

শামসুল হক ভূঁইয়া, গাজীপুর: গাজীপুর জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত ৩৫ পরিবারের মাঝে ১ কোটি ১ লাখ টাকার আর্থিক অনুদানের চেক প্রদান করেছে বিআরটিএ ট্রাস্টি বোর্ড। সোমবার জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এ চেক বিতরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
'একটি দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না'— মহাসড়কের পাশে কিংবা বাসের পেছনে ঝুলতে থাকা এই চেনা বাক্যটি আমাদের যাপিত জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এই আটপৌরে সতর্কবার্তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা ক্ষত কতটা গভীর? একটি মুহূর্তের অসাবধানতা কিংবা সামান্য একটু বেপরোয়া মনোভাব কীভাবে একটি সাজানো সংসারকে তাসের ঘরের মতো গুঁড়িয়ে দিতে পারে, তার প্রকৃত ভয়াবহতা পরিসংখ্যানের ঠান্ডা হরফে কখনো প্রকাশ পায় না। সেই নির্মম বাস্তবতার কিছু খণ্ডচিত্র সম্প্রতি উন্মোচিত হলো গাজীপুরে।
উপলক্ষটি ছিল গাজীপুর জেলা প্রশাসন ও বিআরটিএ কর্তৃক আয়োজিত বিশেষ এক অনুষ্ঠান। "জেলা সড়ক নিরাপত্তা কমিটির কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন সংক্রান্ত কর্মশালা" শেষে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারের মাঝে অনুদানের চেক বিতরণ করা হয়।
আপাতদৃষ্টিতে এটি রাষ্ট্রের একটি মানবিক উদ্যোগ, কিন্তু অনুষ্ঠানস্থলের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল স্বজনহারা মানুষের কান্নায় আর পঙ্গুত্বের আকুল আকুতিতে। টাকার অঙ্কে যে জীবনের মূল্য মাপা যায় না, তা প্রমাণ করল সেখানে উপস্থিত প্রতিটি মানুষের চোখ।
"মানসম্মত হেলমেট ও নিরাপদ গতি, কমবে জীবন ও সম্পদের ক্ষতি" এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর হাতে অনুদানের চেক তুলে দেয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে ১৬ জন নিহত ব্যক্তির পরিবারের প্রত্যেককে ৫ লাখ টাকা করে এবং একজন গুরুতর আহত ব্যক্তিকে ৩ লাখ টাকা অনুদান দেয়া হয়। এছাড়া ১৮ জন আহত ব্যক্তির প্রত্যেককে ১ লাখ টাকা করে সহায়তা প্রদান করা হয়। সব মিলিয়ে ৩৫ জন উপকারভোগীর মধ্যে মোট ১ কোটি ১ লাখ টাকার অনুদান বিতরণ করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নুরুল করিম ভূঁইয়া। এসময় উপস্থিত ছিলেন গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার এস এম আশরাফুল, গাজীপুর জেলা পুলিশ সুপার মো. শরিফ উদ্দীন, কাপাসিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ড. তামান্না তাসনিম, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সালমা খাতুন এবং বিআরটিএ গাজীপুর সার্কেলের সহকারী পরিচালক এস এম মাহফুজুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
অনুষ্ঠানে ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা বনাম এক মুহূর্তের নিয়তি: ৩০ বছর বয়সী রুনা খাতুন এসেছিলেন তাঁর দুই বছরের অবুঝ শিশুকে কোলে নিয়ে। তাঁর হাতে তুলে দেয়া হলো পাঁচ লক্ষ টাকার একটি চেক। ঠিক এক বছর আগে এক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তাঁর পেশাদার চালক স্বামী। রুনা খাতুন কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, "১৫ বছরের ড্রাইভিং অভিজ্ঞতাও উনাকে বাঁচাতে পারল না। এই টাকা দিয়ে এখন আমি কী করব? আমি তো আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদটাই হারিয়ে ফেলেছি।" রুনার এখন একমাত্র লক্ষ্য পিতৃহীন সন্তানকে কোনোমতে মানুষ করা। কিন্তু স্বামীর শূন্যতা আর এই চেকে ঢাকা পড়বে না।
নব্বই বছরের পিতার অবিনাশী শোক: বয়সের ভারে নুয়ে পড়া নব্বই ঊর্ধ্ব বৃদ্ধ তুলা শেখ। এই বয়সে যেখানে সন্তানের কাঁধে ভর দিয়ে তাঁর চলার কথা, সেখানে তিনি এসেছেন তাঁর আদরের ধনকে হারানোর পর অনুদান নিতে। এক বছর আগে এক ব্যস্ত রাস্তা পার হতে গিয়ে পিষ্ট হয়েছিল তাঁর সন্তানের প্রাণ। বৃদ্ধ বাবার কাছে এই অনুদানের অর্থ তাঁর সন্তানের স্মৃতির এক টুকরো করুণ স্মারক মাত্র। চেকটি হাতে নিয়ে কাঁপতি গলায় তিনি বললেন, "আমার যাওয়ার বয়স হয়েছিল, কিন্তু চলে গেল ছেলেটা। এমন দুর্ঘটনা যেন আর কোনো বাবার জীবনে কখনো না আসে।"
ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের এই দুঃখের কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন অনুষ্ঠানের সভাপতি গাজীপুর জেলা প্রশাসক জনাব মো: নূরুল করিম ভূঁইয়া। সভাপতির বক্তব্যে তিনি এক ভিন্নধর্মী তুলনা টেনে আনেন। তিনি বলেন, "পশ্চিমা বিশ্বে যদি একটি হরিণ বা একঝাঁক হাঁসও রাস্তা পার হয়, তবে হাইওয়ের সমস্ত গাড়ি লাইনে দাঁড়িয়ে যায়। আমাদের দেশে চালকদের এই ধৈর্যের বড্ড অভাব।"
তিনি মহাসড়কের বর্তমান বিশৃঙ্খলার কথা উল্লেখ করে বলেন, বর্তমানে কম গতির অটোরিকশা বা সাইকেলগুলো হাইওয়েতে বড় বড় দ্রুতগামী গাড়ির সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে নিজেদের বিপদ ডেকে আনছে। একটি বিজ্ঞাপনের সূত্র ধরে তিনি সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেন, "জীবনটা অনেক ছোট, কিন্তু এই জীবনের হেফাজতের দায়িত্ব আমাদের নিজেদেরই।"
