

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি: আমের রাজধানী খ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম বাগানজুড়ে এখন নতুন আশার গল্প। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার গাছে গাছে দেখা দিয়েছে আগাম মুকুল। আর সেই মুকুল ঘিরে বাড়তি যত্ন, সেচ ও বালাই ব্যবস্থাপনা নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা। তবে উৎপাদন বাড়লেও; ন্যায্য দাম ও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি। নতুন সরকারের কাছে আমের ন্যায্যমূল্য, রপ্তানি বৃদ্ধি ও প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন উদ্যোক্তা চাষিরা। এ অবস্থায় ভালো ফলন ও খরচ কমাতে সঠিক মাত্রায় বালাই ব্যবস্থাপনা প্রয়োগসহ নানা পরামর্শ সংশ্লিষ্টদের।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মোঃ ইয়াছিন আলী জানান, চলতি মৌসুমে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছে। চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত ৭০-৭৫ শতাংশ গাছে এসেছে নতুন মুকুল। আর আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার গতবারের তুলনায় ভালো ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। আর হেক্টরপ্রতি উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১২ দশমিক ৯৩ পার টন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার রামচন্দ্রপুরহাট এলাকার আবু সায়েম জানান, এবার সোনালি মুকুলে ঢেকে গেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিস্তীর্ণ আমবাগান। হালকা বাতাসে দুলছে মুকুল, ছড়িয়ে দিচ্ছে নতুন মৌসুমের বার্তা। শীতের বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে গাছে গাছে এসেছে আগাম মুকুল, যা চাষিদের মনে জাগিয়েছে নতুন স্বপ্ন। এ অবস্থায় কৃষিবিভােেগর পরামর্শেভালো ফলন ও খরচ কমাতে সঠিক মাত্রায় বালাই ব্যবস্থাপনা প্রয়োগে আমরা বাগানে ব্যস্ত সময পার করছি।
শিবগঞ্জ কানসাট এলাকার আমচাষি মোঃ রবিউল ইসলাম জানান, মূলত চলতি বছর সময়মত শীতের বিদায়, কুয়াশা ছাড়া, সঠিক তাপমাত্রা এবং রোদ্রজ্জ্বল পরিস্কার আবহাওয়া বিরাজ করায় এবার প্রতিটি আমবাগানে ভালো মুকুল এসেছে। এখন আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার ফলন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ঝড়-বৃষ্টি বা রোগবালাই দেখা না দিলে আমরা লাভের মুখ দেখবো।
গোমস্তাপুরের সফল উদ্যোক্তা মোঃ রফিকুল ইসলাম জানান, ভালো ফলনের আশায় এখন দিন-রাত ব্যস্ত চাষি ও বাগানমালিকরা। সেচ, স্প্রে আর বাড়তি যত্নে যেন কোনো কমতি রাখতে চান না তারা। কারণ মুকুলের এই সময়টুকুই নির্ধারণ করে পুরো মৌসুমের ভাগ্য। তবে, নায্য দাম নিয়ে কিছুটা শঙ্কা রয়েছে বেশীরভাগ কৃষকরা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কৃষি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মুনজের আলম মানিক বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম শুধু ফল নয় -এটি একটি অর্থনীতি। এই আমকে ঘিরেই আবর্তিত হয় হাজারো মানুষের জীবিকা। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব আম শিল্পকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। তাই উৎপাদন বাড়লেও; বাজার ব্যবস্থাপনা ও রপ্তানি সুবিধা না থাকা এবং প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তুলতে না পারলে এই সম্ভাবনাময় খাত পিছিয়ে পড়বে।
শিবগঞ্জ ম্যাংগো প্রোডিউসার কো-অপারেটিভ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন শামীম খান বলেন, কয়েক বছর ধরে জলবায়ূ পরিবর্তনের কারণে আমের ওপর বিরুপ প্রভাব পড়ছে। তাই খুব চিন্তিত আছি। তার উপর এ বছরে বালাইনাশকের দাম কয়েক বছরের মধ্যে অনেক বেশী হওয়ায় খরচ অনেক বেশি হচ্ছে। পণ্যের দাম বাড়ার সাথে সাথে শ্রমিকের মজুরীও বেড়েছে। ফলে অনেক টাকা লগ্নি করে কাঙ্খিত ফল না পেলে আবারো ক্ষতিগ্রস্ত হবো।
শিবগঞ্জের আম উদ্যোক্তা মোঃ আহসান হাবিব, আমের নায্যমূল্য নিশ্চিতে অভ্যন্তরীন বাজার ব্যবস্থাপনা, আমভিত্তিক প্রক্রিয়াকরণ ও রপ্তানির জন্য উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করলে আমের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে বলে জানান।
আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব (আম গবেষণা কেন্দ্রের) মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোঃ শরফ উদ্দিন বলেন, মুকুল থেকে কাঙ্খিত ফলন পেতে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। তাদের পরামর্শ-সঠিক মাত্রায় বালাই ব্যবস্থাপনা, রোগ-পোকা দমন এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মোঃ ইয়াছিন আলী জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার গতবারের তুলনায় ভালো ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। এ অবস্থায় নায্যমূল্য নিশ্চিতে আমভিত্তিক কলকারখানা এবং আম থেকে বিকল্প পণ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরনের পাশাপাশি সহজ পদ্ধতিতে ব্যাংক ঋণ প্রদানের দাবিগুলো নিয়ে উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের কাছে দেন-দরবার শুরু করেছেন তারা।
