ঢাকা
৩রা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
রাত ১১:৫১
logo
প্রকাশিত : জুন ৩, ২০২৬

মমতা ব্যানার্জীর দল তৃণমূল কংগ্রেস কি ভাঙনের দিকে এগোচ্ছে?

বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যেই প্রায় দেড় দশক পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেস দলে ভাঙ্গনের চিহ্ন ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

ভোটের পরে বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের প্রস্তাবনা পত্রে বিধায়কদের স্বাক্ষরে অসংগতির অভিযোগ তুলে দুই নবনির্বাচিত বিধায়ক ঋতব্রত ব্যানার্জী এবং সন্দীপন সাহাকে দল থেকে বহিষ্কার করার পরে দলটির একটি অংশ ‘বিদ্রোহী’ হয়ে উঠেছেন বলে জানা যাচ্ছে। খবর বিবিসি বাংলার।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন তৃণমূল কংগ্রেসের একাংশ যে ‘বিদ্রোহী’ হয়ে উঠেছেন, তার একটা নমুনা হলো গত রোববার মমতা ব্যানার্জী নবনির্বাচিত ৮০ জন বিধায়ককে এক বৈঠকে ডেকেছিলেন, কিন্তু সেখানে হাজির হয়েছিলেন মাত্র কুড়ি জন।

এই আবহে দলের অন্দরের পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

একদিকে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে বলতে শোনা গিয়েছে তৃণমূল ‘কার্যত উঠে যাওয়া একটা পার্টি।’

অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মমতা ব্যানার্জী দাবি করেছেন তৃণমূলকে ভাঙা কখনোই সম্ভব নয়।

এরপরেই সোমবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়ে দেন যে বিধায়কদের স্বাক্ষরে অসংগতির অভিযোগটা বিধানসভার স্পিকারের কাছে জানিয়ে এসেছিলেন তৃণমূল কংগ্রসেরই দুই বিধায়ক- ঋতব্রত ব্যানার্জী ও সন্দীপন সাহা।

এছাড়াও দলটির অনেক নেতা, মুখপাত্র, বিধায়কও ভোটে হারার পর থেকেই দলের শীর্ষ নেতৃত্ব, বিশেষ করে সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ও মমতা ব্যানার্জীর ভাইপো অভিষেক ব্যানার্জীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই মুখ খুলতে শুরু করেছেন।

সেইসব নেতাদের মধ্যে ছিলেন ঋতব্রত ব্যানার্জীও। তারমধ্যেই দিল্লি সফরে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত এই বিধায়কের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সামান্য কথাও হয়। তা নিয়েও জল্পনা চলছিলই যে তিনি বিজেপিতে যোগ দিতে চলেছেন কিনা।

সে সময় বিজেপিতে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেন সিপি(আই)এম দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়া এ নেতা। আবার বিজেপিও জানিয়ে দিয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস বা অন্যদল থেকে কাউকে নেওয়া হবে না।

তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পরে কথিত ‘বিদ্রোহীদের’ নেতৃত্বে থাকা ঋতব্রত ব্যানার্জী ও সন্দীপন সাহার পরিকল্পনায় দলের ফাটল ‘চওড়া’ হওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন অনেকে।

যদি নির্বাচিত বিধায়কদের সিংহভাগের ‘সমর্থন’ তারা পান তাহলে এদের মধ্যেই কেউ বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার পদ দাবি করতে পারেন।

বিজেপির তাপস রায় এ প্রসঙ্গে ইঙ্গিত করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, তৃণমূল কংগ্রেস ভেঙে চুরমার। মহারাষ্ট্রের মতন অবস্থা হলো তৃণমূলের। বিধানসভার স্পিকার এর কাছে প্রায় ৫০ জন টিএমসির বিধায়ক নিয়ে পৌঁছে গেছে ঋতব্রত। খেলা হবে।

মঙ্গলবার বিধানসভায় প্রবেশের আগে ঋতব্রত ব্যানার্জীকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আমাকে তৃণমূল বহিষ্কার করতে পারে কিন্তু তাতে মমতা ব্যানার্জীর প্রতি আমার শ্রদ্ধা এতটুকুও কমে যায় না। তিনি আমাদের সকলের নেত্রী।

তবে তাপস রায়ের মন্তব্যের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে, তিনি বলেন, আমি আর সন্দীপন যৌথভাবে স্পিকারকে বিষয়টা জানিয়েছিলাম। আমি আমার আর সন্দীপনের দায় নিতে পারব তবে কোনো জল্পনাকে ইন্ধন দেওয়ার মতো কোনো উপাদান আমার কাছে নেই।

সই সংক্রান্ত ‘অসংগতি’

সই সংক্রান্ত যে অভিযোগ উঠেছে, সে সম্পর্কে জানতে হলে কয়েকদিন পিছিয়ে যেতে হবে।

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় কে বিরোধী দলনেতা হবেন, তা ঠিক করতে গত ছয়ই মে মমতা ব্যানার্জীর বাড়িতে বিধায়কদের একটা বৈঠক হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী, বিধানসভায় এ সংক্রান্ত প্রস্তাবনা জমা দেওয়ার কথা।

বিধানসভায় তৃণমূল বিধায়কদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের পর নিয়ম মেনে সই করেন সমস্ত বিধায়কেরা। স্পিকারের তরফে বিরোধী দল হিসাবে তৃণমূলের কাছ থেকে বিরোধী দলনেতার নাম নিয়ে প্রস্তাবনা পত্র চাওয়া হয়।

এরপর ১৯শে মে আবার কালীঘাটে বৈঠক ডাকেন মমতা ব্যানার্জী। কিন্তু ওই দিন অনেকে অনুপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগ। উপস্থিত সকলের সই নেওয়া হয় দলের তরফে। সমস্যার সূত্রপাত ওই প্রস্তাবনাকে ঘিরেই। বিধায়কদের সইতে অসংগতি আছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ ঘটনার কথা প্রকাশ্যে আসার পর তৃণমূল পাল্টা অভিযোগ তোলে এর নেপথ্যে রয়েছে বিজেপি।

সোমবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট করে দেন যে বিজেপি নয়, তৃণমূলের টিকিটে বিধানসভা ভোটে জিতে আসা ঋতব্রত ব্যানার্জী ও সন্দীপন সাহা বিধানসভার স্পিকারের কাছে ওই বিষয়ে অভিযোগ জানিয়েছিলেন।

তারপরই তৃণমূল কংগ্রেস ওই দুই বিধায়ককে বহিষ্কার করে। তাদের বিরুদ্ধে ‘দল বিরোধী কার্যকলাপের’ অভিযোগ তোলা হয়েছে।

এদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস বিধায়কদের স্বাক্ষরে অসংগতির অভিযোগ ওঠার পরই এ নিয়ে কলকাতার হেয়ার স্ট্রিট থানায় অভিযোগ দায়ের হয়। পরে মুখ্যমন্ত্রী মামলার তদন্তের ভার রাজ্য পুলিশের সিআইডিকে দেন।

সংশ্লিষ্ট নথি দেখিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অভিযোগ তুলেছেন, বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা, উপ-দলনেতা এবং মুখ্য সচেতকের নাম প্রস্তাবনা পত্রে বিধায়কদের যে স্বাক্ষর রয়েছে তার মধ্যে বেশ কয়েকটা ইংরেজির ব্লক লেটারে। তিনি জানিয়েছেন তদন্তের সময় বিধায়কদের অনেকে জানিয়েছেন, তারা নাকি ওই প্রস্তাবনায় সই-ই করেননি।

এ বিষয়ে অভিষেক ব্যানার্জীকে তলব করেছিল সিআইডি। সোমবার ‘শারীরিক অসুস্থতার’ কারণ দেখিয়ে হাজিরা দেননি অভিষেক ব্যানার্জী।

‘যা হয়েছে ঠিক হয়নি’

সইয়ে অসংগতির অভিযোগ ও তৃণমূলের তরফে বহিষ্কার প্রসঙ্গে ঋতব্রত ব্যানার্জী বলেছেন, বিধায়ক বা সাংসদ হিসাবে কেউ যখন শপথ গ্রহণ করেন, তখন তিনি সংবিধানের নামে শপথ নেন। ভয় বা পক্ষপাতের উর্দ্ধে উঠে তারা কাজ করেন। যা হয়েছে তা ঠিক হয়নি।

তিনি বলেন, দলের বৈঠকে যখন আমরা দ্বিতীয়বার যাই তখন বলা হয়েছিল ১৯ মে তারিখে মিটিং কিন্তু আপনারা সই করার সময় তারিখ ছয়ই মে লিখুন…আপনারা জিজ্ঞাসা করতে পারেন এতদিন কেন বলেননি। আসলে অত সাহস ছিল না।

তিনি আরও বলেন, আমার আগে অনেকে সই করেছিলেন, আমি দেখলাম এমন অনেকের সই রয়েছে যারা বৈঠকেই আসেননি।

তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত আরেক বিধায়ক সন্দীপন সাহা বার্তাসংস্থা এএনআইকে বলেছেন, দলে নৈতিক কথাবার্তা বললেই দলবিরোধী কার্যকলাপের দায়ে অভিযুক্ত করা হয়, কারণ দল নিজেই নৈতিক আচরণ করে না।

তবে দলের পদক্ষেপ নিয়ে তার ‘আক্ষেপ নেই’ বলেই জানিয়েছেন তিনি।

তার কথায়, যদি নৈতিক কাজের জন্য দল থেকে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয় তাহলে আমি খুশি। কারণ নৈতিক কাজ করাই আইনপ্রণেতাদের দায়িত্ব এবং আমরা ঠিক সেটাই করেছি।

কড়া সমালোচনায় তৃণমূল

এই দুই বিধায়কের পদক্ষেপ নিয়ে পাল্টা প্রশ্ন তুলেছে তৃণমূল কংগ্রেস।

দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বক্তব্য, ঋতব্রত ব্যানার্জী ও সন্দীপন সাহার উচিত ছিল এই বিষয়ে বিধানসভার স্পিকারের বদলে তৃণমূলকে জানানো।

