব্যাহত শিশু মৃত্যুর মধ্যে গত ২ এপ্রিল হাইকোর্টে রিট করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী লুেফ জাহান পূর্ণিমা। অতিসংক্রামক হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত সংক্রমিত এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সশরীরে ক্লাস সাময়িকভাবে স্থগিত রেখে ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে রিটে। একই সঙ্গে সংক্রমিত এলাকায় খুব দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ারও নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। রিটটি শুনানির অপেক্ষায় আছে।

এদিকে আড়াই দশকেরও বেশি সময় ধরে সরকারি ব্যবস্থাপনায় চলে আসা হামের টিকাদান কর্মসূচি পরিবর্তনে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তকে ‘ফৌজদারি অবহেলা’ উল্লেখ করে গত ৬ এপ্রিল সরকারকে লিগ্যাল নোটিশ দেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম। নোটিশে হামের প্রাদুর্ভাবের জন্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারকে দায়ী করেছেন তিনি। একই সঙ্গে সরকারকে অনুরোধ করেছেন, এই প্রাদুর্ভাবের পেছনে ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের কার দায় কতটুকু, তা নিরূপণে জনস্বাস্থ্য ও শিশু বিশেষজ্ঞসহ অংশীজনকে নিয়ে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করার। রেজিস্ট্রি ডাকে সরকারের আটটি দপ্তরে এই নোটিশ পাঠানো হয়। নোটিশ পাওয়ার পাঁচ দিনের মধ্যে তদন্ত কমিটি গঠনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করা হয়েছিল। তাঁর এই নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলে, তদন্ত চলা অবস্থায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যাতে পালিয়ে দেশ ছাড়তে না পারেন, সে জন্য ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ সাবেক উপদেষ্টাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতেও নোটিশে অনুরোধ করেছিলেন তিনি।

কিন্তু সরকারের কোনো দপ্তর থেকে এখন পর্যন্ত তাঁর নোটিশের জবাব পাননি বলে জানিয়েছেন আইনজীবী আশরাফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘নোটিশের চাওয়া অনুযায়ী সরকারকে কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। ফলে সরকারের এই নিষ্ক্রিয়তা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। রিটে তদন্ত কমিশন গঠনসহ সরকারের প্রতি বেশ কিছু নির্দেশনা চাওয়া হবে।’

সুত্র: কালের কণ্ঠ

logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram