ঢাকা
logo
প্রকাশিত : November 5, 2026

দশ ইন্দ্রিয় করলে জয়, থাকবে না তোর কোনো ভয়

মানুষের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে নয়, নিজের ভেতরের প্রবৃত্তির সঙ্গে। পৃথিবী জয় করে মানুষ ইতিহাসে স্থান করে নিতে পারে, কিন্তু নিজের কামনা, ক্রোধ, লোভ, মোহ, অহংকার ও ইন্দ্রিয়কে জয় করতে না পারলে প্রকৃত আত্মজয় সম্ভব নয়। মানুষের বাহ্যিক জগৎ পরিচালিত হয় ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে, আর অন্তর্জগৎ পরিচালিত হয় মন, বিবেক, বুদ্ধি ও আত্মিক চেতনার মাধ্যমে। তাই ইন্দ্রিয়জয়ই আত্মশুদ্ধির প্রথম সোপান এবং আত্মমুক্তির অন্যতম প্রধান পথ।

ভারতীয় সাংখ্য, যোগ ও বেদান্ত দর্শনে মানুষের দশটি ইন্দ্রিয়ের কথা বলা হয়েছে। পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয়—চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা ও ত্বক; আর পাঁচটি কর্মেন্দ্রিয়—বাক্, পাণি, পাদ, পায়ু ও উপস্থ। জ্ঞানেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে মানুষ জগতকে উপলব্ধি করে এবং কর্মেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে নিজের ইচ্ছা ও কর্ম প্রকাশ করে। এই দশ ইন্দ্রিয় মানুষের জন্য স্রষ্টার অমূল্য নিয়ামত। কিন্তু বিবেকের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ইন্দ্রিয় যখন প্রবৃত্তির দাসে পরিণত হয়, তখন নিয়ামতই বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। চোখে জন্ম নেয় লালসা, কানে প্রবেশ করে পরনিন্দা, জিহ্বায় জন্ম নেয় মিথ্যা, হাতে সংঘটিত হয় অন্যায়, আর পা মানুষকে নিয়ে যায় পাপের পথে।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই কান, চোখ ও অন্তর—এগুলোর প্রত্যেকটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (সূরা আল-ইসরা, ১৭:৩৬)। অর্থাৎ মানুষের ইন্দ্রিয় কেবল ভোগের উপকরণ নয়; এগুলোর যথাযথ ব্যবহারের জন্য রয়েছে নৈতিক দায়বদ্ধতা। সূরা আন-নূরের ৩০–৩১ নম্বর আয়াতে দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সূরা আন-নাযিআতের ৪০–৪১ নম্বর আয়াতে প্রবৃত্তির কুপ্রবণতা থেকে নিজেকে বিরত রাখার প্রতিদান হিসেবে জান্নাতের কথা বলা হয়েছে। এসব নির্দেশনা প্রমাণ করে, ইসলামে আত্মশুদ্ধি কেবল বাহ্যিক ইবাদতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং চোখ, কান, জিহ্বা, হাত, পা ও অন্তরের পবিত্রতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং প্রকৃত শক্তিশালী সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)। অন্য হাদিসে তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসে বিশ্বাস করে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)। এই শিক্ষার মর্মার্থ হলো, মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব বাহ্যিক শক্তিতে নয়, আত্মনিয়ন্ত্রণে। যে নিজের জিহ্বাকে সংযত করতে পারে, সে অনেক বিবাদ থেকে মুক্ত থাকে; যে নিজের ক্রোধকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে বহু অন্যায় থেকে বেঁচে যায়।

ইন্দ্রিয়জয়ের শিক্ষা কেবল ইসলামেই সীমাবদ্ধ নয়। ভগবদ্গীতার ২:৬২–৬৩ শ্লোকে বিষয়াসক্তি থেকে কামনা, কামনা থেকে ক্রোধ, ক্রোধ থেকে মোহ এবং মোহ থেকে বুদ্ধিনাশের ধারাবাহিকতা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বৌদ্ধধর্মে ইন্দ্রিয় সংবর, সচেতনতা ও অষ্টাঙ্গিক মার্গের মাধ্যমে আসক্তি ও তৃষ্ণা হ্রাসের শিক্ষা রয়েছে। খ্রিষ্টধর্মে আত্মসংযমকে আত্মিক গুণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে (গালাতীয় ৫:২২–২৩)। জৈন দর্শনের অপরিগ্রহ ও ব্রহ্মচর্য মানুষকে ভোগ, লোভ ও আসক্তি থেকে মুক্ত থাকার শিক্ষা দেয়। অন্যদিকে গ্রিক ও স্টোইক দর্শনে আত্মনিয়ন্ত্রণ, যুক্তিবোধ এবং নিজের প্রতিক্রিয়ার ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাকে নৈতিক উৎকর্ষের শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ধর্ম ও দর্শনের ভাষা আলাদা হলেও আত্মসংযমের গুরুত্বে এক গভীর মিল লক্ষ করা যায়।

