

মাসুদ রানা, খানসামা (দিনাজপুর) প্রতিনিধি: শীতকালের ভোরের নরম রোদে দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার বাশুলী গ্রামের মাঠ তখন সবুজে মোড়া। দূর থেকে দেখলেই চোখে পড়ে সারি সারি মাচা, আর তার গায়ে ঝুলে থাকা চকচকে সবুজ লাউ। এই লাউ শুধু সবজি নয়—এ যেন একজন কৃষকের স্বপ্ন, পরিশ্রম আর সাফল্যের গল্প। এই গল্পের নায়ক কৃষক আমিনুল ইসলাম।
কয়েক মাস আগেও আমিনুল ইসলামের জমি ছিল আর দশজন কৃষকের মতোই। কিন্তু কৃষি অফিসের পরামর্শে তিনি ভিন্ন কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন। বেছে নেন সুপার গ্রিন জাতের লাউ—উচ্চ ফলনশীল, দেখতে সুন্দর আর বাজারে চাহিদাসম্পন্ন এক সবজি। আধুনিক ও জৈব পদ্ধতিতে চাষ শুরু করেন তিনি।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, দিনাজপুর অঞ্চলে টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প (১ম সংশোধিত)-এর আওতায় জৈব ও আধুনিক পদ্ধতিতে সবজি উৎপাদনে কৃষকদের উৎসাহিত করছে। এই প্রকল্পের অংশ হিসেবে বাশুলী গ্রামে ২০ শতক জমিতে জৈব সবজি উৎপাদনের একটি প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়। সেই প্রদর্শনীতেই সুপার গ্রিন লাউ চাষ করে সাফল্যের মুখ দেখেন আমিনুল ইসলাম।
চলতি মৌসুমে তিনি মোট ১০০ শতক জমিতে এই জাতের লাউ চাষ করেছেন। এর মধ্যে ২০ শতক জমি জৈব পদ্ধতিতে প্রদর্শনী কার্যক্রমের আওতায় রয়েছে। বীজ, মাচা তৈরি, জৈব সার, শ্রমিক ও পরিচর্যাসহ তাঁর মোট খরচ হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। শুরুতে কিছুটা ঝুঁকি থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর আশঙ্কা কেটে যায়—কারণ জমির প্রতিটি মাচা ভরে উঠতে থাকে সবুজ লাউয়ে।
মাঠ থেকে লাউ তোলার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় বিক্রির হিসাব। ইতোমধ্যে তিনি প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা লাউ বিক্রি করেছেন। জমিতে এখনো অনেক লাউ ঝুলছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বাকি ফলন বিক্রি করে আরও ২ থেকে ৩ লাখ টাকা আয় হবে বলে আশা করছেন তিনি।
হাসিমুখে আমিনুল ইসলাম বলেন, “কৃষি অফিসের পরামর্শ মেনে জৈব সার ও পরিবেশবান্ধব বালাই দমন পদ্ধতি ব্যবহার করেছি। সুপার গ্রিন জাতের লাউ দেখতে সুন্দর, আকারে বড় ও ওজনে ভারী হওয়ায় বাজারে ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে।”
স্থানীয় বাজারে গেলে তাঁর কথার সত্যতা মেলে। সাধারণ লাউয়ের চেয়ে সুপার গ্রিন লাউ ক্রেতাদের বেশি আকর্ষণ করছে। অনেক পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ী সরাসরি ক্ষেত থেকেই লাউ কিনে নিচ্ছেন। এতে পরিবহন খরচ কমছে, সময় বাঁচছে, আর কৃষকও পাচ্ছেন ন্যায্য মূল্য।
আমিনুল ইসলামের এই সাফল্য থেমে নেই শুধু তাঁর নিজের মাঝেই। আশপাশের গ্রামের কৃষকরাও তাঁর ক্ষেত ঘুরে দেখছেন, নিচ্ছেন পরামর্শ। এক কৃষক বলেন, “এত অল্প খরচে যদি এত লাভ হয়, তাহলে লাউ চাষ অবশ্যই লাভজনক। আমরাও আগামী মৌসুমে এই জাতের লাউ চাষ করব।”
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, দিনাজপুর অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়া লাউসহ নানা সবজি চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। পরিকল্পিত চাষাবাদ, জৈব পদ্ধতির ব্যবহার ও সরকারি সহায়তা পেলে অল্প জমিতেই কৃষকরা স্বাবলম্বী হতে পারেন।
উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ ইয়াসমিন আক্তার বলেন, “সুপার গ্রিন জাতের লাউ উচ্চ ফলনশীল এবং রোগবালাই তুলনামূলক কম। সঠিক সময়ে চাষ ও নিয়মিত পরিচর্যা করলে অল্প জমিতেও ভালো লাভ করা সম্ভব।”
তিনি আরও জানান, টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের হাতে-কলমে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত সবজি উৎপাদনের কৌশল শেখানো হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, বাশুলী গ্রামের সবুজ লাউয়ের এই গল্প শুধু একজন কৃষকের সাফল্যের গল্প নয়—এ গল্প টেকসই কৃষি, নিরাপদ খাদ্য আর গ্রামীণ অর্থনীতির সম্ভাবনার গল্প। আমিনুল ইসলামের মতো উদ্যোগী কৃষকরাই দেখিয়ে দিচ্ছেন, সঠিক পরিকল্পনা আর পরিশ্রম থাকলে অল্প জমিতেও বদলে যেতে পারে জীবনের চিত্র।

