

রাঙামাটির পর্যটন শিল্পের বিকাশ এবং স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি নিরসনে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য ও পর্যটন করপোরেশনের আহ্বায়ক মো. হাবীব আজম। ২০২৪ সালের ১০ নভেম্বর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে অদ্যাবধি ১৮ মাসে তাঁর নেওয়া পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক উন্নয়ন প্রকল্পগুলো স্থানীয় অর্থনীতি ও পর্যটন খাতে এক যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। অবহেলিত পর্যটন স্পটগুলোর আধুনিকায়ন, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাকে তিনি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
ঝুলন্ত সেতুতে আধুনিকতার ছোঁয়া: অবসান হলো দীর্ঘদিনের ভোগান্তির
রাঙামাটির প্রধান আকর্ষণ ও 'সিম্বল অব আইকন' খ্যাত ঝুলন্ত সেতু দেখতে প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক আসেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সেতু এলাকার অবকাঠামোগত কোনো উন্নয়ন হয়নি। এবার হাবীব আজমের উদ্যোগে ঝুলন্ত সেতুর প্রবেশমুখের অপর প্রান্তে দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে ও সিঁড়ি নির্মাণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ উইমেন চেম্বারের রাঙামাটি জেলা সভাপতি ও স্থানীয় উদ্যোক্তা মনোয়ারা বেগম এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, "আগে এখানে মাটির রাস্তা থাকায় হাঁটার সময় অনেক নারী ও শিশু পড়ে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হতো। এখন দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে হওয়ায় পর্যটকরা অত্যন্ত নিরাপদে ও স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুরে বেড়াতে পারছেন। বিগত সময়ে কেউ এভাবে পর্যটনের উন্নয়নে এগিয়ে আসেনি।"
এর পাশাপাশি ঝুলন্ত সেতু এলাকায় পর্যটকদের দীর্ঘদিনের বড় একটি সমস্যা ছিল আধুনিক ওয়াশরুমের সংকট। পর্যটকদের সেই চরম বিড়ম্বনা ও অভিযোগের কথা মাথায় রেখে সেখানে একটি অত্যাধুনিক মানের ওয়াশরুম নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পর্যটকরা গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রথম আন্তর্জাতিক মানের 'ভিউ টাওয়ার'
রাঙামাটি শহরের প্রবেশমুখ পাসপোর্ট অফিস সংলগ্ন শিমুলতলী এলাকায় পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্যে প্রথমবারের মতো নির্মাণ করা হয়েছে একটি আন্তর্জাতিক মানের ভিউ টাওয়ার। সেখান থেকে কাপ্তাই লেক ও আশপাশের পাহাড়ি প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করা যায়, যা ইতোমধ্যে পর্যটকদের নতুন আকর্ষণ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
শিমুলতলী এলাকার বাসিন্দা মেহেদী হাসান জানান, "ভিউ টাওয়ারটি চালু হওয়ার আগেই এটি নিয়ে মানুষের আগ্রহ আকাশচুম্বী। এর কাজ পুরোপুরি শেষ হলে এই অঞ্চলে পর্যটকদের ঢল নামবে। ফলে শিমুলতলীসহ আশেপাশের এলাকার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক অবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন ঘটবে।"
সাজেক ভ্যালির উন্নয়ন ও লাইসেন্সিংয়ের মাধ্যমে শৃঙ্খলা
দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র সাজেক ভ্যালির পর্যটন শিল্পে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের লাইসেন্সিং কার্যক্রম একটি বড় মাইলফলক। জেলা পরিষদের সদস্য হাবীব আজমের বিশেষ উদ্যোগে সাজেকের হোটেল, রিসোর্টসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য লাইসেন্স প্রদানের নিয়ম চালু করা হয়েছে।
বাঘাইছড়ির স্থানীয় বাসিন্দা ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আলমগীর হোসেন এই সময়োপযোগী পদক্ষেপের প্রশংসা করে বলেন, "এই উদ্যোগের কারণে সাজেকের সমস্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এখন একটি সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি ও শৃঙ্খলার মধ্যে এসেছে, যা সামগ্রিক পর্যটন খাতে এক কাঠামোগত পরিবর্তন এনেছে।"
এছাড়াও সাজেক ভ্যালিতে নতুন পার্কিং সুবিধা, সুরক্ষা দেয়াল (গার্ড ওয়াল) এবং রাস্তা নির্মাণের ফলে দুর্গম পথ অনেকটাই সহজ হয়েছে। এর ফলে পরিবার ও বয়স্ক পর্যটকরাও এখন নিরাপদে ভ্রমণ করতে পারছেন।
রাঙামাটি জেলা পরিষদের ইতিহাসে প্রথম: 'ট্যুর গাইড এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট' প্রশিক্ষণ
হাবীব আজমের সময়কার পর্যটন শিল্প বিকাশে সবচেয়ে দূরদর্শী উদ্যোগটি হলো রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ২০২৫ সালের ২১ আগস্ট মাসব্যাপী “ট্যুর গাইড এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট” প্রশিক্ষণ কোর্সের প্রবর্তন। আধুনিক ও মানসম্মত পর্যটন শিল্পের বিকাশে এই উদ্যোগকে সর্বমহল সাধুবাদ জানিয়েছে।
এসোসিয়েশন অব হিল ট্যুরিস্ট গাইড রাঙামাটির সাধারণ সম্পাদক মো. তাজুল ইসলাম তাজ বলেন, "হাবীব আজম দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে পর্যটন শিল্পকে কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায় তা নিয়ে সবসময় ভাবেন। তিনি প্রায়শই স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে সাথে নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।"
রাঙামাটির সুপরিচিত স্বেচ্ছাসেবী ও সামাজিক সংগঠন "হিল সার্ভিস"-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদক মাসুদ রানা রুবেল বলেন, "দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকরা স্পটগুলোতে যাতায়াত নিয়ে প্রায়ই বিপাকে পড়তেন। জেলা পরিষদের সহযোগিতায় যে ট্যুর গাইড প্রশিক্ষণটি হয়েছে, তার ফলে এখন ঘুরতে আসা পর্যটকরা অনেক স্বস্তি পাবেন।"
ফিশারিঘাটে যাত্রী ছাউনি ও স্যানিটেশন সুবিধা
শুধু মূল পর্যটন স্পটই নয়, দূরপাল্লার যাত্রী ও নৌপথের যাতায়াত সহজ করতেও বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। শহরের ফিশারিঘাট এলাকায় নির্মাণ করা হয়েছে আধুনিক যাত্রী ছাউনি কাম ওয়াশরুম। এই ঘাটটি মূলত লংগদু ও বাঘাইছড়ি উপজেলায় যাতায়াতের প্রধান স্পিডবোট ঘাট।
লংগদু উপজেলার বাসিন্দা মনির হোসেন জানান, "এখানে যাত্রী ছাউনি ও ওয়াশরুম হওয়ায় লংগদু ও বাঘাইছড়ির সাধারণ বাসিন্দারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারছেন। একই সাথে এই এলাকায় আসা পর্যটকদেরও ওয়াশরুম সংকটের বিড়ম্বনা দূর হলো।"
সার্বিক উন্নয়ন প্রসঙ্গে মো. হাবীব আজম বলেন, "পরিকল্পিত উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও পর্যটকবান্ধব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রাঙামাটিকে আরও আকর্ষণীয় ও সম্ভাবনাময় পর্যটন গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।" স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের মতে—তার এই দূরদর্শী নেতৃত্ব আগামী দিনে পার্বত্য অঞ্চলের অর্থনীতি ও পর্যটন শিল্পের বিকাশে এক বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।
