

কীর্তনখোলা নদীর তীরে ভোরের কুয়াশা মাখা আলোয় বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উঁচু ভবনে সূর্যের আলো পড়ে। একসময় এই নদীপাড়ের মানুষ স্বপ্ন দেখেছিল ‘দক্ষিণের অক্সফোর্ড’ গড়ার। পনেরো বছর পেরিয়ে গেলেও সেই স্বপ্ন এখনো পূর্ণতা পায়নি।
ছয়টি অনুষদের অধীনে ২৫টি বিভাগে পড়ছেন প্রায় ৯ হাজার শিক্ষার্থী।
তাঁদের পাঠদানে নিয়োজিত শিক্ষক মাত্র ২০৫ জন। গতকাল রবিবার ৭টি বিভাগে সদ্য নিয়োগ পাওয়া আরও ১০ জন প্রভাষক যোগ দিয়েছেন। ফলে এখন মোট শিক্ষক ২১৫ জন। এর মধ্যে অধ্যাপক আছেন মাত্র একজন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র অধ্যাপক ড. মুহসিন উদ্দীন জানান, বর্তমানে শিক্ষক–শিক্ষার্থী অনুপাত ১:৪২, যা আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় অনেক বেশি।
তবে আশার খবরও আছে। প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম ১৪টি বিভাগের ২৬ জন শিক্ষককে অধ্যাপক পদে পদোন্নয়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। রোববার দুই বিভাগের পদোন্নয়ন বোর্ড বসছে।
পদোন্নয়নপ্রাপ্ত সবাই পিএইচডিধারী শিক্ষক। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপকের সংখ্যা এক লাফে এক থেকে বেড়ে হবে ২৭।
২০০৯ সালে সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকের সংখ্যা ও অবকাঠামো খুব একটা বাড়েনি।
অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক না থাকায় পাঠদানের মান নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষার্থীরা।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী সোহানুর রহমান বলেন, ‘আমাদের ৩২টি কোর্স, কিন্তু গ্রন্থাগারে বই নেই বললেই চলে। এখন ভরসা অনলাইনের আর্টিকেল।’
গবেষণার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক জানান, গবেষণায় বরাদ্দ খুব সীমিত। ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু কাজ হয়, তবে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ কম।
আবাসন ও পরিবহন সংকটও প্রকট। প্রায় ৯ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ১ হাজার ২০০ জনের জন্য আবাসন আছে। বাকি শিক্ষার্থীরা থাকেন শহরের ভাড়া বাসায়। এতে খরচ বাড়ে, নিরাপত্তা কমে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বাসও মাত্র ১৮টি। ফলে প্রতিদিন নগরের বিভিন্ন স্থান থেকে গণপরিবহনেই ক্লাসে যেতে হয় শিক্ষার্থীদের।
এ ছাড়া শ্রেণিকক্ষের ঘাটতিও তীব্র। এক রুমে একাধিক বিভাগের ক্লাস পালাক্রমে হয়। গণযোগাযোগ বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘বাসের জন্য অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। ক্লাসে দেরি হয়, পথে বিড়ম্বনাও পোহাতে হয়।’
সব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে এখনো আশার সুর। গণযোগাযোগ বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা চাই বিশ্ববিদ্যালয়টা বড় হোক, বরিশালের নাম আরও উঁচুতে উঠুক। একজন অধ্যাপক থেকে ২৭-এ পৌঁছানো হয়তো সেই আশার শুরু। তবে যেখানে শিক্ষক–শিক্ষার্থী অনুপাত এখনো আন্তর্জাতিক মানের চেয়ে অনেক বেশি, সেখানে “দক্ষিণের অক্সফোর্ড” হওয়ার পথ এখনো দীর্ঘ।’

