

শিব্বির আহমদ রানা, বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি: পাহাড়ের ঢালে ঢালে সবুজের অপার বিস্তার। দূর থেকে তাকালে মনে হয় প্রকৃতি যেন নিজ হাতে এঁকেছে এক বিশাল সবুজ ক্যানভাস। সেই ক্যানভাসের নাম চাঁদপুর বেলগাঁও চা বাগান। চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার পুকুরিয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ পাহাড়জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই বাগান আজ শুধু একটি চা বাগান নয়; এটি শ্রম, স্বপ্ন, ঐতিহ্য ও সাফল্যের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
সকাল গড়াতেই ব্যস্ত হয়ে ওঠেন শ্রমিকরা। কোমল চা-পাতা সংগ্রহে পাহাড়ের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েন তারা। দিনভর শ্রম আর যত্নের পর নানা প্রক্রিয়া পেরিয়ে তৈরি হয় সুগন্ধি চা। সেই চায়ের কদর এখন দেশের সর্বত্র।
দেশের ১৬৭টি চা বাগানের মধ্যে গুণগত মানের বিচারে ২০২৫ সালে জাতীয় পর্যায়ে ২০তম এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলে ৫ম স্থান অর্জন করেছে চাঁদপুর বেলগাঁও চা বাগান। বর্তমানে বাগানটির ৮৫০ একর জমিতে চায়ের আবাদ হচ্ছে, যার প্রায় ৮০ শতাংশই উন্নতমানের ক্লোন চা। ২০২৬ সালে আরও ৫০ একর জমি নতুন করে আবাদে আনার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা যায়।
শুধু উৎপাদন নয়, উন্নয়নের গল্পও সমানভাবে বিস্ময় জাগায়। ২০১৬ সালে বাগানের আবাদি জমি ছিল ৫৩৮ একর। নয় বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৫০ একরে। একই সময়ে চা উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৬ সালে যেখানে উৎপাদন হয়েছিল ২ লাখ ৭০ হাজার কেজি, সেখানে ২০২৫ সালে উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৬ হাজার ৫০০ কেজিতে। যা বাগানটির ইতিহাসে নতুন এক মাইলফলক।
প্রায় সাড়ে তিন হাজার একর এলাকা নিয়ে বিস্তৃত এই শতবর্ষী চা বাগান ২০০২ সালে ৮০ হাজার কেজি চা উৎপাদনের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে। দীর্ঘ পথচলার পর ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো চার লাখ কেজির মাইলফলক অতিক্রম করে নতুন রেকর্ড গড়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
চাঁদপুর বেলগাঁও চা বাগানের এই অগ্রযাত্রার পেছনে রয়েছে দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। ২০০৬ সালে সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে যোগদান করেন মো. আবুল বাশার। ২০১৬ সালে ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব গ্রহণের পর বাগানের আবাদি জমি ও উৎপাদন উভয় ক্ষেত্রেই আসে দৃশ্যমান পরিবর্তন।
বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের চট্টগ্রাম অঞ্চলের চেয়ারম্যান এবং বাগানটির ব্যবস্থাপক মো. আবুল বাশার বলেন, 'চলতি বছরে সাড়ে চার লাখ কেজি চা উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আমরা সেই লক্ষ্য অতিক্রম করতে পারব বলে আশা করছি।'
তার মতে, উন্নতমানের ক্লোন চা চাষের কারণেই চাঁদপুর বেলগাঁও চা বাগান দেশের অন্যতম মানসম্পন্ন চা উৎপাদনকারী বাগানে পরিণত হয়েছে। এখানকার চায়ের গুণগত মানের কারণে সারা দেশেই রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। একই সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব খাতেও রাখছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। তবে চা শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি উদ্বেগও প্রকাশ করেন। তার ভাষায়, উৎপাদন বাড়লেও সে অনুপাতে বাড়ছে না চায়ের দাম। আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির সুযোগ বাড়ানো গেলে শিল্প, শ্রমিক এবং রাষ্ট্র–সবাই উপকৃত হবে।
বর্তমানে বাগানটিতে প্রায় সাড়ে ৭০০ শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন। শ্রমিকদের জন্য রয়েছে রেশন সুবিধা, চিকিৎসাসেবা, আবাসন, বিশুদ্ধ পানীয় জল, স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং শিশুদের শিক্ষার জন্য বিদ্যালয়। ভালো মৌসুমে একজন শ্রমিক প্রতিদিন ৮০ কেজি পর্যন্ত চা-পাতা সংগ্রহ করে প্রায় ৬০০ টাকা আয় করতে পারেন।
পুকুরিয়ার উর্বর পাহাড়ি মাটি আর শ্রমিকদের নিরলস পরিশ্রমে চাঁদপুর বেলগাঁও চা বাগান আজ সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে জন্ম নেওয়া প্রতিটি চা-পাতা যেন বহন করে উন্নয়ন, সম্ভাবনা ও মানুষের জীবনসংগ্রামের গল্প। আর সেই গল্পই প্রতিদিন নতুন করে সুবাস ছড়ায় দেশের চায়ের কাপে কাপে।
