ঢাকা
২১শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
বিকাল ৪:০৩
logo
প্রকাশিত : মে ২১, ২০২৬

অন্য বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে এসএসসির ইংরেজি খাতা মূল্যায়ন

ইমরান হাই সরকার। সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার বুরুঙ্গা ইকবাল আহমদ হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ের প্রভাষক। অথচ তিনি সিলেট শিক্ষাবোর্ডের এসএসসি পরীক্ষার ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের প্রধান পরীক্ষক।

একইভাবে সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার ঝিগলী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ের প্রভাষক সেবুল আহমদও এবারের এসএসসি পরীক্ষার ইংরেজি বিষয়ের খাতা মূল্যায়ন করছেন। শুধু পরীক্ষকই নন, তিনিও প্রধান পরীক্ষকের দায়িত্বে রয়েছেন।

ইমরান হাই সরকার ও সেবুল আহমদের মতো আরো কয়েকজন শিক্ষক এবার ইংরেজি বিষয়ের উত্তরপত্র মূল্যায়নের দায়িত্ব পালন করছেন, যাদের মূল বিষয় ইংরেজি নয়। তাদের কেউ সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষক, কেউ ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতির, আবার কেউ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ের শিক্ষক।

গত ৪ মে সিলেট শিক্ষাবোর্ডের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এসএসসি ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষকের তালিকা পর্যালোচনায় এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক ছাড়া অন্যদের দিয়ে ইংরেজির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের খাতা মূল্যায়ন করানো হলে শিক্ষার্থীদের ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ফলে মূল্যায়নের মান ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।

শিক্ষাবোর্ডের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের ১৯১ জন পরীক্ষকের তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, তাদের মধ্যে কয়েকজনের মূল বিষয় ইংরেজি নয়। কেউ ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রভাষক, কেউ সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষক, আবার কেউ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ের শিক্ষক। তাদের মধ্য থেকেই কয়েকজনকে প্রধান পরীক্ষকের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, ইংরেজির মতো ভাষাভিত্তিক বিষয়ে উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাকরণ, ভাষার ব্যবহার, রচনাশৈলী ও সৃজনশীল উত্তর বিশ্লেষণের জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিক্ষক হওয়া প্রয়োজন। অন্য বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে খাতা মূল্যায়ন করালে নম্বর প্রদানে অসামঞ্জস্য দেখা দিতে পারে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক শিক্ষক জানান, পরীক্ষক সংকট কিংবা প্রশাসনিক সুবিধার কারণে অনেক সময় এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে, দীর্ঘমেয়াদে এটি শিক্ষাব্যবস্থার জন্য নেতিবাচক বার্তা বহন করে। বিশেষ করে ইংরেজির মতো বিষয়ে অদক্ষ মূল্যায়ন শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধা যাচাইয়ে প্রভাব ফেলতে পারে।

জাউয়া বাজার ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক দুলাল মিয়া বলেন, ‍“ইংরেজি বিষয়ের খাতা অন্য বিষয়ের শিক্ষকের দেখার কোনো সুযোগ নেই। এভাবে খাতা মূল্যায়ন করলে তা সঠিক হবে না। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিক্ষকই কেবল সেই বিষয়ের খাতা মূল্যায়ন করতে পারবেন।”

তিনি বলেন, “বিধিমালায় সুযোগ না থাকলেও নানা প্রভাব, ব্যক্তিগত যোগাযোগ কিংবা প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অনেক শিক্ষক পরীক্ষকের তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করে নেন।”

পরীক্ষকের তালিকায় দ্বিতীয় নম্বরে রয়েছেন ওসমানীনগরের বুরুঙ্গা ইকবাল আহমদ উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের প্রভাষক ইমরান হাই জাবেদ। তিনি মূলত ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ের শিক্ষক। অথচ তিনি ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের প্রধান পরীক্ষক।

বিয়ানীবাজারের বানিগ্রাম বাহারগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞানের সহকারী শিক্ষক মো. তাজিম উদ্দিনও এসএসসির ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একই তালিকায় রয়েছেন সুনামগঞ্জের দিরাই উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক রোকসান আরা খাতুন, যিনি সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক হলেও প্রধান পরীক্ষকের দায়িত্ব পেয়েছেন। এছাড়া মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার কামুদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞানের সহকারী শিক্ষক নিরঞ্জন কৈরীও ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের খাতা মূল্যায়ন করছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বানিগ্রাম বাহারগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. তাজিম উদ্দিন জানান, বর্তমানে তিনি বিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। যোগদানের পর থেকেই সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ে পাঠদান করছেন। তবে, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ইংরেজিতে পারদর্শী প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ ছিল।

তিনি জানান, বিদ্যালয়ে যোগদানের সময় ইংরেজি বিষয়ের কোনো শিক্ষক না থাকায় শুরু থেকেই সামাজিক বিজ্ঞানের পাশাপাশি ইংরেজিও পড়িয়ে আসছেন। দীর্ঘদিনের সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষক হিসেবে মনোনীত হয়েছেন।

ওসমানীনগরের বুরুঙ্গা ইকবাল আহমদ উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের প্রভাষক ইমরান হাই জাবেদ জানান, কলেজে তিনি ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে পাঠদান করলেও মাধ্যমিকে ইংরেজি শিক্ষক না থাকায় শুরু থেকেই ইংরেজি ক্লাসও নিতে হচ্ছে। এ কারণে বোর্ড থেকে অভিজ্ঞ শিক্ষকদের তালিকা চাওয়া হলে সেখানে তার নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরে তিনি ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের খাতা মূল্যায়নের দায়িত্ব পান।

কামুদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিরঞ্জন কৈরী জানান, তিনি সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষক। শিক্ষক সংকটের কারণে ইংরেজি ক্লাসও নিয়মিত নিতে হয় তাকে। নিয়োগের পর থেকেই এ দায়িত্ব পালন করে আসছেন। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে বোর্ড তাকে এ দায়িত্ব দিয়েছে।

সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ পরিমল কান্তি দে বলেন, “সামাজিক বিজ্ঞান বা ইসলামের ইতিহাসের শিক্ষক কীভাবে ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের উত্তরপত্র মূল্যায়ন করবেন, সেটিই বড় প্রশ্ন। এতে মূল্যায়নের গ্রহণযোগ্যতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।”

তার মতে, সংশ্লিষ্ট বিষয়ের দক্ষ শিক্ষকদের মাধ্যমেই খাতা মূল্যায়ন হওয়া উচিত। প্রতিবছর ফল বিপর্যয়ের পেছনে এ ধরনের অনিয়মও দায়ী বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে শিক্ষাখাতে কঠোর নজরদারির আহ্বান জানান।

মদন মোহন কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও শিক্ষাবিদ ডক্টর আবুল ফতেহ ফাত্তাহ বলেন, “বোর্ড নির্ধারিত বিষয়ের বাইরে অন্য বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে খাতা মূল্যায়ন করানো বিধিমালার পরিপন্থি। এতে সঠিকভাবে মূল্যায়ন হওয়ার সুযোগ কমে যায়।”

তিনি বলেন, “কোনো শিক্ষক যদি নিজের বিষয়ের বাইরে অন্য বিষয়ে দক্ষ হয়ে থাকেন, তাহলে তার পক্ষে উপযুক্ত কাগজপত্র ও প্রমাণ থাকা প্রয়োজন। শুধুমাত্র মৌখিক দাবির ভিত্তিতে এ ধরনের দায়িত্ব দেওয়া হলে তা নিয়ম লঙ্ঘনের শামিল হবে।”

এ বিষয়ে সিলেট শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর বিলকিস ইয়াছমীন বলেন, “বিষয়টি ইতোমধ্যে বোর্ডের নজরে এসেছে। কয়েকজন পরীক্ষকের কাছ থেকে উত্তরপত্র ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। নতুন করে যাদের কাছে খাতা মূল্যায়নের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে, তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি কঠোরভাবে যাচাই করা হচ্ছে।”

তিনি বলেন, “সিলেট শিক্ষাবোর্ডের ইতিহাসে এবার প্রথমবারের মতো ইলেকট্রনিক টিচার ইনফরমেশন ফরম (ইটিআইএফ) চালু করা হয়েছে। পরীক্ষকরা অনলাইনে আবেদন করেছেন এবং সেই আবেদন যাচাই-বাছাই করে অনুমোদন দিয়েছেন প্রতিষ্ঠান প্রধানরা। তবে, কিছু ক্ষেত্রে এক বিষয়ের শিক্ষককে অন্য বিষয়ের খাতা মূল্যায়নের অনুমোদন দেওয়ায় এ জটিলতা তৈরি হয়েছে।”

প্রফেসর বিলকিস ইয়াছমীন বলেন, “যেসব প্রতিষ্ঠান প্রধান এ ধরনের অনুমোদন দিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে নোটিশ দেওয়া হবে। ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনা আর না ঘটে, সেজন্য পরীক্ষা শাখার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram