

গৌরীপুর (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি: ময়মনসিংহের গৌরীপুরে পাকিস্তানের অরঙ্গি পাইলট প্রজেক্টের নামে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে শত শত গ্রাহকদের কোটি টাকা নিয়ে পালিয়েছে ভুয়া এনজিও কর্মকর্তারা। ১০ হাজার টাকা জমা দিলেই লাখ টাকা ঋণ দেয়ার কথা বলে 'লাখপতি অফার' দিয়ে ৫ দিনে প্রায় কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় এ চক্রটি।
রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) ঋণের জন্য অফিসে এসে অফিস তালাবদ্ধ দেখে বিক্ষুব্দ হয়ে উঠে সদস্যরা। খবর পেয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। মৎস্যচাষ, দোকানঘর নির্মাণ, ব্যবসা-বাণিজ্য, নারী উদ্যোক্তাসহ শত-শত মানুষকে কর্মসংস্থানের আশ্বাস দিয়েছিল।
এ প্রসঙ্গে গৌরীপুর থানার অফিসার ইনচার্জ মো. হাবিবুর রহমান জানান, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। ভুক্তভোগী গ্রাহকদের অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে। অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত অরঙ্গি পাইলট প্রোজেক্ট শিরোনামে বিশাল সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের গৌরীপুর উপজেলার ডৌহাখলা ইউনিয়নের কলতাপাড়ায় অফিস নিয়ে এ সংগঠনের কার্যক্রম শুরু করে। পাকিস্তানের অরঙ্গি পাইলট প্রজেক্টের লোগো ও নাম ব্যবহার করে কর্মকর্তাগণ সাধারণ মানুষের মাঝে ভিজিটিং কার্ড প্রদান করেন। এ সংস্থার ব্রাঞ্চ ম্যানেজার বুলু আহমেদ (০১৮৭৩-৬৭৬৯৪৮) ও অডিট অফিসার ঈশিতা আক্তার (০১৮৫০-৬৬৯৯১২) কে একাধিকবার কল দিলে মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়।
বাসার মালিক আলী আজম জানায়, গত রবিবার (২৯ আগস্ট) এ সংস্থার ৩/৪জন আমার নিকট থেকে ঘর ভাড়া নেয়। রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) কোম্পানির কর্মকর্তাদের সাথে ঘরভাড়ার চুক্তিপত্র হওয়ার কথা ছিলো। শুক্রবার থেকেই ওরা লাপাত্তা। পরে বিষয়টি জানিয়ে গৌরীপুর থানায় অভিযোগ দিয়েছি।
এ প্রসঙ্গে উপজেলা সমাজসেবা অফিসার মাহফুজ ইবনে আইয়ুব জানান, এ নামে কোনো সংগঠন সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিবন্ধিত নয়। কেউ প্রতারণার শিকার হলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার বা থানায় অভিযোগ দিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ভুক্তভোগী উপজেলার ২নং গৌরীপুর ইউনিয়নের বায়ড়াউড়া গ্রামের ফখর উদ্দিনের পুত্র আবুল হাসেম জানান, তার নিকট থেকে অরঙ্গি পাইলট প্রজেক্টের কর্মকর্তা ১০ হাজার টাকা নিয়েছেন। তাকে রবিবার সকালে ১ লাখ টাকা ঋণ দেয়ার কথা ছিলো। একই দিনে ঋণ দেয়ার কথা বলে বাচ্চু মিয়ার পুত্র লাকি আক্তারের নিকট থেকে ৫ হাজার টাকা, উসমান গণির স্ত্রী পপি আক্তারের নিকট থেকে ২ হাজার ৫শ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

তারাকান্দা উপজেলার বিসকা গ্রামের সবুজ মিয়া জানান, তার স্ত্রী নাজমা আক্তারকে এক লাখ টাকা ঋণ দেয়ার কথা বলে ১০ হাজার টাকা, একই গ্রামের রইছ উদ্দিনের পুত্র আল আমিনকে ২ লাখ টাকা ঋণ দেয়ার কথা বলে ২০ হাজার টাকা নিয়েছে। একই গ্রামের রোকিয়া আক্তার ও মারুফা আক্তারকে সদস্য হওয়ার জন্য প্রত্যেকের নিকট থেকে ১২শ টাকা করে হাতিয়ে নেয় এ সংস্থাটি। এ গ্রামের হাফসা আক্তার, আফজাল হোসেন ও নুর আলী প্রত্যেককে লাখপতি অফার দিয়ে ১০ হাজার টাকা সঞ্চয়ের নামে জমা নেয়। হাফসা আক্তার জানায়, রবিবার সকালে ঋণ দেয়ার কথা ছিলো। নিজের ছাগল বিক্রি করে টাকা জমা দিয়েছি। অফিসে গিয়ে দেখি এখন তালাবদ্ধ।
