

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ অলী উল্যাহর বিরুদ্ধেও এরই মধ্যে একাধিক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এ অবস্থায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার আলোকে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। একই সঙ্গে চলমান নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিতের নির্দেশ দিয়েছে ইউজিসি।
গত ১০ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব নাঈমা খন্দকার স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের (নিয়োগ দুর্নীতি, আর্থিক, স্বজনপ্রীতি) বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণে তদন্ত করে সুপারিশসহ মতামত দিতে ইউজিসিকে নির্দেশনা দেওয়া হয়।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চিঠির পর গত ১১ সেপ্টেম্বর ইউজিসির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ জামিনুর রহমান স্বাক্ষরিত একটি চিঠি ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বরাবর পাঠানো হয়। ওই চিঠিতে বলা হয়, দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের নানা অনিয়মের বিষয়ে তদন্ত করতে অনুরোধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে বর্তমান উপাচার্যের বিরুদ্ধে জনবল নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এ অবস্থায় সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞাপিত সব পদের নিয়োগপ্রক্রিয়া আপাতত স্থগিতের অনুরোধ করা হলো।
ইউজিসির চিঠির পর ওই দিনই ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠেয় বিভিন্ন পদের নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।
ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মো. শামছুল আলম বলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এসেছে, এর কোনো সত্যতা নেই। অভিযোগকারীর পূর্ণাঙ্গ পরিচয় ও ঠিকানা নেই। কোনো প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এসংক্রান্ত ফাইল ওঠানো হয়েছে।
আসলে আগে এখানে নিয়োগ দিয়ে একটি সিন্ডিকেট কোটি কোটি টাকা আয় করেছে। কিন্তু এখন সেটা পারছে না। এত রক্তবিপ্লবের পর আমরা কোনো অন্যায়-অনিয়ম হতে দেব না।’
গত ১১ আগস্ট ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শামছুল আলমের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগপত্র আমলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী পরিচয়ে অভিযোগটি করেন মো. আব্দুল হান্নান।
অভিযোগে বলা হয়, একটি রাজনৈতিক দল বিশ্ববিদ্যালয় দখল করে তার আদর্শিক ধারায় পরিচালিত করছে এবং অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে আগের ফ্যাসিবাদী সময়ের চেয়েও বেশি ফ্যাসিবাদীভাবে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে বিশ্ববিদ্যালয়টি পরিচালনা করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পদের জন্য গত তিন বছরে একাধিক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। সেসব বিজ্ঞপ্তির বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ না করে একটি নির্দিষ্ট দলের পদ-পদবিধারীদের কর্মকর্তা-কর্মচারী পদে নিয়োগ দেওয়ার জন্য দিন-রাত তৎপরতা চলছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন্ন নিয়োগে যাঁদের নিয়োগ দেওয়া হবে তাঁদের দলীয় ভাইবা একটি নির্দিষ্ট দলের অফিসে এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
অভিযোগে আরো বলা হয়, ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিন আগে অধ্যাপক হিসেবে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া থেকে অধ্যাপক অলী উল্যাহকে লিয়েনে আনা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অমান্য করে বিধিবহির্ভূতভাবে তাঁকে ডিন হিসেবে নিয়োগ করা হয়। তিনি ডিন হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। আর যিনি উপাচার্য হিসেবে আছেন তাঁর আগের কোনো প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা নেই। তাঁর এই দুর্বলতার সুযোগে সব কার্যক্রম করেন ও সিদ্ধান্ত নেন ডিন অধ্যাপক অলী উল্যাহ। এই সুযোগে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত মাদরাসাগুলোতে পাঠদান, নবায়ন এবং প্রতি সপ্তাহে অন্তত তিন-চারটি মাদরাসায় অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ, মুফাসসির, ফকিহ পদে নিয়োগে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে যান। তিনি যেতে না পারলে তার পছন্দের দলীয় লোকদের কমিশনের বিনিময়ে পাঠান।
এ ছাড়া অভিযোগে বলা হয়, বর্তমান নিয়োগকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে অনেক প্রার্থীর কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা অগ্রিম গ্রহণ করা হয়েছে। কোন পদে কাকে নিয়োগ দেওয়া হবে এরই মধ্যে দলীয় তালিকা ও পদ অনুযায়ী সেটি নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে কিছু কর্মচারী অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজ করলেও তাঁদের স্থায়ী না করে লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে নতুন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নতুন প্রশাসন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, যেকোনো বিষয়ে যে পক্ষ অধ্যাপক অলী উল্যাহকে বেশি খুশি করতে পারে, তিনি সেই পক্ষের অনুকূলে সিদ্ধান্ত দেন। কোন মাদরাসা পরিদর্শনে গেলে তাঁর চাহিদা অনুযায়ী উপঢৌকন ও ওই এলাকার প্রসিদ্ধ জিনিসের তালিকা অনুযায়ী তাঁকে দিতে হয়। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গাড়ি ঢাকা মেট্রো চ-৫৬-০৮২৬ নিয়মবহির্ভূতভাবে সার্বক্ষণিক ব্যবহার করেন। এমনকি তাঁর পরিবারের লোকজনও ওই গাড়িটি ব্যবহার করে।
ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমান প্রশাসনের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে অন্তত একশ মাদরাসাকে আলিম থেকে ফাজিল পর্যায়ে, ফাজিল থেকে কামিল পর্যায়ে কিংবা অনার্সের বিভিন্ন বিষয় খোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বড় ধরনের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে এই অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এমনকি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে একটি মাদরাসা থেকে আরেকটি মাদরাসার দূরত্ব এক কিলোমিটার এমন পরিস্থিতির মধ্যেও নতুন ফাজিল খোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে ভবিষ্যতে কাঙ্ক্ষিত শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে না পারা নিয়ে বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত মাদরাসার অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষসহ যেসব পদ খালি রয়েছে (এনটিআরসি এর নিয়োগ ছাড়া) সেসব মাদরাসার তথ্য দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানোর জন্য পত্র জারি করা হয়েছে; যাতে অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষসহ অন্যান্য খালি পদে নিজেদের পছন্দমতো লোক নিয়োগ করা যায়। এমনকি গভর্নিং বডিতেও পছন্দমতো লোকজনকে মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে।
সূত্র জানায়, শুধু উপাচার্য বা ডিনই নন, নিয়োগে বড় অনিয়ম করেছেন নিয়োগ কমিটির সদস্যসচিব বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো. আইউব হোসেন। সেকশন অফিসার পদে শিক্ষাগত যোগ্যতা চাওয়া হয়েছে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি বা এর সমমান। অথচ রেজিস্ট্রার তাঁর নিজের ছেলের জন্য প্রবেশপত্র ইস্যু করেছেন, যিনি মাস্টার্সে অধ্যয়নরত। আর তাঁর ছেলের এই প্রবেশপত্র নিয়ে যাতে কোনো বিতর্ক না ওঠে সে জন্য স্নাতকোত্তরে অধ্যয়নরত আরো কয়েকজন প্রার্থীর নামেও প্রবেশপত্র ইস্যু করা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ অলী উল্যাহ বলেন, ‘আমার ব্যাপারে যে অভিযোগ করা হয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। যদি এক হাজার মাদরাসার অধ্যক্ষকেও ডেকে জিজ্ঞাসা করেন, তাঁরা বলবে সেবা পাচ্ছেন, তাঁরা অত্যন্ত খুশি। আগে কিছু লোক এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আধিপত্য বিস্তার করত, তারা এখন আর সেটা করতে পারছে না। এ জন্যই তারা বেনামে অভিযোগ করছে।’
রেজিস্ট্রার মো. আইউব হোসেন বলেন, ‘আমাদের কর্মকর্তারা ভুল করে স্নাতকোত্তরে অধ্যয়নরতদের নিয়োগপত্র ইস্যু করে ফেলেছিলেন। পরে সেটা আমাদের নজরে আসার পর তা বাতিল করা হয়েছে।’