সুফিবাদের দৃষ্টিতে ইন্দ্রিয়জয়ের মূল লক্ষ্য হলো নফসের পরিশুদ্ধি। কুরআনে নফসে আম্মারা, নফসে লাওয়ামা ও নফসে মুতমাইন্নার উল্লেখ রয়েছে। সুফি সাধনায় এগুলোকে আত্মার বিভিন্ন অবস্থা ও আত্মশুদ্ধির উপলব্ধি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। নফসে আম্মারা মানুষকে প্রবৃত্তির দিকে টানে, নফসে লাওয়ামা অন্যায়ের জন্য আত্মসমালোচনায় উদ্বুদ্ধ করে, আর নফসে মুতমাইন্না আল্লাহর স্মরণে প্রশান্তির প্রতীক।

এই আত্মশুদ্ধির জন্য সুফি সাধনায় রয়েছে মুশারাতা, মুরাকাবা, মুজাহাদা, জিকির, মুহাসাবা ও তাওবা। মুশারাতা হলো নিজের সঙ্গে সৎ থাকার অঙ্গীকার; মুরাকাবা হলো আল্লাহর উপস্থিতি ও পর্যবেক্ষণের সচেতনতা; মুজাহাদা হলো প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম; জিকির হলো অন্তরকে আল্লাহর স্মরণে জীবন্ত রাখা; মুহাসাবা হলো প্রতিদিন নিজের কর্মের হিসাব নেওয়া এবং তাওবা হলো ভুল থেকে ফিরে আসা। আল্লাহ বলেন, “জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।” (সূরা আর-রাদ, ১৩:২৮)।

আজকের ভোগবাদী পৃথিবীতে ইন্দ্রিয়জয়ের প্রয়োজন আরও বেশি। বিজ্ঞাপন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতা, অর্থের মোহ ও ক্ষমতার অহংকার মানুষের মনকে প্রতিনিয়ত প্রভাবিত করছে। মানুষ অন্যের জীবন দেখে নিজের জীবনে অসন্তুষ্ট হচ্ছে, অন্যের সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হচ্ছে, আর সাময়িক আনন্দের পেছনে ছুটতে গিয়ে হারিয়ে ফেলছে আত্মিক প্রশান্তি। অথচ প্রকৃত উন্নতি হলো নিজের চাহিদাকে বিবেকের অধীন করা, সম্পদকে সেবার মাধ্যম বানানো এবং ক্ষমতাকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা।

একজন আত্মজয়ী মানুষ দেখেন, কিন্তু লোভী হন না; শোনেন, কিন্তু গুজব ছড়ান না; বলেন, কিন্তু কাউকে অপমান করেন না; সম্পদ অর্জন করেন, কিন্তু অহংকারী হন না; ক্ষমতা লাভ করেন, কিন্তু জুলুম করেন না। তিনি দুনিয়ায় বসবাস করেন, কিন্তু দুনিয়ার দাস হন না। তাঁর কাছে ইন্দ্রিয় সেবক, বিবেক পথপ্রদর্শক এবং স্রষ্টার সন্তুষ্টি জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য।

অতএব, ইন্দ্রিয়জয় মানে জীবনকে অস্বীকার করা নয়; বরং জীবনকে শুদ্ধ, সুন্দর ও অর্থবহ করে তোলা। চোখে সত্যের আলো, কানে জ্ঞানের বাণী, জিহ্বায় সত্যের উচ্চারণ, হাতে মানবসেবা এবং পায়ে ন্যায়ের পথ ধারণ করাই প্রকৃত সাধনা। মানুষ যখন নিজের অন্তরকে জয় করতে শেখে, তখন বাইরের ভয়, লোভ ও আসক্তির প্রভাবও অনেকাংশে কমে আসে।

দশ ইন্দ্রিয় করলে জয়,
থাকবে না তোর কোনো ভয়।
কাম-ক্রোধের হবে ক্ষয়,
অন্তর পাবে নূরের পরিচয়।

পরিশেষে বলা যায়, পৃথিবী জয় করার আগে নিজেকে জয় করো। কারণ আত্মশুদ্ধ মানুষই পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও মানবতার জন্য কল্যাণকর হয়ে উঠতে পারে। ইন্দ্রিয়ের দাসত্ব থেকে বিবেকের নেতৃত্বে, নফসের অন্ধকার থেকে আত্মিক আলোর পথে এবং আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে সৃষ্টির সেবায় উত্তরণের নামই প্রকৃত আত্মমুক্তি।

logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. মো: জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram