

দোয়ারাবাজার (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি: মাথার ঘাম পায়ে ফেলে মরুভূমির তপ্ত বালুতে কাটিয়েছিলেন দীর্ঘ তিনটি বছর। উদ্দেশ্য ছিল একটাই—সংসারে স্বচ্ছলতা আনা আর মাথা গোঁজার একটি নিরাপদ ঠাঁই। কিন্তু প্রবাস ফেরত রোকসানা বেগমের সেই স্বপ্ন এখন ধূলিসাৎ। যে স্বামীর হাতে জীবনের নিরাপত্তা চেয়েছিলেন, সেই স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকেরাই কেড়ে নিয়েছে তার হাড়ভাঙা খাটুনির অর্জিত সম্পদ। বর্তমানে ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা এই নারী নিজের অধিকার ফিরে পেতে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।
মঙ্গলবার বিকেলে দোয়ারাবাজার উপজেলা প্রেসক্লাবে উপস্থিত হয়ে সাংবাদিকদের কাছে নিজের ওপর হওয়া অমানবিক নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন রোকসানা।
পারিবারিক ও মামলা সূত্রে জানা যায়, রোকসানা বেগম দীর্ঘ ৩ বছর সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন। প্রবাসে থাকা অবস্থায় উপার্জিত টাকা দিয়ে তিনি ৪টি গরু ও ২টি ভেড়া ক্রয় করেন। ২০২৪ সালে দেশে ফিরে দোয়ারাবাজার উপজেলার পান্ডারগাঁও ইউনিয়নের হরিপদনগর গ্রামের সাইজুল হকের সাথে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর স্বামীর সুখের কথা চিন্তা করে বাবার বাড়িতে থাকা গবাদিপশুগুলো তিনি স্বামীর ঘরে নিয়ে আসেন।
অভিযোগ উঠেছে, বিয়ের কিছু দিন পরই রোকসানার জমানো সম্পদের ওপর নজর পড়ে স্বামী সাইজুল হকের। গরুগুলো বিক্রি করে বাথরুম তৈরির প্রস্তাব দিলে রোকসানা তাতে অসম্মতি জানান। এতেই শুরু হয় অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। গত ২৬ মার্চ রোকসানার অমতে জোরপূর্বক ৪টি গরু, ২টি ভেড়া এবং ৩ কাটা ধান্য বিক্রি করে দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, তার কানের স্বর্ণালঙ্কার বন্ধক রেখে এবং হাওলাত নিয়ে মোট ৩ লক্ষ ১৩ হাজার টাকার সম্পদ ও নগদ অর্থ আসামিরা আত্মসাৎ করেন।
রোকসানা বেগম জানান, গত ১২ ডিসেম্বর তিনি তার পাওনা টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার ফেরত চাইলে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে বেধম মারধর করে। এক পর্যায়ে ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় কোনো অর্থ বা অলঙ্কার ছাড়াই তাকে এক কাপড়ে ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়।
রোকসানার বাবা আলাউদ্দিন বর্তমানে ক্যান্সারে আক্রান্ত। কোনো ভাই না থাকায় এবং বাবার শারীরিক ও আর্থিক দুরবস্থার কারণে সেখানেও ঠাঁই হয়নি তার। বর্তমানে তিনি সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার মিরেরচর গ্রামে বোনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।
নিরুপায় হয়ে রোকসানা বেগম সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার আমল গ্রহণকারী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেছেন। আদালত আসামীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করলেও ভুক্তভোগী রোকসানার দাবি—এখনও তিনি তার প্রাপ্য সম্পদ বা নিরাপত্তা ফিরে পাননি।
সংবাদ সম্মেলনে রোকসানা বেগম কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে বলেন, 'প্রবাসে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে যে সম্পদ গড়েছিলাম, তা এভাবে আপনজনদের হাতে লুণ্ঠিত হবে—এমনটা কল্পনাও করিনি। আমি কেবল ন্যায়বিচার চাই এবং স্বামীর ঘরে ফিরতে চাই ও আমার অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে চাই।'
এখন আদালত এবং প্রশাসনের হস্তক্ষেপই এই নিঃস্ব নারীর শেষ ভরসা।

