

শিক্ষা প্রশাসনের কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) বর্তমানে কার্যত দিকনির্দেশনাহীন অবস্থায় রয়েছে। নতুন মহাপরিচালক (ডিজি) নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এখনও নিয়োগ না হওয়ায় শীর্ষ নেতৃত্বে তৈরি হয়েছে শূন্যতা। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ শাখাগুলোতে নিয়মিত পরিচালক না থাকায় অতিরিক্ত দায়িত্বের চাপে স্থবির হয়ে পড়েছে প্রশাসনিক কার্যক্রম। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সারাদেশের প্রায় ৪০ হাজার স্কুল ও কলেজের শিক্ষা ব্যবস্থাপনায়। এতে প্রতিদিন ভোগান্তিতে পড়ছেন লাখো শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী।
গত ৬ অক্টোবর মাউশির নতুন মহাপরিচালক নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ পদে ৬৩ জন শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা আবেদন করেন। আবেদনকারীদের মধ্যে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার চেয়ারম্যান, কলেজ অধ্যক্ষসহ প্রভাবশালী কর্মকর্তারাও ছিলেন। শিক্ষা উপদেষ্টার নেতৃত্বে গঠিত সার্চ কমিটি প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত যাচাই-বাছাইও সম্পন্ন করে। তবে সব প্রস্তুতি শেষ হলেও অজানা কারণে নিয়োগ প্রক্রিয়া থমকে যায়।
নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত থাকার নেপথ্যে অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায় থেকে আওয়ামী লীগসুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত শিক্ষা ক্যাডারের এক প্রকল্প পরিচালককে ডিজি হিসেবে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছিল। এ সংক্রান্ত ফাইল প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে পাঠানো হলেও বিভিন্ন গোয়েন্দা ও প্রশাসনিক সংস্থার
আপত্তির কারণে সেই সুপারিশ অনুমোদন পায়নি। এরপর থেকেই পুরো প্রক্রিয়া কার্যত অচল হয়ে পড়ে।
বর্তমানে ডিজিহীন অবস্থার পাশাপাশি মাউশির গুরুত্বপূর্ণ শাখাগুলো চলছে মাত্র দুজন পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্বে। একিউএইউ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন মাধ্যমিক শাখার পরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল। অন্যদিকে কলেজ ও প্রশাসন শাখার পরিচালক প্রফেসর বিএম আব্দুল হান্নান নিজ দায়িত্বের পাশাপাশি মহাপরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন।
এর ফলে প্রতিদিন জমা পড়া এমপিও সংশোধন, বদলি, পদোন্নতি, ইনক্রিমেন্ট, অবসর সুবিধা, প্রতিষ্ঠান অনুমোদনসহ শত শত ফাইল নিষ্পত্তি হচ্ছে না। মাউশি সূত্র জানায়, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের স্বাক্ষরের অভাবে অনেক ফাইল দিনের পর দিন আটকে থাকছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কুমিল্লা থেকে আসা এক কলেজ শিক্ষক বলেন, ‘এমপিও সংশোধনের জন্য গত এক মাসে তিনবার ঢাকায় এসেছি। প্রতিবারই বলা হচ্ছে পরিচালক ব্যস্ত। আমাদের মতো শিক্ষকদের পক্ষে বারবার ঢাকা এসে খরচ বহন করা অসম্ভব।’
একই ধরনের অভিযোগ করেন নীলফামারী থেকে আসা এক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী। তিনি বলেন, ‘দুই মাস আগে অবসর সুবিধার ফাইল জমা দিয়েছি। কোনো অগ্রগতি নেই। প্রতিবারই শুনতে হয়Ñ স্বাক্ষর হয়নি।’
মাউশির ভেতরেও বাড়ছে অসন্তোষ। একাধিক কর্মকর্তা জানান, নিয়মিত পরিচালক না থাকায় অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছে ফাইল নিয়ে ধরনা দিতে হচ্ছে। এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ডি-নথিতে রুটিন ও অতিরিক্ত দায়িত্ব আলাদা করে ব্যবহৃত না হওয়ায় বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে, এতে প্রশাসনিক জট আরও বাড়ছে।’
এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (কলেজ) মো. শাহজাহান মিয়া বলেন, ‘মাউশির ডিজিসহ অন্যান্য শূন্য পদে নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। নির্বাচনের আগে এসব নিয়োগ দিতে হলে নির্বাচন কমিশনের অনুমতি প্রয়োজন হয়। সে কারণে কিছুটা দেরি হচ্ছে। আমরা নির্বাচনের আগেই প্রক্রিয়া শেষ করার চেষ্টা করছি।’
শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, গত ১৫ মাসে তিনজন মহাপরিচালক পরিবর্তন নজিরবিহীন। সর্বশেষ গত ২২ অক্টোবর প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রফেসর বিএম আব্দুল হান্নানকে মহাপরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হলেও স্থায়ী নিয়োগ না হওয়ায় সংকট কাটছে না। অনিশ্চিত নেতৃত্বে মাউশির ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নিয়েও দেখা দিয়েছে গভীর উদ্বেগ।

