ঢাকা
logo
প্রকাশিত : July 23, 2026

শিশুদের মধ্যে বাড়ছে ফ্যাটি লিভারের বিপজ্জনক বিস্তার, করণীয় কী

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ‘ফ্যাটি লিভার’ বা যকৃতে চর্বি জমার সমস্যাটিকে মূলত প্রাপ্তবয়স্কদের রোগ হিসেবেই দেখা হতো। কিন্তু এখন বিশ্বজুড়ে চিকিৎসকেরা এক উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ করছেন। শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে এই রোগের প্রাদুর্ভাব ক্রমশ বাড়ছে, যা তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এটিকে অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল দীর্ঘস্থায়ী লিভারের রোগে পরিণত করেছে।

অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলকায় শিশুদের মধ্যে এর ঝুঁকি আরও বেশি। গবেষণা বলছে, ১৯৭৫ সালে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে স্থূলতার হার ছিল মাত্র ৪ শতাংশ, যা ২০১৬ সালে বেড়ে ১৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফ্যাটি লিভার বা 'মেটাবলিক ডিসফাংশন-অ্যাসোসিয়েটেড স্টেয়াটোটিক লিভার ডিজিজ' বিশ্বব্যাপী শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের সবচেয়ে সাধারণ দীর্ঘস্থায়ী লিভারের রোগে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৫ থেকে ১০ শতাংশ শিশু এই রোগে আক্রান্ত।

প্রতিবেশী দেশ ভারতও এর ব্যতিক্রম নয়। ১১ থেকে ১৫ বছর বয়সি অতিরিক্ত ওজনের শিশুদের ওপর করা স্কুলভিত্তিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, তাদের প্রায় ৬২ শতাংশেরই কোনো স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই ফ্যাটি লিভার রয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে এমনও বলা হয়েছে যে, ভারতের প্রায় ৩৫ শতাংশ শিশুর বর্তমানে ফ্যাটি লিভার থাকতে পারে। এদের অনেকেরই ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, উচ্চ ট্রাইগ্লিসারাইড বা উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা রয়েছে, যা লিভারের রোগ ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের (মেটাবলিক হেলথ) মধ্যে গভীর সম্পর্কের বিষয়টিই তুলে ধরে।

শিশুদের ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এটি নীরবে শরীরে বাসা বাঁধে। বেশিরভাগ শিশুই নিজেকে পুরোপুরি সুস্থ মনে করে এবং তাদের কোনো শারীরিক সমস্যার কথা জানায় না। অথচ লিভারে ধীরে ধীরে চর্বি জমতে থাকে, যা একপর্যায়ে প্রদাহ এবং লিভারের ক্ষতির কারণ হতে পারে। সময়মতো পরীক্ষা না করালে এই নীরব ঘাতক বা 'টিকিং বোম' পরবর্তী জীবনে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ এবং লিভারের মারাত্মক জটিলতার জন্ম দিতে পারে।

ফ্যাটি লিভারের প্রকৃত কারণ

ফ্যাটি লিভার বাড়ার পেছনে কেবল চর্বিযুক্ত খাবারই দায়ী নয়। শিশুদের ক্ষেত্রে স্থূলতা এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সকেই এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই রোগের পেছনের মূল কারণগুলো হলো:

অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস: অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয়, রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেট, প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ শরীরে অস্বাস্থ্যকর ওজন বৃদ্ধি করে।

জীবনযাপন: শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম (মোবাইল বা টিভির পর্দায় চোখ রাখা) এই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, চিনিমুক্ত ও স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার ফলে মাত্র আট সপ্তাহের মধ্যে বয়ঃসন্ধিকালীন শিশুদের লিভারের চর্বি উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে। গবেষকেরা ফ্যাটি লিভারের জন্য নির্দিষ্ট কোনো একক উপাদানকে (যেমন: রান্নার তেল) দায়ী করেন না। বরং অতিরিক্ত ক্যালরি, বিপাকীয় সমস্যা, জিনগত প্রবণতা এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার সম্মিলিত রূপই এই রোগের কারণ।

তাই ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধের মূল লক্ষ্য শুধু ওজন কমানো নয়, বরং পেটের মেদ কমানো এবং বিপাকীয় স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটানো। খাদ্যতালিকায় ফলমূল, শাকসবজি, গোটা শস্য, ডাল, বাদাম, বীজ এবং সামুদ্রিক মাছের মতো পুষ্টিকর খাবার রাখা জরুরি। ট্রান্স ফ্যাটের বদলে ওমেগা-৩ (মাছের তেল, চিয়া সিড, ফ্ল্যাক্স সিড) এবং ওমেগা-৬ (পাম তেল, সয়াবিন, আখরোট, ডিম, সূর্যমুখী তেল) সমৃদ্ধ স্বাস্থ্যকর চর্বি বেছে নিতে হবে।

টোকোট্রিয়েনল: সম্ভাবনাময় এক সমাধান

সুষম খাদ্যে চর্বির ভূমিকা সম্পর্কে সচেতনতার পাশাপাশি বিজ্ঞানীরা চর্বিতে থাকা প্রাকৃতিক বায়োঅ্যাকটিভ যৌগগুলো নিয়েও গবেষণা করছেন। এমনই একটি যৌগ হলো 'টোকোট্রিয়েনল', যা ভিটামিন 'ই'-এর একটি বিশেষ রূপ। এটি পাম তেলে প্রচুর পরিমাণে এবং রাইস ব্র্যান অয়েলে মাঝারি মাত্রায় পাওয়া যায়।

পাম তেলে ফ্যাটি অ্যাসিডের এক চমৎকার ভারসাম্য রয়েছে। এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি (প্রদাহরোধী) গুণ রয়েছে। প্রাণী ও মানুষের ওপর করা বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, টোকোট্রিয়েনল লিভারের চর্বি কমাতে, লিভারের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এবং প্রদাহ ও দাগ (স্কারিং) কমাতে সাহায্য করতে পারে।

আমাদের করণীয়

যদিও টোকোট্রিয়েনল বা অন্যান্য পুষ্টি উপাদান নিয়ে গবেষণা চলছে, তবে কোনো সাপ্লিমেন্টই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের বিকল্প হতে পারে না। শিশুদের সুস্থ রাখতে প্রয়োজন:

• সুষম খাদ্যাভ্যাস

• নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম

• প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলা

• পর্যাপ্ত ঘুম ও স্ক্রিন টাইম কমানো

ছোটবেলার এই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন পদ্ধতি শিশুর সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘস্থায়ী ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই পরিবার ও স্কুলগুলোকে শিশুদের স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে উৎসাহিত করতে হবে। সবার জন্য স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করতে এবং সঠিক খাবার বেছে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে সমাজ ও সরকারকেও এগিয়ে আসতে হবে।

সূত্র: এনডিটিভি

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram