

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ সংকট আরও গভীর হয়েছে। দলের প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য নতুন ধাক্কা হিসেবে তৃণমূল কংগ্রেসের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সভাপতি চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য দলীয় সব পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন।
শনিবার পদত্যাগপত্রে চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য জানান, ২০২৫ সালের ৩ জুন কালীঘাটে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তাকে যে রাজ্য সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, সেখান থেকে তিনি সরে দাঁড়াচ্ছেন। একই সঙ্গে বর্তমানে দলের অধীনে থাকা সব দায়িত্ব থেকেও তিনি পদত্যাগ করছেন।
পদত্যাগপত্রে তিনি আরও উল্লেখ করেন, তৃণমূল কংগ্রেস ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবের অনুমোদিত স্বাক্ষরকারী (অথরাইজড সিগনেটরি) হিসেবে নিজের দায়িত্ব প্রত্যাহার করছেন। পাশাপাশি ভারতের নির্বাচন কমিশনের কাছে দলের অনুমোদিত প্রতিনিধি হিসেবেও আর থাকছেন না।
তবে চিঠির শেষ অংশে তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা প্রকাশ করে বলেন, তার প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান সবসময়ই থাকবে।
পদত্যাগের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য বলেন, ‘যেখানে বিশ্বাস নেই, যেখানে আস্থা নেই, সেখানে কাজ করা সম্ভব নয়। সে কারণেই আমরা পদত্যাগ করেছি।’
পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার পরই তিনি বিদ্রোহী নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীর সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বৈঠক করেন। সম্প্রতি সংখ্যাগরিষ্ঠ তৃণমূল বিধায়কদের সমর্থন নিয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বিধানসভার বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। যদিও এই পদে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দলের জ্যেষ্ঠ নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে মনোনীত করেছিলেন।
চন্দ্রিমার পদত্যাগের কড়া সমালোচনা করেছেন মমতা-ঘনিষ্ঠ তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন তাকে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিত্ব ও দলীয় দায়িত্ব দিয়েছিলেন, তখন কেন তিনি পদত্যাগ করেননি?’
চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য দীর্ঘদিন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মন্ত্রী ছিলেন এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবেই পরিচিত ছিলেন।
এদিকে এই পদত্যাগকে তৃণমূলের রাজনৈতিক দুর্বলতার প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সভাপতি সমীক ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছে তৃণমূল কংগ্রেসের আর কোনো রাজনৈতিক গুরুত্ব নেই। দলের নিয়ন্ত্রণ কোন গোষ্ঠীর হাতে যাবে, সেটিও এখন আর মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়।’
বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর থেকেই তৃণমূল কংগ্রেসে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ তীব্র আকার ধারণ করেছে। দলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে পৃথক গোষ্ঠী গঠন করেছে। একই সঙ্গে দলের ২০ জন সংসদ সদস্যও বিদ্রোহ ঘোষণা করে এনডিএ জোটের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন এবং এনসিপিআই নামে একটি ছোট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে একীভূত হয়েছেন।
এর আগে শুক্রবার কলকাতার তৃণমূল ভবনকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিদ্রোহী গোষ্ঠী দলটির মহানগর সদর দপ্তরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভবনের তালা পরিবর্তন করে এবং অরূপ রায়কে চেয়ারম্যান ঘোষণা করে নতুন সাইনবোর্ড টাঙায়। একই সঙ্গে তারা নিজেদের আসল তৃণমূল দাবি করে নির্বাচন কমিশনের কাছেও স্বীকৃতি চায়।
অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগত নেতারাও তৃণমূল ভবনে গিয়ে ভবন দখলের অভিযোগে পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভবনের আশপাশে কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনী (সিআরপিএফ) ও কলকাতা পুলিশের অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়।
ক্রমবর্ধমান এই বিদ্রোহ ও দলীয় বিভক্তির ফলে পশ্চিমবঙ্গের প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে একসময় পরিচিত তৃণমূল কংগ্রেস এখন গভীর রাজনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছে।
