

জসিম উদ্দিন সিদ্দিকী, কক্সবাজার: টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে কক্সবাজারে পাহাড়ধসের ঝুঁকি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জেলার পাহাড়ঘেঁষা বিভিন্ন এলাকায় বসবাসরত লাখো মানুষ চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন। এরই মধ্যে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধস ও দেয়াল ধসের পৃথক ঘটনায় দুই দিনে অন্তত ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
সর্বশেষ বুধবার (৮ জুলাই) দুপুরে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৫-এর একটি মহিলা হেফজখানার ওপর দেয়াল ধসে পাঁচ ছাত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও আটজন। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে জেলা প্রশাসন উদ্ধার ও স্থানান্তর কার্যক্রম শুরু করেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা, প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বুধবার দুপুর প্রায় ২টা ১০ মিনিটে টানা বর্ষণের কারণে ক্যাম্প-৫-এর মেইন ব্লকের এ/৩ উপ-ব্লকে অবস্থিত খদিজাতুল কুবরা নুরানী মহিলা মাদ্রাসা ও হেফজখানার উপরে থাকা প্রায় ১২ ফুট উঁচু পাহাড়ের ওপর নির্মিত একটি মক্তব ও মসজিদের দেয়াল ধসে নিচের হেফজখানার একাংশের ওপর পড়ে। সে সময় হেফজখানায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন ছাত্রী কোরআন শিক্ষা গ্রহণ করছিল। আকস্মিক এ ঘটনায় বহু ছাত্রী ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে।
খবর পেয়ে ইরানী পাহাড় পুলিশ ক্যাম্পের টহল দল, অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য, স্থানীয় রোহিঙ্গা, এপিবিএন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উদ্ধারকারী দল যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। আহতদের দ্রুত বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে ক্যাম্প-৫-এর সিআইসি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে মরদেহ দাফনের অনুমতি দেন।
প্রাথমিকভাবে নিহতদের পরিচয় জানা গেছে, শাহিদা (১৩), উম্মে নেজাতুল (১৩), উম্মে সালমা (১২), ওমাইচা বিবি (১৩) ও রাশিদা (১৬)। আহত হয়েছেন আসরা (৯), বেগম জান (১৫), ফারেসা বিবি (১২), জান্নাত আরা বিবি (৮), নূর ফাতেমা (১০), নুর সেহেরা (১২), আব্দুল মোনাফ (১৭) ও নূর কায়েস (১০)। তাদের মধ্যে কয়েকজন কক্সবাজার সদর হাসপাতাল, জিকে হাসপাতাল ও ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
রোহিঙ্গা ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মিজানুর রহমান বলেন, অব্যাহত বর্ষণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে পাহাড়ধসের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ক্যাম্প-১৪-এর অধিনায়ক মোহাম্মদ সিরাজ আমীন জানান, পাহাড়ধসপ্রবণ এলাকাগুলোতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্বেচ্ছাসেবক এবং বিভিন্ন মানবিক সংস্থার সমন্বয়ে উদ্ধার ও নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
এদিকে টানা বর্ষণে কক্সবাজার শহর ও আশপাশের পাহাড়ি এলাকাতেও ধসের আশঙ্কা বেড়ে যাওয়ায় বিকেল থেকে জেলা প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার অভিযান শুরু করেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি খালি করার আহ্বান জানানো হচ্ছে এবং আশ্রয়কেন্দ্রে স্থানান্তরের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান বলেন, টানা বর্ষণের কারণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বিবেচনায় জেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন ও মানবিক সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থানরত সবাইকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানান।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুল হানান জানান, বুধবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত জেলায় ৮৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। একই সঙ্গে সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রয়েছে। তিনি বলেন, ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে কক্সবাজারের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় পাহাড়ধসের ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