ঋতব্রত ব্যানার্জীর নাম না করেই মমতা ব্যানার্জী ফেসবুক লাইভ থেকে বলেছেন, সিপিএম করত। আমাদের ভুল হয়েছে তাকে টিকিট দেওয়া। পায়ে এসে পড়েছিল। সেদিন সিপিএম ঠিক করেছিল।

একদা সিপি(আই)এম’র তরফে রাজ্যসভার সাংসদ করা হয়েছিল ঋতব্রত ব্যানার্জীকে। কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ২০১৭ সালে একাধিক অভিযোগে তাকে বহিষ্কার করে সিপি(আই)এম। এরপর রাজ্যসভায় দলহীন অবস্থাতেই সংসদ সদস্য হিসাবে তিন বছর কাটান। পরে তৃণমূলে যোগ দেন তিনি। চলতি বিধানসভা ভোটে তাকে প্রার্থীও করে তৃণমূল। সেই প্রসঙ্গ টেনেই কটাক্ষ করেছেন মমতা ব্যানার্জী।

দলের দুই অধুনা বহিষ্কৃত বিধায়ক সম্পর্কে কুণাল ঘোষ বলেছেন, জিতে গেলে, সরকার গড়লে সব ভাল। আর আজ দল ক্ষমতায় নেই বলে সব খারাপ হয়ে গেল? তা হলে দলের টিকিটে ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন কেন?

দলে সত্যিই ভাঙন ধরেছে?

ঋতব্রত ব্যানার্জী ও সন্দীপন সাহাকে তৃণমূল কংগ্রেস বহিষ্কার করার পর এ মুহূর্তে দলটির বিধায়ক সংখ্যা ৮০ থেকে কমে ৭৮তে দাঁড়িয়েছে।

যদি তৃণমূলের ৮০ জন বিধায়কই ধরা যায়, তাহলে দুই-তৃতীয়াংশ বা তার বেশি অর্থাৎ, অন্তত ৫৩ জন বিধায়ক দলত্যাগ করতে রাজি হন তাহলে বিরোধী দলনেতার পদের দাবি জানাতে পারেন।

ইতোমধ্যে জল্পনা শুরু হয়েছে যে তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়কদের একটা বড় অংশ নাকি বেরিয়ে যেতে পারেন। তৃণমূল অবশ্য সেই জল্পনা খারিজ করে দিয়েছে।

কলকাতার সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক শিখা মুখার্জী বলেছেন, কোনো দলের ভাঙনের ক্ষেত্রে পুশ ও পুল এ দুই ফ্যাক্টর কাজ করে। মমতা ঋতব্রত এবং সন্দীপনকে ছাড়া এই মুহূর্তে কাউকে বহিষ্কার করেননি। আর পুল ফ্যাক্টর বলতে বিজেপির শমীক ভট্টাচার্য আগেই জানিয়েছেন অন্য দল ছেড়ে বেরিয়ে আসা কাউকে তারা নেবেন না। অন্যদিকে কংগ্রেসও তৃণমূলের কাউকে নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখায়নি।

সম্প্রতি অভিষেক ব্যানার্জীসহ দলের বিভিন্ন নেতাকে ঘিরে যেভাবে বিক্ষোভ দেখা গিয়েছে, তেমনটাও আগে দেখা যায়নি।

বিবিসি বাংলার সিনিয়র সাংবাদিক শুভজ্যোতি বলেন, এ দলের সে অর্থে কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ নেই। দলটি পুরোপুরি নেত্রী মমতা ব্যানার্জী কেন্দ্রিক, তার ইচ্ছা-অনিচ্ছাই দলে শেষ কথা– আর সে কারণেই মমতা নিজে যখন কোণঠাসা, তৃণমূল কংগ্রেসও দল হিসেবে দিশেহারা অবস্থায় পড়েছে।

তিনি আরও বলেন, শুধুমাত্র মমতা ব্যানার্জীর সাফল্যের কারণেই দলটি এতদূর আসতে পেরেছিল। কিন্তু তার শক্ত ঘাঁটি ভবানীপুর আসনরও মমতার শোচনীয় পরাজয়ের পর দলের ভাঙন স্পষ্টতই দৃশ্যমান।

শুভজ্যোতি বলেন, অথচ আজকের তারিখেও লোকসভা ও রাজ্যসভা মিলিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের ৪২ জন সংসদ সদস্য, রাজ্য বিধানসভায় ৮০ জন বিধায়ক এবং পশ্চিমবঙ্গে ৪১ শতাংশ ভোট রয়েছে। তবুও, যে প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, তা এক অর্থে মমতা ব্যানার্জীকে লক্ষ্য করেই। বলা হচ্ছে তিনি অভিষেক ব্যানার্জীর বিরুদ্ধে যতই অভিযোগ থাক তা নিয়ে কিছুই করেননি এবং পরিবারের বিষয়ে চোখ বন্ধ রেখেছিলেন।

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram