

মো. নজরুল ইসলাম, অষ্টগ্রাম (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি: 'মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করে আমার ছেলেটা বেঁচে গিয়েছে' কান্না জড়িত কন্ঠে এই প্রতিবেদকের সাথে কথাগুলো বলেন ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে ভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যাওয়া কিশোরগঞ্জের আব্দুল কাদিরের মা আম্বিয়া খাতুন।
দুবাই থেকে অবৈধভাবে গ্রিসে যাওয়ার সময় ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। তবে ভাগ্যক্রমে ভয়ংকর এই নৌকাযাত্রা থেকে প্রাণে বেঁচে গেছেন কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলা অষ্টগ্রামের সাভিয়াগরের বাসিন্দা আবুল হোসেনের পুত্র আব্দুল কাদির (৩২)।
পরিবারের সদস্যরা জানান, দুই বছর আগে ইতালিতে যান আব্দুল কাদিরের বড় ভাই আকাইদ। বড় ভাইয়ের মতো তিনিও ইতালিতে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। তারপর ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর দুবাই হয়ে লিবিয়ায় পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। সমুদ্রপথে ইউরোপ যাওয়ার সময় একটানা ছয়দিন সাগরে একটি রাবার বোটে ভেসেছিলেন আব্দুল কাদির। তারপর তিনি গ্রিসে পৌঁছান।
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইতালি যেতে গ্রামের এক দালালের সঙ্গে ২২ লাখ টাকা চুক্তি করেন। এর মধ্যে তার পরিবার ১২ লাখ টাকা শোধ করেছে। ইতালি পৌঁছাতে পারলে বাকি টাকা পরিশোধ করার কথা ছিল। শেষমেশ টানা ছয়দিন সাগর যাত্রার একপর্যায়ে গ্রিসের উপকূলে পৌঁছান কাদির। এসময় নৌকাডুবিতে ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু হলেও অলৌকিকভাবে বেঁচে যান তিনি।
আব্দুল কাদিরের মা আম্বিয়া খাতুন বলেন, বড় নৌকায় যাওয়ার কথা থাকলেও দালালেরা তাকে ছোট রাবারের নৌকায় সাগর পারি দিতে বাধ্য করে। পথে অনেক মানুষ মারা গেছে। কিন্তু আল্লাহ নিজের হাতে আমার ছেলেকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। তার ছেলে এখন ভাল আছেন বলেও জানান তিনি।
তার মা আরও বলেন, ‘ঈদুল ফিতরের দুই সপ্তাহ আগে কাদিরকে লিবিয়ার একটি মরুভূমিতে নিয়ে যান তুষার নামের এক দালাল। এর আগে কাদিরের ফোন কেড়ে নেওয়া হয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘অন্যের মোবাইলে মাঝেমাঝে ছেলের সঙ্গে কথা হতো। এক সময় শুনলাম রাবারের নৌকা দিয়ে তারা গ্রিসের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে।’
‘পরে টেলিভিশনে অনেকের মৃত্যুর খবর শুনে ভাবলাম হয়তো আমার ছেলে আর নেই। দুর্ঘটনার দুদিন পর কাদির আমাকে ফোন করে বলে, সে না খেতে পেয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে। আমার ছেলে কান্না করতে করতে বলছে, মৃত্যু কত ভয়ংকর তা সে নিজ চোক্ষে দেখে এসেছে। খাবারের অভাবে ওর সাথে থাকা সব মানুষ মারা গেছে।’ তিনি বলেন, এ ঘটনার পর থেকে দালাল আত্মগোপনে আছেন। তাকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছেনা।
জানতে চাইলে দেওঘর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আক্তার হোসেন বলেন, আমি কাদিরের বাড়িতে গিয়ে তার পরিবারকে শান্তনা দিয়ে এসেছি। তিনি তার পরিবারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
অষ্টগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সিলভিয়া স্নিগ্ধা বলেন, তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো আমাদের কাছে কেউ আসেনি। তবে আব্দুল কাদিরের বাড়িতে স্থানীয় চেয়ারম্যানের মাধ্যমে খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে। আমাদের কাছে আসলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার পরিবারকে সব রকমের সহযোগিতা দেওয়া হবে।
