ঢাকা
logo
প্রকাশিত : November 20, 2025

অপরাধ, অসতর্কতা নাকি আমাদের ভেতরের অস্থির সমাজ?

সন্ধ্যার স্বাভাবিক নীরবতা ভেঙে গলির কোণে দুই শিশু খেলা করছে। তিন চাকার রিকশা একজন আরেকজনকে ঠেলে হাসাহাসি করছে। সামনে-পেছনে মানুষের যাতায়াত। কেউ বাজারের ব্যাগ হাতে ফিরছেন, কেউ হাঁটছেন নিজেদের মতো।

ঠিক এমন সময় সামনে এলো এক অচেনা দৃশ্য। খালি রিকশা চালিয়ে যাওয়া একজন রিকশাচালক হঠাৎ থামলেন, বাচ্চাদের দেখে কিছুটা পিছিয়েও এলেন। পকেট থেকে টাকা বের করে একজনকে ডাকলেন। শিশুটি এগিয়ে যেতেই টাকাটা ধরিয়ে দিয়ে মুহূর্তেই খুলে নিলেন তার গলার স্বর্ণের চেইন।

শিশুটি হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে রইল। আর লোকটি রিকশা ঘুরিয়ে দ্রুত অদৃশ্য হয়ে গেলেন। শিশুটি টাকাটা হাতে নিয়ে চুপচাপ ফিরে গেল খেলায়। কয়েক সেকেন্ডের সেই দৃশ্য এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

ভিডিওটি যতটা বিস্ময়ের, তার চেয়ে বেশি আতঙ্কের। কারণ এমন ঘটনা আর নতুন নয়। রাস্তায় হাঁটতে থাকা শিশুদের গলার চেইন ছিনিয়ে নেওয়া বহুদিন ধরেই ঘটে আসছে। কারো কারো গলায় আঘাত লেগে রক্ত পড়েছে, কেউ আতঙ্কে কেঁদে উঠেছে। এই ভিডিওর ঘটনাটি তাই আলাদা নয়।

তবে এর নির্মম সরলতা আমাদের ভাবিয়ে তুলছে।শিশুটি বাসার পাশেই খেলছিল। পরিচিত পরিবেশ। অথচ সেখানেও সে নিরাপদ ছিল না। রিকশাচালক জোর করেননি, ভয় দেখাননি, লোভ দেখিয়ে চেইন খুলে নিয়েছেন। শিশুর নিষ্পাপ সরলতাকে অস্ত্র বানানোর এই প্রবণতা আরো অস্বস্তিকর। শহরটা যেন মানুষের ভিড়ে ভরা হলেও মনুষ্যত্বের অপূর্ণতায় ক্লান্ত হয়ে গেছে।

ভিডিওটির কমেন্টে একেকজনের একেক ব্যাখ্যা, একেক যুক্তি। কেউ দোষ দিচ্ছেন অভিভাবককে, ‘রাতে বাচ্চা বাইরে খেলছে কেন?’ কেউ বলছেন, ‘দেশের অবস্থা এমন, তবু শিশুদের গলায় স্বর্ণ? বাবা-মাই দায়ী।’ কেউ আবার অভিযোগ করছেন, ‘ভাগ্য ভালো, শুধু চেইন নেওয়া হয়েছে; বাচ্চাটাকে নিয়ে গেলে কী হতো?’ এমন মন্তব্যে ভয়, ক্ষোভ, হতাশা- সবই মিশে আছে।

আবার একদল বলছে, ভিডিওটিই নাকি সন্দেহজনক। সিসিটিভির ফুটেজ বলে মনে হয় না। কেউ বলছেন, ঘটনাটি নাকি শ্যামলী-২ এর আদরের গলির। আসল-নকল যাই হোক, এই দৃশ্যকে অবিশ্বাস করার তাড়না আমাদের সমাজের আরেক বাস্তবতা তুলে ধরে। এখন আর কোনো খবর দেখে মানুষ প্রথমে বিস্ময় প্রকাশ করে না; প্রথমেই সন্দেহ জাগে।

কমেন্টের ভাষায় আরেকটা বিষয় স্পষ্ট। মানুষ এখন আর অপরাধকে শুধু অপরাধ হিসেবে দেখে না। কেউ বলছেন, ‘রিকশাওয়ালা সুযোগ পেয়েছে, নিয়েছে। দোষ কোথায়?’ যেন টিকে থাকার লড়াই অপরাধের নৈতিকতা মুছে দিয়েছে। আবার কেউ বলছেন, ‘সে বাচ্চাকে নিয়ে যায়নি। এটাই সৌভাগ্য।’ এমন স্বস্তি আমরা কবে থেকে মেনে নিতে শিখলাম?

সবচেয়ে বেশি চিন্তার জায়গা, শিশুর সরল বিশ্বাস। যে বয়সে পৃথিবীকে রঙিন আর নিরাপদ মনে হওয়ার কথা, সে বয়সে তারা শিখে যাচ্ছে- অচেনা কোনো ডাক কখনো কখনো বিপদও ডেকে আনে।

নগরের ব্যস্ততা, ক্লান্তি আর অস্থিরতার ভিড়ে আমরা কখন যে মানবিক নিরাপত্তার অনুভূতি হারিয়ে ফেলেছি, তা কেউই ঠিক জানি না। তবে এমন ভিডিওগুলো বারবার মনে করিয়ে দেয়- এক মুহূর্তের অসতর্কতা, এক টুকরো সরলতা, আর এক ঝটকাতেই অনেক কিছু বদলে যেতে পারে। আজ বাচ্চার চেইন, কাল হয়তো অন্য কিছু।

নিরাপত্তার এই ক্ষয় শুধু পথঘাটে নয়, সমাজের ভেতরেও। আর এই ক্ষয় থামানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram