

এস এম নজরুল ইসলাম, গোপালগঞ্জ: সুনির্দিষ্ট আইন ও নীতিমালা থাকার পরেও আইনের প্রয়োগ না থাকায় গোপালগঞ্জের পাঁচ উপজেলার ৬৭টি ইউনিয়নে প্রায় পাঁচ হাজার কিলোমিটার সড়কের পাশে সড়কের গাঁ ঘেঁষে সরকারি নীতিমালা ছাড়াই অপরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়েছে পুকুর/মৎস্য খামার ও সেচনালা। এতে সড়কের পার্শ্ব-ঢাল, আড়-ঢাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বেশিরভাগ সড়কই সরু হয়ে গেছে। কোন কোন সড়কের কার্পেটিংও ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে প্রশস্থতা অর্ধেকে চলে এসেছে। এতে করে স্থানীয়রা ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করতে গিয়ে সরকারের ক্ষতি করছে কোটি কোটি টাকা। সড়কের ক্ষতির পরিমাণ প্রতিবছরই বাড়ছে, কিন্তু সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও পুকুর/ঘের মালিকদের রিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে প্রতিবছরই সরকারি অর্থায়নে মেরামত করা হচ্ছে ওই সকল ক্ষতিগ্রস্থ সড়ক। জেলার সড়কগুলি বাঁচাতে সড়কের গাঁ ঘেঁষে সরকারি নীতিমালা ছাড়াই অপরিকল্পিতভাবে পুকুর/মৎস্য খামার/ঘের তৈরিতে নিরুৎসাহিত করার জন্য জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জেলাবাসীর।
ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সমূহের আশপাশের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের মৌখিক অভিযোগের ভিত্তিতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এলজিইডির আওতাধীন উপজেলা সড়ক, ইউনিয়ন সড়ক ও গ্রামীণ সড়ক মিলে মোট ৪ হাজার ৫’শ ৭৮ কিলোমিটার সড়ক এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের ৩’শ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক, আঞ্চলিক মহাসড়ক, জেলা সড়ক ও উপজেলা সড়কের বেশিরভাগ স্থানেই সড়কের পাশে সড়কের গাঁ ঘেঁষে সরকারি নীতিমালা ছাড়াই অপরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়েছে পুকুর/মৎস্য খামার ও সেচনালা। এতে সড়কের পার্শ্ব-ঢাল, আড়-ঢাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বেশিরভাগ সড়কই সরু হয়ে গেছে। কোন কোন সড়কের কার্পেটিংও ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে প্রশস্থতা অর্ধেকে চলে এসেছে। এর ফলে জনসাধারণের চলাচলের প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি সরকারের কোটি কোটি টাকার অপচয় হচ্ছে প্রতিবছর।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের এক পরিপত্র সূত্রে জানা যায়, The Building Construction Act ১৯৫২ এর ধারা অনুসারে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়া কোন পুকুর খনন বা পুনঃখনন করা যাবেনা। যদি কেউ এমনভাবে পুকুুর বা সেচনালা ইত্যাদি খনন করেন যার ফলে ভূমির বা সড়কের বা পথের ব্যবহার বা ভোগদখলের ক্ষেত্রে কোনরূপ অসংগত অসুবিধার সৃষ্টি করে তাহলে কর্তৃপক্ষ The Building Construction Act ১৯৫২ এর ৩খ ধারার (৩) উপধারা অনুযায়ী ১৫ দিনের মধ্যে তা অপসারন, খনন বা পুনঃখনন বন্ধ বা ভরাট করার আদেশ দিতে পারেন। যদি কেউ The Building Construction Act ১৯৫২ এর ধারার বিধান লঙ্ঘন করে বা ৩ খ ধারা অনুযায়ী কর্তৃপক্ষের আদেশ পালনে ব্যর্থ হন তাহলে উক্ত আইনের ১২ ধারা অনুযায়ী আদালত দোষী ব্যক্তিকে ২ বছর পর্যন্ত কারাদন্ড বা অর্থদন্ড অথবা উভয় ধরনের দন্ডে দন্ডিত করতে পারবেন।
ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ১৯৯৬ এর বিধি ২৮ মোতাবেক নিজ ভূমির কমপক্ষে ১০ ফুট অভ্যন্তরে পুকুর বা জলাশয় সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। অর্থাৎ সরকারি রাস্তার সীমানা কিনারা হতে কমপক্ষে ১০ ফুট দুরে ৪৫ ডিগ্রি স্লোপ করে পুকুর বা জলাশয় খনন করতে হবে। দন্ডবিধি ১৮৬০ এর ধারা ৪৩১ মোতাবেক সরকারি রাস্তার ক্ষতিসাধন ফৌজদারী দন্ডনীয় অপরাধ। এই আইনে ৫ বছরের কারাদন্ড বা জরিমানা বা উভয় প্রকার দন্ডে দন্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে। সরকারি ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ভূমি ও ইমারত অধ্যাদেশ ১৯৭০ এর ধারা ৫ অনুযায়ী অবৈধভাবে দখলকৃত ভূমির উপর পুকুর, নালা বা পুকুর খনন বা পুনঃখনন করলে জেলা প্রশাসক উক্ত নালা বা পুকুর ৩০ দিনের মধ্যে অপসারনের আদেশ দিতে পারেন। জনস্বার্থের গুরুত্ব বিবেচনায় তিনি ক্ষেত্রবিশেষ ৭ দিনের মধ্যেও অপসারণের আদেশ দিতে পারেন। উক্তরূপ অবৈধ দখলের জন্য ৭ ধারা অনুযায়ী আদালত দোষী ব্যক্তিকে কারাদন্ড বা জরিমানা অথবা উভয় প্রকার দন্ডে দন্ডিত করতে পারেন। এমতাবস্থায়, গ্রামীণ সড়কের পার্শ্বে প্রচলিত আইন/বিধি-বিধানের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কোন পুকুর, কুপ, মাটি, সেচনালা খনন করা হলে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হয়েছে ওই পরিপত্রে।
