

জুয়েল রানা, তিতাস (কুমিল্লা) প্রতিনিধি: হলুদ সূর্যের ঝিলিকে নিজেকে রাঙিয়ে তুলছেন দর্শনার্থীরা। বসন্তের শুরুর মৃদু উষ্ণতায় যখন প্রকৃতি নতুন রঙে সেজে উঠেছে, ঠিক তখনই বিস্তীর্ণ জমিজুড়ে ফুটে ওঠা সূর্যমুখীর হলুদ সমারোহ তৈরি করেছে এক অপার্থিব দৃশ্য।
কুমিল্লার তিতাস উপজেলার ভিটিকান্দি ইউনিয়নের দাসকান্দি গ্রাম সংলগ্ন গোমতী বেড়িবাঁধ এলাকায় এক একর জমিতে গড়ে ওঠা সূর্যমুখীর ক্ষেত এখন স্থানীয়দের কাছে যেমন বিস্ময়ের, তেমনি দূর-দূরান্তের মানুষের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। সাধারণত শান্ত ও নিরিবিলি এই গ্রামটি গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যেন রূপ নিয়েছে এক ক্ষুদ্র পর্যটনকেন্দ্রে।
সোমবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নানা বয়সী নারী-পুরুষ, কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণীদের ভিড়। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন, আবার কেউ পরিবার নিয়ে কাটাচ্ছেন আনন্দঘন সময়। ফসলি জমির আইল ধরে পরিপাটি পোশাকে অনেকেই প্রবেশ করছেন সূর্যমুখীর সোনালি আবরণে মোড়া সেই ক্ষেতে।
জমিটি চারদিকে জাল দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। প্রবেশের জন্য রাখা হয়েছে দুটি পথ। মাঝখানে উঁচু করে তৈরি করা হয়েছে একটি মাচা, যেখান থেকে কেয়ারটেকার সার্বক্ষণিক নজরদারি করছেন। হ্যান্ডমাইকে নিয়মিতভাবে দর্শনার্থীদের ফুল না ছেঁড়ার এবং দশ মিনিটের বেশি অবস্থান না করার অনুরোধ জানানো হচ্ছে।
স্থানীয় এক দর্শনার্থী বলেন, “উপজেলায় ঘুরে বেড়ানোর মতো তেমন কোনো জায়গা নেই। তাই এই সূর্যমুখীর বাগান আমাদের কাছে এক টুকরো স্বস্তির জায়গা হয়ে উঠেছে।”
শিশু সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে আসা জসিম বলেন, “এলাকায় বিনোদনের কোনো ব্যবস্থা নেই। জায়গাটা অনেক সুন্দর, তাই স্ত্রীকে নিয়ে ছবি তুলতে এসেছি। অনেক ভালো লেগেছে।”
টিকটকার নাছরিন আক্তার জানান, “এখানে এসে ছবি তুলেছি এবং কয়েকটি ভিডিও বানিয়েছি।”
মো. রুবেল রানা বলেন, “অত্র এলাকায় মানুষের সময় কাটানোর স্থান নেই। সূর্যমুখীর বাগানে এলে মনটা ভালো হয়ে যায়, তাই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এসেছি।”
শিশু শিক্ষার্থী মাইশা বলে, “খুব সুন্দর একটি দৃশ্য। সবাই এসেছে, তাই আমিও বান্ধবীকে নিয়ে ছবি তুলতে এসেছি।”
দেড় বছরের সন্তানকে নিয়ে আসা ফারজানা আক্তার বলেন, “সুন্দর একটি জায়গা, তাই ছেলেকে নিয়ে একটু ঘুরতে আসলাম। অনেক ভালো লেগেছে।”
তবে দর্শনার্থীদের অসচেতন আচরণে কিছুটা ক্ষতির মুখেও পড়ছে ক্ষেতটি। জমির দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা মো. মামুন জানান, অনেকেই ছবি ও ভিডিও করতে এসে লুকিয়ে ফুল নিয়ে যাচ্ছেন। গত পনের দিনে প্রায় অর্ধশতাধিক গাছ নষ্ট হয়েছে। বারবার সতর্ক করা হলেও অনেকে কর্ণপাত করছেন না। দীর্ঘ সময় অবস্থান ও জটলা সৃষ্টি হওয়ায় ফুলেরও ক্ষতি হচ্ছে।
সূর্যমুখী ক্ষেতের মালিক ব্যবসায়ী মো. জাহাঙ্গীর আলম সরকার বলেন, ছোটবেলা থেকেই ফুলের বাগানের প্রতি তার আগ্রহ ছিল। ব্যস্ততার কারণে তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি ইউটিউবে একটি প্রতিবেদন দেখে তিনি পরীক্ষামূলকভাবে সূর্যমুখীর চাষ শুরু করেন। প্রত্যাশার চেয়েও ভালো ফলন এসেছে। “এলাকার মানুষ এখানে এসে কিছুটা বিনোদন পাচ্ছে—এটাই আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ,” বলেন তিনি। দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে একাধিক লোক নিয়োগ ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
কদমতলী ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, দাসকান্দিতে বপন করা সূর্যমুখী বীজটি হাইব্রিড জাতের। জাতভেদে ৮৫ থেকে ১০০ দিনের মধ্যে এটি পরিপক্ব হয়। বর্তমানে ফুলের পরিপূর্ণতার ভিত্তিতে কাঙ্ক্ষিত ফলনের আশা করা যাচ্ছে।
উপজেলা কৃষি অফিসার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, কদমতলী ব্লকে প্রায় একশ’ শতক জমিতে সূর্যমুখীর চাষ হয়েছে। তেলের জন্য যেমন সূর্যমুখীর উপকারিতা রয়েছে, তেমনি এটি মানুষের মনে আনন্দও জোগায়। কৃষক নিজ উদ্যোগে বীজ সংগ্রহ করলেও উপজেলা কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে সার্বিক কারিগরি সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে।