অপরদিকে উপজেলার ডৌহাখলা ইউনিয়নের সিংজানী চরপাড়া গ্রামের ইসলাম উদ্দিনের স্ত্রী শিল্পী আক্তারকে সদস্য করার জন্য ২শ ও এক লাখ টাকা ঋণ দেয়ার জন্য জামানত হিসাবে ১০ হাজার টাকা সঞ্চয়খাতে জমা নেয়। এ গ্রামের আর ১০ জনের নিকট থেকে সমপরিমাণ টাকা নিয়েছে। একই গ্রামের মঞ্জিল খান পাঠানের স্ত্রী ফুলবানুকে ২ লাখ টাকা ঋণ দেয়ার কথা বলে ২০ হাজার ও সদস্য ফি ২শ টাকা, খোরশেদ আলীর স্ত্রী আনোয়ারা খাতুন, সিয়ামের স্ত্রী হোসনা আক্তার, সুলতান মিয়ার স্ত্রী রিনা আক্তার, রফিকুল ইসলামের স্ত্রী রুবিনা খাতুন ও আব্দুল জব্বারের স্ত্রী রাবিয়া খাতুন প্রত্যেকের নিকট থেকে ১০ হাজার ২শ করে, শহিদ মিয়া স্ত্রী লাইলী আক্তারকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ দেয়ার নামে ৫ হাজার টাকা সঞ্চয় ও সদস্য ফিসের ২শ টাকা, সিংজানী গ্রামের রবিলা খাতুন ১০ হাজার টাকা, ইব্রাহিমের স্ত্রী শেফালী খাতুনের নিকট থেকে ৭হাজার ২শ, আলী নেওয়াজের স্ত্রী শেফালি খাতুনের নিকট থেকে ১০ হাজার টাকা, শফিকুল ইসলামের স্ত্রী রবিলা আক্তার খাতুনের ৫ হাজার টাকা, খোরশেদ আলীর স্ত্রী হালিমা খাতুন ১০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়।
উপজেলার রামগোপালপুর ইউনিয়নের ফতেহপুর গ্রামের সিরাজুল ইসলাম স্ত্রী রিনা আক্তার, এমদাদুল হক, মৃত হাফিজ উদ্দিনের স্ত্রী পেয়ারা বেগম, ফখর উদ্দিনের স্ত্রী জোসনা আরা বেগম ও বিশ্বনাথপুর গ্রামের জুবেদা খাতুনের প্রত্যেকের নিকট থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়েছে। ডৌহাখলা ইউনিয়নের চূড়ালি গ্রামের নুরুল আমিনের স্ত্রী কামরুন্নাহার, একই গ্রামের আমিনা খাতুন, দুলাল মিয়ার নিকট থেকে ১০ হাজার টাকা ও তাঁতকুড়া গ্রামের রুবেল মিয়ার ১০ হাজার টাকা, মুলাকান্দি গ্রামের হেপি আক্তারের নিকট থেকে ১৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়। একই গ্রামে মৎস্য চাষ, হাঁস-মুরগী ও গবাদিপশু চাষের জন্য ৮ জনের নিকট থেকে ১ লাখ ১২ হাজার ৮শ টাকা হাতিয়ে নিয়েয়ে এ চক্রটি।
এদিকে একাধিক সূত্রে জানা যায়, অরঙ্গি পাইলট প্রজেক্ট হলো পাকিস্তানের করাচির অরঙ্গি টাউনে অবস্থিত একটি বিখ্যাত এবং অত্যন্ত সফল কমিউনিটি-ভিত্তিক বস্তি উন্নয়ন ও স্যানিটেশন কর্মসূচি। ১৯৮০ সালে বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী এবং গ্রামীণ উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ড. আখতার হামিদ খান এই ঐতিহাসিক প্রকল্পটির সূচনা করেন। এটি মূলত সরকারি সাহায্যের ওপর নির্ভর না করে, স্থানীয় নিম্ন-আয়ের জনগোষ্ঠীর নিজস্ব অর্থায়ন ও শ্রমে কীভাবে একটি আধুনিক স্যানিটেশন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়—তার একটি অনন্য মডেল। এ সংস্থাটির নাম ও লগো ব্যবহার করেই মূলত প্রতারণা করেছে এ চক্রটি।
পাকিস্তানের অরঙ্গি পাইলট প্রজেক্টের নামে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে এ প্রতারণা করা হয়েছে বলে ভুক্তভোগীরা নিশ্চিত করেন। মানুষের স্বপ্ন ভেঙে উড়াল দিলো ভুয়া (আসল এনজিও’র নামে সাইনবোর্ড) এনজিও।
