ঢাকা
logo
প্রকাশিত : August 30, 2026

ভোরের হাটে সোনালি আঁশের ঝলক, পাটের গাঁটে কৃষকের স্বপ্ন

মাসুদ রানা, খানসামা (দিনাজপুর) প্রতিনিধি: এক হাতে পাটের গাঁট, অন্য হাতে বছরের হিসাব। ভোরের আলো ফোটার আগেই হাটের পথে বেরিয়ে পড়েন কৃষকরা। কারও কাঁধে কয়েক মাসের ঘাম, কারও ভ্যানে সাজানো সোনালি আঁশের গাঁট। সূর্য ওঠার আগেই হাটে শুরু হয় ওজন, বাছাই আর দরদাম। কয়েক ঘণ্টার এই কর্মযজ্ঞে একদিকে যেমন বদলে যায় কৃষকের ঘরে ফেরার হিসাব, অন্যদিকে জমে ওঠে কোটি টাকার বাণিজ্য।

দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার পাকেরহাটে গিয়ে দেখা যায় এমনই এক চিত্র। প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবার এমন চিত্র ফুটে উঠে। চারপাশে শুধু পাট আর পাট। হাটের এক পাশে কৃষকের অপেক্ষা, অন্য পাশে ব্যবসায়ীদের ব্যস্ততা। কোথাও শ্রমিকরা গাঁট টেনে নিয়ে যাচ্ছেন, কোথাও ডিজিটাল পাল্লায় চলছে ওজন। আবার কোথাও পাটের আঁশ হাতে নিয়ে রং ও মান যাচাই করছেন ব্যবসায়ীরা।

ভোর ৫টা থেকেই শুরু হওয়া এই হাটের ব্যস্ততা বাড়তে থাকে সময়ের সঙ্গে। কৃষকের চোখ তখন পাল্লায় ওঠা ওজনের দিকে, আর মন পড়ে থাকে ব্যবসায়ীর বলা দামের দিকে। ভালো দাম মিললেই মুখে ফুটছে স্বস্তির হাসি। কারণ এই পাট শুধু একটি কৃষিপণ্য নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পরিবারের কয়েক মাসের শ্রম, খরচ আর প্রত্যাশা।

লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি আবাদ

চলতি মৌসুমে এ উপজেলায় পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ হাজার ৬৭৫ হেক্টর জমিতে। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে এবার পাটের আবাদ হয়েছে ১ হাজার ৬৯০ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ নির্ধারিত লক্ষ্যের চেয়ে ১৫ হেক্টর বেশি জমিতে চাষ করেছেন কৃষকরা।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ মৌসুমে উপজেলায় মোট পাট উৎপাদন হয়েছে ১৯ হাজার ২৩৬ বেল। বর্তমান বাজারদর ভালো থাকায় উৎপাদিত এই পাট থেকে প্রায় ৩৫ কোটি টাকার বাণিজ্যের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

কয়েক মাসের শ্রমের মূল্য নির্ধারণ হয় কয়েক মিনিটে

আঙ্গারপাড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল লতিফও সকালে নিজের জমিতে উৎপাদিত পাট নিয়ে হাজির হন পাকেরহাটে। গাঁট নামানোর পর শ্রমিকরা পাট বাছাই করে ডিজিটাল পাল্লায় ওজন করেন। এরপর ব্যবসায়ীর সঙ্গে শুরু হয় দরদাম।

কৃষকের জন্য এ মুহূর্তটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জমি প্রস্তুত, বীজ বপন, পরিচর্যা, পাট কাটা, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো ও শুকানো—দীর্ঘ এই প্রক্রিয়ার পর কয়েক মিনিটের দরদামেই নির্ধারিত হয় তার উৎপাদনের আর্থিক মূল্য।

আব্দুল লতিফ বলেন, “এ বছর পাটের দাম ভালো পেয়েছি। পাট চাষ করে ভালো দাম পাওয়ায় আমরা কৃষকরা খুশি। পরিশ্রম ও খরচের তুলনায় ভালো দাম পেলে আগামীতে পাট চাষে আমাদের আগ্রহ আরও বাড়বে।”

মণপ্রতি ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকা

পাকেরহাটে বর্তমানে পাটের মান ও গুণগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী প্রতি মণ ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। উন্নত মানের উজ্জ্বল ও শক্ত আঁশের পাটে তুলনামূলক বেশি দাম পাওয়া যাচ্ছে।

বাজারে ভালো দাম থাকায় উৎপাদন খরচ বাদ দিয়েও লাভের আশা করছেন কৃষকরা। ফলে গত কয়েক বছরের তুলনায় এ মৌসুমে পাট চাষ নিয়ে তাদের আগ্রহও বেড়েছে।

কৃষকের পাশাপাশি ব্যস্ত ব্যবসায়ীরাও

পাটের মৌসুমে কৃষকের পাশাপাশি ব্যস্ত সময় পার করছেন ব্যবসায়ীরাও। বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা পাকেরহাটে এসে পাট সংগ্রহ করছেন। কেনার আগে তারা পাটের রং, আঁশের শক্তি, পরিপক্বতা ও গুণগত মান পরীক্ষা করে দাম নির্ধারণ করছেন।

