ঢাকা
logo
প্রকাশিত : November 7, 2026

মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ঘিরে ভারত কেন আলোচনায়?

বাংলাদেশের মাতারবাড়ীকে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করতে জাপানের নেওয়া বিগ-বি উদ্যোগ নতুন গতি পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক টোকিও সফরে দুই দেশের যৌথ ঘোষণায় প্রকল্পটি ‘বিগ-বি ফর শেয়ারড প্রসপ্যারিটি’ বা অভিন্ন সমৃদ্ধির নতুন ধারণায় যুক্ত হয়েছে।

তবে এ উদ্যোগে আঞ্চলিক যোগাযোগের বিষয়টি সামনে আসায় ভারতের সম্ভাব্য সুবিধা, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক এবং ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য নিয়ে দেশে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে।

এক প্রতিবেদনে বিবিসি জানায়, বিগ-বি প্রকল্পের পূর্ণ নাম ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ ইনিশিয়েটিভ’। বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক এ অর্থনৈতিক পরিকল্পনার আওতায় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলকে ঘিরে শিল্প, জ্বালানি ও যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তুলতে চায় জাপান। এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর।

মাতারবাড়ীতে প্রকল্পটির যাত্রা শুরু হয়েছিল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা দিয়ে। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে এ বিষয়ে চুক্তি হয়। ২০১৭ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা পরিবহনের জন্য সমুদ্র থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ২৫০ মিটার প্রশস্ত নৌপথ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

একই বছর জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) পরিচালিত প্রাথমিক সমীক্ষায় ওই নৌপথ ব্যবহার করে বাণিজ্যিক বন্দর নির্মাণের সম্ভাবনা উঠে আসে। এতে একই অবকাঠামো কাজে লাগিয়ে ব্যয় কমানো এবং জমির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার সুযোগ দেখানো হয়। পরে বাংলাদেশ প্রস্তাবটি গ্রহণ করলে চ্যানেলের গভীরতা ও প্রশস্ততা বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়। সেখান থেকে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের ধারণা বিস্তৃত হয়।

বর্তমানে মাতারবাড়ীতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল, বন্দর ও শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে।

বাংলাদেশ ও জাপানের যৌথ ঘোষণায় চারটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো মাতারবাড়ী বন্দরকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা সম্প্রসারণ, দুর্যোগ ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা।

আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ছয় বিলিয়ন ডলারের বেশি জাপানি বিনিয়োগের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি পাওয়ার বিষয়টিও যৌথ ঘোষণায় এসেছে।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, মাতারবাড়ীতে বন্দর, জ্বালানি, সরবরাহব্যবস্থা ও শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই সরকারের লক্ষ্য।

বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণে জাপানের অর্থায়ন থাকলেও এসব ঋণ পরিশোধের দায় বাংলাদেশের ওপর থাকবে। ফলে বিনিয়োগের বিপরীতে দেশের অর্থনৈতিক প্রাপ্তি কতটা হবে সেটি নিয়ে আলোচনা রয়েছে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের সভাপতি অর্থনীতিবিদ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আসতে পারে। এর মধ্যে ৪৮ থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলার বেসরকারি খাত থেকে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। জাপানি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের ফলে প্রযুক্তি স্থানান্তর, স্থানীয় উদ্যোক্তাদের যৌথ বিনিয়োগ এবং সরবরাহব্যবস্থার বিকাশ ঘটতে পারে। কয়েক দশকে প্রায় ২৮ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির সম্ভাবনার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।

বিগ-বি পরিকল্পনায় ভারতের সংশ্লিষ্টতা নতুন নয়। ২০১৪ সালে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে এ ধারণা সামনে আনেন। প্রাথমিক পরিকল্পনায় বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, মিয়ানমার, নেপাল ও ভুটানকে সম্ভাব্য বৃহৎ বাজারের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে ২০২৩ সালে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদার ভারত সফরেও বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক শিল্পাঞ্চলের বিষয়টি আলোচনায় আসে। তবে তারেক রহমানের সাম্প্রতিক সফরের যৌথ ঘোষণায় ভারতের নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। কিন্তু আঞ্চলিক সংযোগ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের পরিকল্পনা থেকে প্রতিবেশী দেশগুলোর অংশগ্রহণের সম্ভাবনা দেখছেন বিশ্লেষকরা।

গত ৩১ অক্টোবর ঢাকার এক সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান মাতারবাড়ী প্রকল্পের মাধ্যমে ভারতকে যোগাযোগ সুবিধা দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট করার দাবি জানান। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার জানিয়েছেন, চুক্তি ও যৌথ ঘোষণার বিস্তারিত পর্যালোচনার পর তারা আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানাবেন।

সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলীর মতে, ভারতের সঙ্গে অর্থনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনা থাকলেও এ বিষয়ে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা জরুরি। তা না হলে প্রকল্প বাস্তবায়নে জটিলতা দেখা দিতে পারে।

বিগ-বি উদ্যোগে জাপানের ‘মুক্ত ও অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিক’ ধারণার উল্লেখ থাকায় চীনের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার জাপান। অন্যদিকে চীন এ উদ্যোগকে নিজেদের প্রভাব সীমিত করার কৌশল হিসেবে দেখে।

অর্থনীতিবিদ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রভাবের বাইরে থেকে জাপানি বিনিয়োগের জন্য অর্থনৈতিক পরিসর তৈরির বিষয়টিও এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর পরামর্শ, চীন ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ নিশ্চিত করতে হবে।

সরকারও এ ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানের কথা জানিয়েছে। উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, চীনসহ বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ উন্মুক্ত। মাতারবাড়ীতেও সব দেশের প্রস্তাব বিবেচনা করা হবে। তবে কোন প্রস্তাব গ্রহণ করা হবে, তা নির্ধারিত হবে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও যৌক্তিকতা বিবেচনা করে।

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. মো: জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram