

হিমালয়কন্যা নেপালে নতুন করে আঘাত হেনেছে ভূমিধস ও ভারী বৃষ্টিপাত। এতে প্রায় ৩০ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। এর আগে আগস্ট মাসের প্রলয়ংকারী বন্যায় দেশটিতে ১ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল এবং এখনো হাজার হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহের শেষ দিকে থেকে ১ হাজার ৯০০টির বেশি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ২৪০টিরও বেশি ঘরবাড়ি আংশিক বা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রবল স্রোতে ভেসে গেছে রাস্তাঘাট, গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও সেতু।
নেপালের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা অন্নপূর্ণা সামিটের শত শত ট্রেকারকে আকস্মিক এই দুর্যোগের কারণে তাদের হাইকিং সংক্ষিপ্ত করে নিরাপদে সরে আসতে হয়েছে। সাধারণত যে পথ শেষ করতে তিন সপ্তাহ সময় লাগে, সেই মানাং ও মুস্তাং জেলার বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে অনেক ট্রেকারকে হেলিকপ্টারে করে উদ্ধার করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের সাফোকের ২১ বছর বয়সী ট্রেকার জ্যাক স্টেসি বিবিসিকে জানান, গত সপ্তাহে মানাংয়ের পাহাড়ি উঁচু পথে ভারী তুষারপাতের মুখে পড়ে তিনি ও তার গাইড আটকা পড়েন। তারা সামিটের শেষ প্রান্ত লা পাসের দিকে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
পোকরার বেস ক্যাম্পে মঙ্গলবার রাতে ফিরে এসে তিনি বলেন, “আমরা পাহাড়ের ঢলে নিজেদের মতো পথ তৈরি করে নিয়েছিলাম। পথটি বেশ চড়াই ছিল এবং নিচ দিয়ে নদী বয়ে যাওয়ায় আমাদের বেশ কষ্ট করে ওপরে উঠতে হয়েছে, চারপাশটা খুবই কাদামাটিযুক্ত ও ভেজা ছিল।”
তিনি আরো বলেন, “অনেক ট্রেকারকে হেলিকপ্টারে করে উদ্ধার করা হয়েছে।”
ভারী তুষারপাতের পর ফেরার জন্য জেক স্টেসি ও তার গাইডকে পাহাড়ে নিজেদের পথ তৈরি করে নিতে হয়েছিল
ভারী তুষারপাতের পর ফেরার জন্য জেক স্টেসি ও তার গাইডকে পাহাড়ে নিজেদের পথ তৈরি করে নিতে হয়েছিল। ছবি: স্টেসি
অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক অ্যান্ডু গ্রাহাম ও তার গাইড প্রেম কেসি জানান, মানাং গ্রাম থেকে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তাদের ১৫টির বেশি ভূমিধস পার হতে হয়েছে। গ্রাহাম বলেন, “এর মধ্যে বেশ কয়েকটি বেশ বিপজ্জনক ছিল, আর এখন তো এর ঝুঁকি আরো বেড়ে গেছে।”
গ্রাহাম জানান, তারা যখন ছামে গ্রামে পৌঁছান, তখন ভূমিধসের আশঙ্কায় গ্রামটি খালি করে দেওয়া হয়েছিল। সেখানে তারা আটকা পড়েন এবং জঙ্গলে এক রাত কাটাতে বাধ্য হন।
ছামের গ্রামের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর ওপর বিশাল ভূমিধসের কারণে আংশিক সৃষ্টি হয়েছে, যার ফলে একটি অস্থায়ী হ্রদের সৃষ্টি হয়ে ঘরবাড়ি ও সেতু তলিয়ে গেছে। স্থানীয়রা বিবিসিকে জানান, গত তিন দিন ধরে কর্তৃপক্ষ এক্সক্যাভেটর ব্যবহার করে পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা করলেও পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
এদিকে ট্রেকিং গাইড সে রিং ডোমা জানান, তাকে ও তার দলকে ২৮টি ভূমিধস পার হতে হয়েছে। তিনি বলেন, “গত মাসের ভয়াবহ বন্যার স্মৃতি এখনো টাটকা থাকায় শারীরিক কষ্টের চেয়ে মানসিক চাপ অনেক বেশি কঠিন ছিল।” তার ভাষায়, “বজ্রপাতের শব্দ হলেও আমরা আতঙ্কিত হয়ে ছুটে বেরিয়ে আসতাম, দেখতাম আমাদের দিকে কিছু ধেয়ে আসছে কি না।”
তার ক্লায়েন্ট নরওয়ের এলেন ভালস্ট্রোম বলেন, পর্যটকরা ভাগ্যবান- তারা কেবল কিছু জিনিসপত্র ফেলে আসতে পেরেছেন, অথচ স্থানীয়দের ঘরবাড়ি ও জমিটারই ঝুঁকি রয়েছে। তিনি আরো বলেন, কর্তৃপক্ষ খুব দ্রততার সঙ্গে ভূমিধসের ধ্বংসস্তুপ পরিষ্কার করে চলেছে।
নেপালে নতুন করে শুরু হওয়া প্রাকৃতিক দুযোর্গে অনেকে গৃহহীন হয়ে পড়েছেন এবং জরুরি তাঁবুতে আশ্রয় নিচ্ছেন। ছবি: রয়টার্স
নেপালে নতুন করে শুরু হওয়া প্রাকৃতিক দুযোর্গে অনেকে গৃহহীন হয়ে পড়েছেন এবং জরুরি তাঁবুতে আশ্রয় নিচ্ছেন। ছবি: রয়টার্স
প্রধান জেলা কর্মকর্তা মুক্ত প্রসাদ খানাল জানান, মানাংয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও রাস্তাঘাট বিধ্বস্ত হলেও ট্রেকিং অঞ্চলে কোনো প্রাণহানি ঘটেনি। তবে তিব্বত সীমান্তের কাছে হিমলুং পিকের পাদদেশে তুষারধসের কবলে পড়ে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং ১২ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
স্থানীয় ট্রেকিং কর্তৃপক্ষ ‘অন্নপূর্ণা কনজারভেশন এরিয়া প্রজেক্ট’-এর তথ্য অনুযায়ী, অন্নপূর্ণা ট্রেকে যাওয়ার জন্য এখনো প্রায় ৭০০ ট্রেকার পোকরায় অপেক্ষা করছেন। বাণিজ্য মহলের চাপ সত্ত্বেও পরিস্থিতি বিবেচনা করে রুটটি বন্ধ রাখা হয়েছে। এছাড়া রাস্তা বন্ধ থাকায় মুক্তিনাথ মন্দিরে তীর্থযাত্রায় যাওয়া ভারতীয় পর্যটকদের গাড়ির বদলে জোমসোম থেকে পোকরায় বিমানে যাতায়াত করতে বলা হয়েছে।
ভূমিধসে অনেক ট্রেইল পথ লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। প্রায় ৭০০ জনকে অন্নপূর্ণা সামিট শুরু করা থেকে বিরত রাখা হয়েছে
ভূমিধসে অনেক ট্রেইল পথ লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। প্রায় ৭০০ জনকে অন্নপূর্ণা সামিট শুরু করা থেকে বিরত রাখা হয়েছে। ছবি: স্টেসি
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সড়ক যোগাযোগ চালুর পর থেকে অন্নপূর্ণা সামিটের পুরোনো ট্রেকিং ট্রেইলগুলোর বেশিরভাগই অব্যাহৃত ছিল, কেবল মানাং ও মুস্তাং জেলার কিছু ছোট অংশ ছাড়া। তবে প্রধান রাস্তার কিছু অংশ ভেসে যাওয়ায় ট্রেকাররা ফিরে আসার জন্য পরিত্যক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ পথগুলোকেই ব্যবহার করছেন।
তথ্যসূত্র: বিবিসি
