

বাংলাদেশ সরকারের ক্রেডিট রেটিংয়ের পূর্বাভাস ‘নেতিবাচক’ থেকে ‘স্থিতিশীল’ করেছে আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা মুডিজ রেটিংস। তবে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ইস্যুয়ার ও সিনিয়র আনসিকিউরড রেটিং ‘বি২’ এবং স্বল্পমেয়াদি ইস্যুয়ার রেটিং অপরিবর্তিত রেখেছে সংস্থাটি।
মুডিজ রেটিংস বিশ্বের অন্যতম প্রধান ক্রেডিট রেটিং সংস্থা। বিভিন্ন দেশের সরকার, ব্যাংক ও কোম্পানির ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা, আর্থিক অবস্থান এবং সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি মূল্যায়ন করে থাকে প্রতিষ্ঠানটি।
মুডিজের পর্যবেক্ষণে, রাজনৈতিক ও বৈদেশিক চাপের কারণে বাংলাদেশের রেটিংয়ের পূর্বাভাস আগে ‘নেতিবাচক’ করা হলেও বর্তমানে সেই চাপ কিছুটা কমেছে। নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি, নমনীয় বিনিময় হার এবং রেকর্ড রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক অবস্থানকে আগের তুলনায় শক্তিশালী করেছে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৪ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় ২১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে তা বেড়ে ৩২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে দেশের চার মাসের বেশি আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও উন্নতির পূর্বাভাস দিয়েছে মুডিজ। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ২০২৮ অর্থবছর থেকে তা প্রায় ৪ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।
তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, আমদানি ব্যয় এবং তৈরি পোশাক খাতের চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে বলে জানিয়েছে মুডিজ। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি থাকা মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমতে পারে।
বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা, বড় ও বহুমুখী অর্থনীতি, অনুকূল জনমিতিক কাঠামো এবং প্রতিযোগিতামূলক তৈরি পোশাক খাতকে দেশের অর্থনীতির অন্যতম শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছে মুডিজ।
তবে সরকারের সংকীর্ণ রাজস্বভিত্তি, দুর্বল ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা এবং ব্যাংকিং খাতের বড় ধরনের দুর্বলতাকে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে দেখছে সংস্থাটি। মুডিজের হিসাবে, বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ। ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনীয় মূলধন পর্যায়ে ফিরিয়ে নিতে পুনঃমূলধনীকরণে জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হতে পারে। এতে সরকারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক দায় তৈরির ঝুঁকি রয়েছে।
মুডিজ জানিয়েছে, বাংলাদেশের মোট সরকারি ঋণ জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ হলেও সরকারের রাজস্বের প্রায় ৩০ শতাংশ সুদ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। তবে বহুপক্ষীয় ও দ্বিপক্ষীয় উৎস থেকে সহজ শর্তে অর্থায়নের সুযোগ ঋণের ব্যয় এবং পুনঃঅর্থায়ন ঝুঁকি কিছুটা কমাতে সহায়তা করছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের অব্যাহত যোগাযোগকে বৈদেশিক অর্থায়ন এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখছে মুডিজ। সংস্থাটি জানিয়েছে, সরকার নতুন একটি আইএমএফ-সমর্থিত কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করছে।
তবে রাজস্ব আদায়, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং বিনিময় হার নীতিতে অগ্রগতি প্রত্যাশার তুলনায় ধীর হলে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
মুডিজের মতে, ব্যাংকিং খাতের সংস্কারে দ্রুত অগ্রগতি, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রেটিং উন্নত হতে পারে। অন্যদিকে, ব্যাংকিং খাতের বড় আর্থিক দায় সরকারের ওপর এসে পড়া, প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা দুর্বল হওয়া, রাজস্ব ও বৈদেশিক খাতে অবনতি, আইএমএফ-সমর্থিত সংস্কার কর্মসূচি থেকে বড় ধরনের বিচ্যুতি অথবা নতুন রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা রেটিংয়ের ওপর নিম্নমুখী চাপ তৈরি করতে পারে।
মুডিজ আরও জানিয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মৌলিক বিষয় ও প্রতিষ্ঠানগত সক্ষমতায় বড় ধরনের পরিবর্তন না হলেও দেশের আর্থিক সক্ষমতা ও ঋণ পরিস্থিতি কিছুটা দুর্বল হয়েছে। তবে বিদ্যমান ঝুঁকিগুলো বাংলাদেশের ‘বি২’ রেটিংয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছে সংস্থাটি।