পাট ব্যবসায়ী এন্তাজুল ইসলাম বলেন, “খানসামার পাটের মান ভালো। তাই প্রতিবছর এখানে পাট কিনতে আসি। ভালো মানের পাটের চাহিদাও রয়েছে। এ বছর বাজার ভালো থাকায় কৃষকরা যেমন ভালো দাম পাচ্ছেন, আমরাও মানসম্মত পাট কিনতে পারছি।”

পাট ঘিরে বাড়তি আয় শ্রমিকদের

হাটের এই ব্যস্ততায় বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে স্থানীয় শ্রমিকদেরও। কেউ কৃষকের কাছ থেকে পাটের গাঁট নামাচ্ছেন, কেউ পাল্লায় তুলছেন, কেউ আবার গাড়িতে বোঝাই করছেন। ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত কয়েক ঘণ্টার এই কাজই মৌসুমে তাদের বাড়তি আয়ের অন্যতম উৎস হয়ে উঠেছে।

পাকেরহাটের আশপাশের এলাকায় ব্যাপক পাট চাষ হওয়ায় মৌসুমজুড়ে এখানে নিয়মিত পাটের সরবরাহ থাকে। স্থানীয় কৃষকদের পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরাও এই হাটে এসে পাট সংগ্রহ করেন। এতে কৃষকদের দূরের বাজারে যেতে হয় না; সাশ্রয় হয় সময় ও পরিবহন খরচ।

পাটের গাঁটের সঙ্গে ঘোরে গ্রামের অর্থনীতির চাকা

পাকেরহাটের পাটের বেচাকেনা কেবল কৃষক ও ব্যবসায়ীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন পরিবহন শ্রমিক, গাঁট বাঁধার শ্রমিক, ওজনকারী, আড়তদারসহ আরও অনেকে।

অর্থাৎ কৃষকের জমিতে পাটের বীজ বোনা থেকে শুরু করে হাটে বিক্রি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই তৈরি হচ্ছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। পাটের মৌসুম তাই গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি এনে দিয়েছে।

বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী অর্থকরী ফসলগুলোর অন্যতম পাট। পরিবেশবান্ধব এই আঁশ দিয়ে ব্যাগ, দড়ি, চটসহ তৈরি হয় নানা ধরনের পণ্য। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়ানো গেলে দেশীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও এর চাহিদা আরও বাড়ার সুযোগ রয়েছে।

কৃষি বিভাগের আশাবাদ

খানসামা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ইয়াসমিন আক্তার বলেন, পাট এলাকার কৃষক ও গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি ফসল। চলতি মৌসুমে পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়া কৃষকদের মধ্যে এ ফসলের প্রতি আগ্রহের প্রমাণ। আবাদ বৃদ্ধির পাশাপাশি ফলনও ভালো হয়েছে এবং কৃষকরা বাজারে সন্তোষজনক দাম পাচ্ছেন।

তিনি বলেন, পাটের গুণগত মান ভালো রাখতে সঠিক সময়ে পাট কাটা, যথাযথভাবে জাগ দেওয়া এবং ভালোভাবে শুকানোর বিষয়ে কৃষকদের গুরুত্ব দিতে হবে। মানসম্মত পাট উৎপাদন করতে পারলে বাজারে ভালো দাম পাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ে।

কৃষি কর্মকর্তা আরও বলেন, কৃষক উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পেলে সেই ফসলের প্রতি আগ্রহ আরও বাড়ে। পাটের বাজার স্থিতিশীল থাকলে আগামীতে খানসামায় পাটের আবাদ আরও বাড়তে পারে। এতে কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও গ্রামীণ অর্থনীতিও আরও গতিশীল হবে।

শেষ বিক্রির পরও থেকে যায় আশার গল্প

সকাল গড়াতে গড়াতে পাকেরহাটের ব্যস্ততা কমে আসে। একে একে খালি হতে থাকে পাটের গাঁটে ভরা জায়গাগুলো। কেউ বিক্রির টাকা গুনে বাড়ির পথ ধরেন, কেউ আবার পরবর্তী চালানের পাট কেনার হিসাব মেলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

কিন্তু হাটের কয়েক ঘণ্টার এই দৃশ্যের আড়ালে থাকে কৃষকের কয়েক মাসের গল্প—মাটিতে বীজ বোনা থেকে সোনালি আঁশ ঘরে তোলা পর্যন্ত দীর্ঘ পরিশ্রমের গল্প।

চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে পাটের আবাদ, ভালো উৎপাদন ও সন্তোষজনক বাজারদর সেই গল্পে নতুন আশার জন্ম দিয়েছে। প্রায় ৩৫ কোটি টাকার সম্ভাব্য বাণিজ্যকে সামনে রেখে কৃষকের প্রত্যাশা এখন একটাই—বাজার যেন স্থিতিশীল থাকে, পাটের ন্যায্য দাম যেন অব্যাহত থাকে।

কারণ পাকেরহাটে প্রতিদিন যে পাটের গাঁট ওঠে-নামে, তার ভেতর শুধু সোনালি আঁশ থাকে না—থাকে একজন কৃষকের স্বপ্ন, একটি পরিবারের স্বচ্ছলতার আশা আর একটি গ্রামের অর্থনীতির চলমান গল্প।

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram