

গত এক দশক ধরে বাংলাদেশ দ্রুত অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন করছে, যেখানে শিল্পায়ন, বাণিজ্য, রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগ এবং পরিবহন সম্প্রসারণে জ্বালানি তেলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশীয় তেল উৎপাদন সীমিত হওয়ায় মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ আমদানি-নির্ভর, বিশেষ করে ডিজেল ও অকটেন। কৃষি, শিল্প, পরিবহন এবং বিদ্যুৎ খাতে ডিজেলভিত্তিক মেশিনারি ও যানবাহনের বিস্তৃত ব্যবহার অর্থনীতিকে সরবরাহের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে তেলের বাজারে সংকট স্পষ্টভাবে লক্ষ করা গেছে। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানো, অনেক পাম্পে ‘Sold Out’ এবং ডিজেল মজুত না থাকার খবর সাধারণ মানুষের উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সরকারের বারবার ‘মজুত রয়েছে’, ‘সরবরাহ বন্ধ হয়নি’ ইত্যাদি ঘোষণা থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে বাজারে ভিড় ও হুড়োহুড়ি দেখা যায়।
বাংলাদেশে তেলের প্রধান সরবরাহকারী তিনটি সরকারি কোম্পানি পদ্মা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম এবং যমুনা অয়েল কোম্পানি। তারা আনুমানিক ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৮০০টি পাম্পে তেল বিতরণ করে। বছরে প্রায় সাড়ে ৬০ থেকে ৭০ লাখ টন তেল আমদানি হয়, যার বড় অংশ পরিশোধিত। ২০ শতাংশ কাঁচা তেল দেশেই রিফাইন্ড হয়। তেলের চাহিদার প্রায় ৬৫-৭০ শতাংশ ডিজেলে এবং গ্যাস আমদানির প্রায় ৭০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি পথ দিয়ে আসে। তাই হরমুজ প্রণালির অস্থিতিশীলতা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।
তেলের সরবরাহ-সংকটের মূল দুই কারণ রয়েছে। প্রথমটি আন্তর্জাতিক ভ‚রাজনৈতিক চাপ, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালির অস্থিতিশীলতা। দ্বিতীয়টি দেশীয় ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা মার্কেট সিন্ডিকেট, প্যানিক ক্রয়, দুর্নীতি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অভাব।
বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানও জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালি এবং মধ্যপ্রাচ্য-সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলায় কূটনৈতিক পদক্ষেপ যেমন আমেরিকার কাছ থেকে রাশিয়ান ডিজেল আমদানির সাময়িক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, দেশের জ্বালানি-নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়ক হতে পারে। তবু আন্তর্জাতিক চাপ থাকা সত্তে¡ও অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা সংকটকে তীব্র করছে। অর্থাৎ বাংলাদেশে তেলের সংকট মিশ্র কারণের ফল আন্তর্জাতিক ভ‚রাজনৈতিক চাপ এবং দেশীয় ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা একত্রে দেশের জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘমেয়াদি স্ট্র্যাটেজিক স্টক, বিকল্প উৎস এবং শক্তিশালী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই সমস্যা সমাধান কঠিন। দেশের অর্থনীতি, পরিবহন, শিল্প ও কৃষি সব ক্ষেত্রেই তেলের অব্যাহত সরবরাহ অপরিহার্য।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী এপ্রিল মাসের শেষ পর্যন্ত দেশের মোট তেলের মজুত ছিল প্রায় ২ লাখ ৫৫ হাজার ১৮ মেট্রিক টন, যার মধ্যে ডিজেল ১ লাখ ২২ হাজার ৬৬০ মেট্রিক টন এবং জেট ফুয়েল, অকটেন ও পেট্রোলের যথেষ্ট মজুত রয়েছে। এছাড়া স্থানীয় দাম নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ চুক্তির মাধ্যমে মূল্য ওঠানামা কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে। তবে বাস্তবে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা ও মাঠ পর্যায়ের তথ্য নির্দেশ করছে যে, সরকারের দাবির সঙ্গে বাস্তবতার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। দীর্ঘ লাইন, অনিয়মিত সরবরাহ এবং দ্রুত মূল্যবৃদ্ধি প্রমাণ করছে যে, সরকারের পদক্ষেপ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সীমিত কার্যকর।
সরকারি পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে শক্তি সংরক্ষণের উদ্যোগ যেমন সরকারি ও বেসরকারি অফিসের কাজের সময় হ্রাস, বাজারের সময় সীমিত করা, গাড়ি বিক্রির নিয়ন্ত্রণ। এছাড়া বিভিন্ন উৎস থেকে আমদানি বিস্তৃত করার চেষ্টা চলছে, যাতে কোনো নির্দিষ্ট রুট (যেমন হরমুজ প্রণালি) বন্ধ হলে সরবরাহ ব্যাহত না হয়। তবে এই উদ্যোগগুলো তাৎক্ষণিক সমাধান হলেও দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সমাধান এখনো অনুপস্থিত।
এই সংকটের দীর্ঘস্থায়ী সমাধান অর্জনের জন্য শুধু আন্তর্জাতিক সরবরাহ পুনরায় চালু হওয়া বা হরমুজ প্রণালি সমস্যা কাটিয়ে ওঠা যথেষ্ট নয় একটি দীর্ঘমেয়াদি, আকাক্সিক্ষত ও সম্পূর্ণ রূপান্তর কৌশল তৈরি করতে হবে, যা সরকারি পদক্ষেপ, আন্তর্জাতিক ক‚টনীতিক উদ্যোগ, অভ্যন্তরীণ বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং শক্তির নতুন সুযোগ সবকিছুকে সম্মিলিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করবে। প্রথমত, সরকারকে শক্তভাবে একটি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি-নিরাপত্তা রোড ম্যাপ গ্রহণের দায়িত্ব নিতে হবে। এতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
