

ফারহান ইসলাম, পাঁচবিবি (জয়পুরহাট) প্রতিনিধি: জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কাগজে-কলমে কর্মরত থাকলেও বাস্তবে কর্মস্থলে নেই গাইনী ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এমন অভিযোগে চরম বিপাকে পড়েছেন গর্ভবতী নারী ও প্রসূতি মায়েরা। জরুরি সময়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা না পেয়ে ঝুঁকি নিয়েই অন্য হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে রোগীদের।
উল্লেখ্য যে, এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি এলাকার হাজারো মানুষের একমাত্র ভরসার সরকারি চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র। ৫০ শয্যার এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়মিত শতাধিক রোগী ভর্তি থাকেন। প্রতিদিন আউটডোরে চিকিৎসা নিতে আসেন প্রায় ৭০০ রোগী। বিপুল সংখ্যক রোগীর চাপ থাকা সত্ত্বেও গাইনী ও প্রসূতি বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা কার্যত বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে।
ডেলিভারি করতে আসা রোগীর হাসবেন্ড রিপন ইসলাম বলেন, আমি আজকে সকাল সাড়ে আটটার দিকে আমার ওয়াইফকে নিয়ে এখানে আসি। আসার পর ভর্তি করানোর প্রায় বিশ মিনিটের মধ্যেই আমার ওয়াইফের নরমাল ডেলিভারি সম্পন্ন হয়। বর্তমানে এখানে কোনো গাইনি বিশেষজ্ঞ না থাকায় মাঝে মাঝে সমস্যায় পড়তে হয়। আমাদের পাঁচবিবি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যদি একজন গাইনি ডাক্তার নিয়মিত থাকতেন, তাহলে আমরা আরও নিশ্চিন্ত থাকতে পারতাম।
চিকিৎসা নিতে আসা মণিরা বলেন, আমি এখানে অনেক আশা নিয়ে চেকআপ করতে এসেছি। কয়েকবার চেকআপও করিয়েছি। কিন্তু এখানে প্রয়োজনীয় কিছু সুবিধার অভাব আছে। বিশেষ করে ভালো মানের সেবা ও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা দরকার। এখানে গাইনি ডাক্তারের খুবই প্রয়োজন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমি সেই ধরনের সেবা পাইনি। অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। বাধ্য হয়ে আমাদের বাইরে যেতে হয় আর বাইরে গেলে দূরে দূরে ঘুরতে হয়, যা আমাদের জন্য কষ্টকর। আমার মতে এখানে যদি ভালো মানের চিকিৎসা ব্যবস্থা, বিশেষ করে গাইনি বিভাগে উন্নতি করা হয় তাহলে আমাদের মতো রোগীদের জন্য অনেক উপকার হবে।
হাসপাতালের নার্সিং সুপারভাইজার ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, আমাদের হাসপাতালটি ৫০ শয্যার হলেও বাস্তবে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ জন পর্যন্ত রোগী ভর্তি থাকে। ২৪ ঘণ্টা আউটডোর ও ইনডোর মিলিয়ে আমরা সেবা দিয়ে থাকি। ডাক্তারের দিক থেকেও কিছু সমস্যা রয়েছে, বিশেষ করে গাইনি ডাক্তারের অভাব। গাইনি রোগী এলে আমাদের খুব কষ্ট করে ম্যানেজ করতে হয়। অনেক সময় রোগীদের মোটিভেট করে ভর্তি রাখাও সম্ভব হয় না। তারা চিন্তায় থাকে এখানে সিজার না হলে আমরা কোথায় যাব। এই বিষয়টি একটি বড় সমস্যা। বর্তমানে আমাদের মেডিকেল অফিসারদের মাধ্যমে চিকিৎসা দিতে হয়, কিন্তু একজন গাইনি বিশেষজ্ঞ থাকলে সেবার মান আরও উন্নত হবে। আগে এখানে সিজারিয়ান সেকশন বেশি হতো, এখন সেই সুবিধা কমে গেছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মিডওয়াইফ কর্মী রিমা বলেন, প্রতিমাসে আমাদের এখানে গড়ে ৪৫–৫০টি নরমাল ডেলিভারি হয়। এছাড়া পিএনসি সেবা প্রায় ৫০–৬০ জনকে দেওয়া হয় এবং এএনসি সেবা ৩০০–৪০০ জন পর্যন্ত হয়ে থাকে। এখানে কোনো গাইনি ডাক্তার নেই। অনেক রোগী সেবা নিতে এসে গাইনি ডাক্তারের খোঁজ করেন। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে সেবা দিলেও, তারা তখনও পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেন না। অনেক সময় লেবার পেইন নিয়ে রোগী আসে, আমরা বুঝতে পারি যে নরমাল ডেলিভারি সম্ভব। কিন্তু রোগীরা চান একজন গাইনি ডাক্তার থাকুক। যদি কোনো জটিলতা দেখা দেয়, তখন তাদের জয়পুরহাটে রেফার করতে হয়। এই ভোগান্তি দূর করতে এখানে একজন গাইনি কনসালট্যান্ট নিয়োগ দেওয়া হোক। তাহলে আমরা আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কাজ করতে পারব, রোগীরাও উন্নত সেবা পাবেন।
সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জানতে চাইলে জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সেই গাইনী চিকিৎসক ডা.রেজওয়ানা শারমিন বলেন, আমার পোস্টিং পাঁচবিবি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ছিল। তবে আমার প্রমোশন হয়েছে। আমি এখন এ্যাসিট্যান্ট প্রফেসর। তাই আমি এখন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে দায়িত্ব পালন করছি। সামনেই সরকার আমাদের নতুন করে পোস্টিং দেবে। পাঁচবিবিতেও নতুন কোনো চিকিৎসব পোস্টিং পাবেন।
পাঁচবিবি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শ্রীতম কুমার পাল বলেন, আমাদের এখানে গাইনি চিকিৎসক পোস্টিং থাকলেও কর্মস্থলে উপস্থিত নেই। ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সাধারণ চিকিৎসা সেবা আমরা কোনোভাবে বজায় রাখতে পারলেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রে আমরা চরম সংকটে রয়েছি। আমরা ইতোমধ্যে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার জানিয়েছি।

