

পারস্য উপসাগরে সামরিক উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি হামলার মাঝেই ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তির লক্ষ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ চলছে। এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে চলমান আলোচনায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। ‘পড ফোর্স ওয়ান’ নামের একটি পডকাস্টে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি তার (মোজতবা খামেনি) সঙ্গে দেখা করতে চাই। পরিস্থিতি কীভাবে এগোয়, তার ওপর নির্ভর করে কোনো এক সময় হয়তো আমাদের দেখা হবে।’
একই সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি জানান, লেবাননে নেতানিয়াহুর অব্যাহত সামরিক তৎপরতা তাকে বিরক্ত করেছে। তবে একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার সম্পর্ক এখনও ভালো।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সিএনবিসিকে জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি, তবে তেহরান দুর্বল হয়ে পড়েছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। হরমুজ প্রণালি সামরিকভাবে উন্মুক্ত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, ট্রাম্পের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে।
এদিকে পারস্য উপসাগরে নতুন করে শুরু হওয়া ইরান-মার্কিন সামরিক সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করেছে। গতকাল বুধবার কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত একজন নিহত এবং ৬০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। এই হামলার পর কুয়েতের বিমান চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত করা হলেও পরে তা পুনরায় চালু করা হয়। ইরান দাবি করেছে, তারা বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর এবং একটি বিমান ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে।
ইরানি হামলার জবাবে মার্কিন সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালির কাছে কুয়েশম দ্বীপ এবং দক্ষিণ ইরানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ও মাইন স্থাপনকারী বোটগুলো লক্ষ্য করে নতুন করে ‘রক্ষণাত্মক বিমান হামলা’ চালিয়েছে। এই সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। উল্লেখ্য, গত ফেব্রুয়ারি মাসে ইরান ও ইসরায়েলে মার্কিন হামলার পর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ প্রায় বন্ধ রয়েছে।
চলতি এপ্রিলের শুরুতে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করার মার্কিন প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে এই যুদ্ধবিরতি এখন হুমকির মুখে। ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুদ্ধ বন্ধের জন্য পরোক্ষ আলোচনা চলছে এবং ইরান পারমাণবিক অস্ত্র না বানানোর বিষয়ে সম্মত হয়েছে। তবে ইরানের পক্ষ থেকে লেবানন যুদ্ধ বন্ধ এবং তাদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের শর্ত দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, ট্রাম্প চাইলে তারা ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযানে অংশ নিতে প্রস্তুত।
কূটনীতিক ও আঞ্চলিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সম্ভাব্য চুক্তিটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়, বরং একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি। এর মূল উদ্দেশ্য হলো হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা, বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের ওপর থেকে চাপ কমানো এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য একটি রাজনৈতিক নিরাপদ প্রস্থানের পথ তৈরি করা। আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, চুক্তির আওতায় ইরান হরমুজ প্রণালির অবরোধ তুলে নেবে এবং বিনিময়ে তাদের প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের অবরুদ্ধ তহবিল ফেরত পাবে কিংবা সীমিত আকারে নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পাবে।
আগামী নভেম্বরের কংগ্রেস নির্বাচনের দিকে নজর রেখে ট্রাম্প এমন একটি চুক্তি চাইছেন, যা দিয়ে তিনি দাবি করতে পারেন যে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচিতে লাগাম টানা গেছে। তবে ওয়াশিংটন ইরানকে কোনো স্থায়ী নিরাপত্তা গ্যারান্টি দিতে রাজি নয় এবং ইসরায়েলও ইরানকে তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি মনে করে। অন্যদিকে ইরান মনে করে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও আঞ্চলিক মিত্রদের অক্ষুণ্ন রাখা অপরিহার্য।
বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তিটি মূলত কঠিন সমস্যাগুলোকে ‘দ্বিতীয় ধাপে’ ঠেলে দেওয়ার একটি সাময়িক কৌশল। এর ফলে যুদ্ধ সাময়িকভাবে থামলেও, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার মূল আদর্শিক ও কৌশলগত সংঘাতের অবসান ঘটছে না।