দ্বিতীয়ত, আমদানির উৎসগুলোকে বহুমুখী করা জরুরি শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা ও রাশিয়াসহ বিশ্বের অন্যান্য উৎস থেকেও স্থিতিশীলভাবে তেল আমদানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, দেশীয় বাজারে কঠোর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য। বোর্ড মনিটরিং, সিন্ডিকেটীয় কর্মকাণ্ড বন্ধ, মজুত ও অতিরিক্ত ক্রয় রোধ ইত্যাদি বিষয় সাপ্তাহিক ও দৈনিক পর্যায়ে পর্যবেক্ষণযোগ্য ও আইনগত দণ্ডযোগ্য করতে হবে। চতুর্থত, দীর্ঘ মেয়াদে স্থানীয় উৎপাদন ও রিফাইনারি সক্ষমতা সম্প্রসারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে রিফাইনারি বৃদ্ধি, গ্যাস উত্তোলন বৃদ্ধি এবং এলএনজি টার্মিনালের শক্তিশালীকরণ এই পদক্ষেপগুলি জ্বালানি নিরাপত্তার দিক থেকে অপরিহার্য। পাশাপাশি পুনর্নবায়নযোগ্য শক্তি, যেমন সৌর ও বায়ুশক্তিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করলে দেশের তেলের ওপর নির্ভরতা হ্রাস পাবে। পঞ্চমত, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্ককে ভারসাম্যপূর্ণ রাখা জরুরি। কোনো এক নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা সামরিক বøকের প্রতি সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হওয়ার পরিবর্তে, বিশ্বব্যাপী সক্রিয় সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জ্বালানি প্রধান দেশগুলোতে সম্ভাব্য সংঘাতভবিষ্যতে সরবরাহে বড় ধরনের প্রতিক‚লতা তৈরি করতে পারে। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংক সতর্ক করেছে, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি-নিরাপত্তা এখন একক রাষ্ট্র বা চুক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং বহু দেশের মধ্যে সমন্বিত ও স্থিতিশীল চ্যানেল নিশ্চিত করার ওপর নির্ভর করছে।
২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে ডিজেল ও অকটেনের বাজারে দেখা গেছে, মজুত এবং অতিরিক্ত মূল্য বৃদ্ধি কিছু এলাকায় সরবরাহ চেইনকে ব্যাহত করেছে। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি স্থানীয় উৎপাদন ও রিফাইনারি সক্ষমতা সীমিত। বাংলাদেশের দুটি প্রধান রিফাইনারি; পোর্ট আর্থার রিফাইনারি এবং মহেশখালী তেল টার্মিনাল বর্তমান চাহিদা মেটাতে সীমিত সক্ষমতা রাখে। আগামী দশকে রিফাইনারি সম্প্রসারণ ও গ্যাস উত্তোলন উন্নয়ন না হলে, আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার চাপ দেশের অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।
জ্বালানি বিকল্প ও পুনর্নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার এখনো অপর্যাপ্ত। সৌর, বায়ু ও জৈব জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি না হলে, দেশের তেলের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব নয়।
সুপারিশ করা যায়, বাংলাদেশকে প্রথমত দীর্ঘমেয়াদি শক্তি নিরাপত্তানীতি প্রণয়ন করতে হবে, যার মধ্যে থাকবে একাধিক উৎস থেকে তেল ও গ্যাস আমদানি, স্থানীয় রিফাইনারি সম্প্রসারণ, পুনর্নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, সিন্ডিকেট রোধ এবং জনগণ ও খুচরা বিক্রেতাদের সচেতনতা বৃদ্ধি। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক তেলসংকট প্রমাণ করে, জ্বালানি-নিরাপত্তা শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার ওপর নির্ভরশীল নয়; অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা, সিন্ডিকেট, বাজার আচরণ এবং জনসচেতনতা এই সংকটের গুরুতর মাত্রা নির্ধারণ করে। হরমুজ প্রণালির অস্থিতিশীলতা বা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আন্তর্জাতিক প্রভাব ফেললেও, অভ্যন্তরীণ সংকট; যেমন- প্যানিক ক্রয়, মজুত ও সিন্ডিকেট, সংকটকে তীব্র করেছে। সরকারের পদক্ষেপ বিকল্প আমদানি চ্যানেল, স্টক বৃদ্ধি, মূল্য নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত অভিযান, সংশোধনী হলেও চূড়ান্ত সমাধান নয়।
দেশের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি কৌশল, বহুমুখী আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, স্থানীয় উৎপাদন ও রিফাইনারি সম্প্রসারণ, এবং পুনর্নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি। একটি সমন্বিত পরিকল্পনা অনুসরণ করলে, বাংলাদেশ শুধু সংকটের মধ্যেই টিকে থাকতে পারবে তা না, ভবিষ্যতে স্থায়ী জ্বালানি-নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে। আন্তর্জাতিক অস্থিরতার মধ্যেও দেশে জ্বালানিচাহিদা নিয়ন্ত্রণে থাকবে, বাজারে সিন্ডিকেট ও প্যানিক প্রভাব কমবে এবং জনগণের জীবনযাপন ও শিল্প-অর্থনীতি দীর্ঘ মেয়াদে নিরাপদ ও স্থিতিশীল থাকবে।
লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

