

এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আলোচিত তিনটি সংশোধনী ছিল একতরফা ও বিতর্কিত, যা জনগণ ও আদালত প্রত্যাখ্যান করেছে। এ অবস্থায় বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টার পাশাপাশি সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে গঠিত জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটির কার্যক্রম অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আগামীকাল মঙ্গলবার কমিটির সদস্যরা তাঁদের প্রথম বৈঠকে মিলিত হতে যাচ্ছেন। ওই বৈঠকের মাধ্যমে বিশেষ কমিটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সংবিধানের মতো মৌলিক বিষয়ে সর্বদলীয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে যেকোনো সংশোধনী রাজনৈতিক রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বাংলাদেশের ইতিহাসে কয়েকটি সংশোধনী দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের বিষয় হয়ে রয়েছে। রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হলেও পরে সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে সেটি বাতিল করা হয়। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে একতরফাভাবে সংসদে পাস হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনটি সংশোধনীর মধ্যে ওই সংশোধনী ছিল সবচেয়ে বেশি আলোচিত। সংশোধনীর আগে সংসদ উপনেতা সাজেদা চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দল বিএনপিকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও সংগত কিছু কারণে তারা সাড়া দেয়নি। ফলে একতরফাভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ও গণভোটের বিধান বিলুপ্তিসহ সংবিধানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়। পরবর্তী সময়ে ওই সংশোধনী বাংলাদেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হয়। শেষ পর্যন্ত আদালতের রায়ে সেই সংশোধনী বাতিল হয়েছে।
এদিকে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘ আলোচনার পর ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’ প্রণয়ন করলেও তা বাস্তবায়ন প্রশ্নে রাজনৈতিক বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী দল দ্বিমুখী অবস্থান নিয়েছে। সরকারি দল তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং নোট অব ডিসেন্টসহ স্বাক্ষরিত জাতীয় জুলাই সনদ অনুসারে বিদ্যমান সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে থেকে বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংশোধন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে চায়। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট বলছে, গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন ছাড়া মৌলিক সাংবিধানিক পরিবর্তন বৈধতা পাবে না। এই মতবিরোধের মধ্যেই সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সংসদ সচিবালয়ের তথ্য মতে, জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে বিরোধী দলের সদস্যসহ ১৭ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিরোধী দল তাদের প্রতিনিধির নাম না দেওয়ায় ১২ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। ওই অধিবেশনের ২৩তম দিন ১৩ জুলাই চিফ হুইপ মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম সংবিধান সংশোধন বিশেষ কমিটির নাম সংসদে উপস্থাপন করেন। পরে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। ১২ সদস্যের এই কমিটিতে সরকারি দলের পাশাপাশি কয়েকটি ছোট রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরাও রয়েছেন। তবে ওই কমিটি প্রত্যাখ্যান করে সংসদ অধিবেশন থেকে ওয়াক আউট করে বিরোধী দল। কমিটি গঠনকালে সংসদকে জানানো হয়, বিরোধী দল চাইলে যেকোনো সময় কমিটিতে যোগ দিতে পারবে। এ অবস্থায় বিশেষ কমিটিকে কার্যকর ও অংশগ্রহণমূলক করতে বিরোধী দলের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। শেষ পর্যন্ত বিরোধী দল কমিটিতে যোগ দেবে বলে আশাবাদী সরকারি দল।
সংসদ সচিবালয় ও সরকারি দলের সূত্রগুলো জানায়, বিরোধী দল যেকোনো সময় প্রতিনিধি মনোনয়ন দিলেই কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী এরই মধ্যে জানিয়েছে, তারা বিশেষ কমিটিতে কোনো সদস্য পাঠাবে না। তারা বলছে, সরকার গণভোটে জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেটের পরিবর্তে সংসদীয় প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তাদের মতে, জুলাই জাতীয় সনদ এবং পরবর্তী গণভোটে জনগণ সংবিধান সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে। ফলে সংসদের বাইরে নয়, বরং গণভোট-উত্তর কাঠামো অনুযায়ী একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে সেই পরিষদের মাধ্যমে সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত। তবে আলোচিত গণভোটের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত নয় বলেই অনেকে মনে করেন।
বিষয়টি সম্পর্কে সরকারি দলের বক্তব্য, সংবিধানের যেকোনো পরিবর্তন সংসদের মাধ্যমেই হতে হবে। বর্তমান সংবিধানে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে সংশোধনী পাসের সাংবিধানিক সুযোগ রয়েছে। তাই বিশেষ কমিটি রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নিয়ে একটি সংশোধনী বিল প্রস্তুত করবে।
কমিটির একাধিক সদস্য জানান, বিরোধী দলকে যুক্ত করার প্রক্রিয়া খোলা রেখে সংশোধনী প্রস্তাবগুলো নিয়ে কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে চায় কমিটি। আগামীকাল জাতীয় সংসদ ভবনে কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ওই বৈঠকে মূলত পরিচিতি, কার্যপরিধি ও ভবিষ্যৎ কর্মপদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বৈঠকে বিশেষ কমিটির কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা হবে। বিশেষ করে জুলাই জাতীয় সনদের যেসব প্রস্তাব সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য, সেগুলো সংসদীয় প্রক্রিয়ায় দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সংবিধান সংশোধনে বিরোধী দল শেষ পর্যন্ত বিশেষ কমিটিতে নাম দেবে বলে আশাবাদী বিশেষ কমিটির সদস্য ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম। তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি এরই মধ্যে কার্যক্রম শুরু করেছে। তার পরও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী যেকোনো সময় নাম দিলেই তাঁদের নাম যুক্ত করা হবে। এরপর সংসদে তা তোলা হবে।
এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় দলের মুখপাত্র নাজিবুর রহমান বলেন, ‘আমরা সংবিধান সংস্কার পরিষদ চাই। তাই বিশেষ কমিটিতে কোনো নাম দিইনি। আমরা এতে যুক্ত হচ্ছি না। তবে বিশেষ কমিটিতে না গেলেও সংসদে কথা বলার সুযোগ আছে। সরকার এরই মধ্যে জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে পালন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আমরা দেখতে চাই, সেটা তারা পূরণ করে কি না। না হলে আমরা সংসদে ও সংসদের বাইরে কথা বলব, জনগণের কাছে যাব।’
উল্লেখ্য, ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের পর ১৭ বার সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর রাষ্ট্র সংস্কারের জোরালো দাবি ওঠে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সংবিধান, বিচার বিভাগ, পুলিশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), নির্বাচনব্যবস্থা ও জনপ্রশাসন সংস্কারসহ ১১টি খাত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসব কমিশনের সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা, সংলাপ, বিতর্ক শেষে ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জুলাই জাতীয় সনদ গৃহীত হয়। এরপর নভেম্বরে সংবিধানবহির্ভূতভাবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, যে আদেশ অনুসারে গণভোট অধ্যাদেশ জারি করা হয়। ওই আদেশ অনুসারে, সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল। তবে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের ৭৭ জন সদস্য উভয় শপথ নিলেও সরকারি দল বিএনপি জোটের সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। তাঁদের যুক্তি ছিল, বিদ্যমান সংবিধানে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ বা এসংক্রান্ত কোনো পদের বা আলাদা শপথের সুনির্দিষ্ট আইনি ও সাংবিধানিক বিধান নেই। এ ছাড়া দলটির পক্ষে বলা হয়, তাঁরা শুধু জাতীয় সংসদের সদস্য (এমপি) হিসেবে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন; কোনো আলাদা সংস্কার কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে নয়।
