

ইরানের সামরিক শক্তির অন্যতম প্রধান অংশ হলো দেশটির ক্ষেপণাস্ত্রভাণ্ডার। এসব ক্ষেপণাস্ত্রের বড় একটি অংশ রাখা হয় পাহাড়ের ভেতরে তৈরি ভূগর্ভস্থ ঘাঁটিতে, যেগুলোকে ‘মিসাইল সিটি’ বলা হয়। প্রশ্ন হলো, ইরানের কাছে এখন কত ক্ষেপণাস্ত্র আছে?
আগে ধারণা করা হতো, ইরানের কাছে ৩ হাজারের বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের হিসাবেও এই সংখ্যা বলা হয়েছিল।
তবে, এখন সেই হিসাব এখন পুরোনো। সর্বশেষ প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলার পর ইরানের কাছে ২ হাজারের কম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে।
চলতি বছরের শুরুতে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছিল, ইরানের কাছে প্রায় ২ হাজার ৫০০ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছিল। তখন বলা হয়েছিল, ইরান প্রতি মাসে কয়েক ডজন নতুন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছিল।
রয়টার্সের হিসাবে, সংঘাতের আগে ইরানের কাছে প্রায় ২ হাজার ৫০০ ক্ষেপণাস্ত্র ছিল। এর মধ্যে এখন প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০টি কার্যকর রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ শক্তভাবে সুরক্ষিত ‘মিসাইল সিটি’ ও টানেলভিত্তিক সংরক্ষণাগার এখনও আংশিক বা পুরোপুরি চালু রয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ ব্যবস্থার প্রায় ৬০ শতাংশ অক্ষত রয়েছে অথবা ক্ষতিগ্রস্ত ঘাঁটি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এসব সংখ্যার সত্যতা এখনও নিশ্চিত নয়।
ইরান ‘ডিসেন্ট্রালাইজড মোজাইক ডিফেন্স’ নামে একটি বিকেন্দ্রীভূত সামরিক কৌশল অনুসরণ করে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছড়িয়ে রাখা হয়। ফলে কেন্দ্রীয় কমান্ড বা যোগাযোগব্যবস্থায় হামলা হলেও সামরিক ইউনিটগুলো কাজ চালিয়ে যেতে পারে।
ইরান কত ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে?
২০২৪ সাল থেকে বিভিন্ন সংঘাতে ইরান হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করেছে।
২০২৬ সালের মে মাসে ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজের এক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে চার দফা সামরিক অভিযানে ইরান প্রায় ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।
ইরানের কাছে বর্তমানে পারমাণবিক অস্ত্র নেই। যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে সক্ষম আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও ইরানের নেই।
কোথায় রয়েছে ইরানের ‘মিসাইল সিটি’?
আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা তথ্য ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইরানের প্রায় ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো:
তাবরিজ মিসাইল বেস: উত্তর-পশ্চিম ইরানের পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশে অবস্থিত। পাহাড়ের ভেতরে তৈরি এই বড় স্থাপনাটি ইরানের অন্যতম বড় ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি। এখানে শাহাব-২ ও শাহাব-৩ মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করা হয়।
খোররামাবাদ সাইলো কমপ্লেক্স: পশ্চিম ইরানের লোরেস্তান প্রদেশে অবস্থিত। এটি ইরানের সবচেয়ে বড় সক্রিয় ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র সাইলো কমপ্লেক্স হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে তরল জ্বালানির ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি ও সংরক্ষণ করা হয়।
কেনেশ্ত ক্যানিয়ন আন্ডারগ্রাউন্ড বেস: পশ্চিম ইরানের কেরমানশাহ প্রদেশে অবস্থিত। স্যাটেলাইট ছবিতে এখানে অন্তত ৬০টি টানেল বাঙ্কার দেখা যায়। দ্রুত ব্যবহারের জন্য মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা এখানে রাখা হয়।
বাখতারান মিসাইল বেস: কেরমানশাহ প্রদেশে অবস্থিত। এখানে ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণ এলাকা ও সুরক্ষিত উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা রয়েছে।
ইসফাহান অ্যাসেম্বলি কমপ্লেক্স: মধ্য ইরানের ইসফাহান প্রদেশে অবস্থিত। এটি ইরানের বড় ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ও সংযোজন কেন্দ্র। এখানে কঠিন ও তরল জ্বালানি তৈরি এবং ক্ষেপণাস্ত্র সংযোজন করা হয়।
সেমনান লঞ্চ সাইট: উত্তর ইরানের সেমনান প্রদেশে অবস্থিত। এটি ইরানের দীর্ঘপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
শাহরুদ স্পেস সেন্টার: তেহরানের উত্তর-পূর্বে সেমনান প্রদেশে অবস্থিত। আইআরজিসি অ্যারোস্পেস ফোর্স পরিচালিত এই স্থাপনায় কঠিন জ্বালানির রকেট মোটর তৈরি ও পরীক্ষা করা হয়।
পারচিন সামরিক কমপ্লেক্স: তেহরানের পূর্বে অবস্থিত। এটি গবেষণা, উন্নয়ন ও জ্বালানি উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা। এখানে ক্ষেপণাস্ত্রের উপাদান ও বিস্ফোরক নিয়ে কাজ করা হয়।
দেজফুল আন্ডারগ্রাউন্ড বেস: দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানের খুজেস্তান প্রদেশে অবস্থিত। পাহাড়ের ভেতরে তৈরি এই ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণ করা হয়।
কেশম দ্বীপ দুর্গ: হরমুজ প্রণালিতে অবস্থিত কেশম দ্বীপে এই ভূগর্ভস্থ ‘মিসাইল সিটি’ রয়েছে। এখানে জাহাজবিধ্বংসী ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রাখা হয়।
খোরগো আন্ডারগ্রাউন্ড ফ্যাসিলিটি: বান্দার আব্বাসের কাছে অবস্থিত। পাহাড়ের ঢালে তৈরি ভূগর্ভস্থ সাইলোতে জাহাজবিধ্বংসী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রাখা হয়।
খোরমুজ সাইলো বেস: দক্ষিণ ইরানের বুশেহর প্রদেশে অবস্থিত। এখানে নয়টি ভূগর্ভস্থ উৎক্ষেপণ সাইলো রয়েছে।
হাজি আবাদ মিসাইল বেস: দক্ষিণ ইরানের হরমোজগান প্রদেশে অবস্থিত। এখানে মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা রাখা হয়।
পাঞ্জ পেলেহ বেস: পশ্চিম ইরানের কেরমানশাহ প্রদেশে অবস্থিত। এটি আইআরজিসির পুরোনো ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোর একটি। ১২ দিনের যুদ্ধে ঘাঁটিটি ব্যাপকভাবে হামলার শিকার হয়।
উত্তর কেরমানশাহ বেস: কেরমানশাহের উত্তরে টাঙ্গেহ কেনেশ্ত এলাকায় অবস্থিত। স্যাটেলাইট ছবিতে এখানে বহু গোলাবারুদ বাঙ্কার ও টানেলের প্রবেশপথ দেখা যায়।
বিদগানেহ মিসাইল ফ্যাসিলিটি: তেহরানের পশ্চিমে আলবোর্জ প্রদেশে অবস্থিত। এটি আইআরজিসির গবেষণা ও কঠিন জ্বালানি উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
গার্মদারেহ মিসাইল বেস: তেহরান অঞ্চলে অবস্থিত। এটি উত্তরাঞ্চলের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।
দেহ তোরকামান বেস: তেহরানের পূর্বে অবস্থিত। এখানে ভূগর্ভস্থ অস্ত্র সংরক্ষণ ব্যবস্থা রয়েছে।
গার্মসার মিসাইল সাইট: সেমনান প্রদেশে অবস্থিত। এটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা ও প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হয়।
আল-জাহরা গ্যারিসন: তাবরিজ অঞ্চলের পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশে অবস্থিত। এটি উত্তর তাবরিজের ‘মিসাইল সিটি’ হিসেবেও পরিচিত।
মোবারেকেহ কমপ্লেক্স: ইসফাহান থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। এটি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির জন্য বিভিন্ন কাঠামোগত উপাদান সরবরাহ করে।
আহমাদ কাজেমি বেস: মধ্য ইরানের ইসফাহান অঞ্চলে অবস্থিত। এখানে মোবাইল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা রাখা হয়।
ইয়া হায়দার কারার বেস: উত্তর ইরানের আলবোর্জ পর্বতমালায় অবস্থিত। এটি ইরানের অন্যতম বড় ও গভীর ভূগর্ভস্থ সামরিক কেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
ত্রিরেজে মিসাইল সাইট: উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলে অবস্থিত। পাহাড়ের গভীরে তৈরি এই স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র গোপন রাখা হয়।
কোম সাবটেরেনিয়ান বেস: মধ্য ইরানের কোম প্রদেশে অবস্থিত। এটি ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনার কাছাকাছি অবস্থিত একটি গভীর ভূগর্ভস্থ ঘাঁটি।
শিরাজ মিসাইল ফ্যাসিলিটি: দক্ষিণ ইরানের ফার্স প্রদেশে অবস্থিত। শিরাজের আশপাশে দুটি প্রধান ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি রয়েছে। এখানে মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়।
বান্দার আব্বাস নৌ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি: দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত। আইআরজিসি নৌবাহিনী পরিচালিত এই ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় জাহাজবিধ্বংসী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রাখা হয়।
দোরুদ মিসাইল ফ্যাসিলিটি: পশ্চিম ইরানের লোরেস্তান প্রদেশে অবস্থিত। এটি কাছের খোররামাবাদ কমপ্লেক্সকে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ও সরবরাহে সহায়তা করে।
আরাক রিসার্চ কমপ্লেক্স: পশ্চিম ইরানের মার্কাজি প্রদেশে অবস্থিত। পারমাণবিক গবেষণার পাশাপাশি এখানে ক্ষেপণাস্ত্রের নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার গবেষণাও করা হয়।
কারাজ আরঅ্যান্ডডি ফ্যাসিলিটি: তেহরানের কাছে আলবোর্জ প্রদেশে অবস্থিত। এটি প্রতিরক্ষা খাতের ইলেকট্রনিক্স ও শিল্প গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
মানজারিয়াহ ফুয়েল সাইট: কোম ও তেহরান সীমান্ত এলাকায় অবস্থিত। এখানে তরল রকেট জ্বালানি নিয়ে গবেষণা, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ করা হয়।
তথ্যসূত্র: গালফ নিউজ