মৎস্য খামারে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সমূহের পার্শ্ববর্তী স্থানীয় বাসিন্দারা জনান, সড়ক বিভাগ নতুন রাস্তা নির্মাণের সময়ে ভূমি অধিগ্রহণ করে থাকেন। সড়ক নির্মাণের পরেও সড়কের পাশে তাদের অনেক জায়গা অব্যবহৃত থেকে যায়। সেই জায়গা টুকুনও বাদ না রেখে মাছের ঘের, পুকুর তৈরি করায় পুকুরের মাছে রাস্তার পাড় ভেঙ্গে রাস্তার ক্ষতি করছে। আর প্রতিবছর ওইসব সড়ক চলাচল উপযোগী রাখতে সরকারের বাড়তি অর্থ খরচ হচ্ছে। অন্যদিকে এলজিইডি নতুন নতুন রাস্তা নির্মাণের কারণেই ওই রাস্তার পাশে স্থানীয়রা মাছ চাষের সুযোগ পাচ্ছে। তারপরও তারা রাস্তার কথা চিন্তা না করে রাস্তার গাঁ ঘেঁষে পুকুর তৈরি করে রাস্তার ক্ষতি অব্যাহত রেখেছেন। আর এ কারণে বেশিরভাগ সড়ক সমূহ ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে প্রতিবছর মেরামতের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিচ্ছে।
মাছের ঘেরের কারণেই রাস্তার ক্ষতির কথা স্বীকার করে মৎস্য খামার মালিকরা জানান, নিজের জায়গায় নিজে পুকুর কেটে মাছ চাষ করবো এতেও সুনির্দিষ্ট আইন আছে তা আমাদের জানা নেই। সড়কের মালিকানা কর্তৃপক্ষ কখনো কোন ঘের মালিককে বাধা দেওয়া বা আইন-প্রয়োগ না করায় আমরা যে যার মতো করে ব্যবসা করছি। তবে সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী দিক-নির্দেশনা দিলে আমরা সেভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
এসব বিষয় নিয়ে কথা বললে গোপালগঞ্জ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ এহসানুল হক বলেছেন, গোপালগঞ্জ জেলায় আমাদের উপজেলা সড়ক, ইউনিয়ন সড়ক ও গ্রামীণ সড়ক মিলে মোট ৪ হাজার ৫’শ ৭৮ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। প্রত্যেকটি সড়কের পাশে সড়কের ধার ঘেঁষে সরকারি নীতিমালা ছাড়াই অপরিকল্পিত ভাবে পুকুর/মৎস্য খামার ও সেচনালা তৈরি করা হয়েছে। এতে সড়কের পার্শ্ব-ঢাল, আড়-ঢাল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা ওইসব পুকুর/মৎস্য খামার ও সেচনালা মালিকদের বলবো সরকারি নিয়ম মেনে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করে তারপরে মাছ চাষ করার জন্য। তারা আমাদের নির্দেশনা না মানলে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
গোপালগঞ্জ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ জাহাঙ্গীর আলম বলেছেন, গেড়াপালগঞ্জ জেলায় আমাদের ৩’শ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক, আঞ্চলিক মহাসড়ক, জেলা সড়ক ও উপজেলা সড়কের বেশিরভাগ স্থানেই সড়কের পাশে সড়কের গাঁ ঘেঁষে সরকারি নীতিমালা ছাড়াই অপরিকল্পিত ভাবে পুকুর/মৎস্য খামার ও সেচনালা তৈরি করা হয়েছে। এতে সড়কের পার্শ্ব-ঢাল, আড়-ঢাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বেশিরভাগ সড়কই সরু হয়ে গেছে। কোন কোন সড়কের কার্পেটিংও ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে প্রশস্থতা কমে গেছে। এর ফলে জনসাধারণের চলাচলের প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি সরকারের কোটি কোটি টাকার ক্ষতিসাধন হচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোন নির্দেশনা পাইনি। নির্দেশনা পেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
জেলা প্রশাসক মোঃ আরিফ-উজ-জামান বলেছেন, দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে এলজিইডি ও সড়ক বিভাগ প্রচলিত আইন অনুযায়ী দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া বা পুকুর মালিকদের সরকারি নিয়মানুযায়ী সড়কের পার্শ্বে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করলে বাঁচবে সড়ক, বাঁচবে সরকারি অর্থ, নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পারবে জনসাধারণ এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
