ঢাকা
logo
প্রকাশিত : September 2, 2026

লাখ কোটি টাকার খোঁজে সরকার

অবশেষে নতুন পে স্কেল অনুমোদন দিল সরকার। এখন চ্যালেঞ্জ অর্থসংস্থানের।

মূল্যস্ফীতির কঠিন সময়ে এটি সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য স্বস্তি হয়ে এলেও রাষ্ট্রের সামনে তৈরি হয়েছে বড় অঙ্কের আর্থিক দায়। নতুন বেতনকাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হলে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে প্রায় এক লাখ পাঁচ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, কিভাবে সরকার প্রতিবছর এই বিপুল অঙ্কের টাকার সংস্থান করবে? কারণ ঢাকার মেট্রো রেল-৬ প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয় প্রায় ৩২ হাজার ৭১৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ নতুন পে স্কেলের এক বছরের অতিরিক্ত ব্যয় একটি এমআরটি-৬ প্রকল্পের ব্যয়ের তিন গুণেরও বেশি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত তাই শুধু বেতনকাঠামো পরিবর্তনের বিষয় নয়; এটি এখন সরকারের রাজস্ব সংগ্রহ, বাজেট ব্যবস্থাপনা, ঋণনীতি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নয়ন ব্যয়ের ওপর বড় ধরনের পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বাড়তি অর্থের সংস্থান করতে সরকারকে মূলত তিনটি পথের মধ্যে ভারসাম্য করতে হবে—রাজস্ব বাড়ানো, অন্য খাতের ব্যয় কমানো এবং ঋণ নেওয়া। কিন্তু তিন পথের প্রতিটিতেই রয়েছে ঝুঁকি।

এক বছরে তিন এমআরটি-৬-এর বেশি : নতুন পে স্কেলের পুরো কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় ধরা হয়েছে এক লাখ পাঁচ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।

সরকারের হিসাবে এর সুবিধা পাবেন প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী।

এই ব্যয়ের সমান্তরালে সুবিধাভোগী প্রকল্প হিসেবে ঢাকার এমআরটি-৬ প্রকল্পের নাম সামনে এনেছেন বিশ্লেষকরা। এর সংশোধিত ব্যয় প্রায় ৩২ হাজার ৭১৭ কোটি টাকা। হিসাব করলে নতুন পে স্কেলের এক বছরের বাড়তি ব্যয় এমআরটি-৬-এর মোট প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ৩.২ গুণ।

অর্থনীতির আকার বোঝাতে এই তুলনা গুরুত্বপূর্ণ।

একটি বড় মেগাপ্রকল্প নির্মাণে যে পরিমাণ অর্থ কয়েক বছর ধরে ব্যয় করা হয়, নতুন পে স্কেলের ক্ষেত্রে সেই পরিমাণের কয়েক গুণ অর্থ প্রতিবছর স্থায়ী ব্যয় হিসেবে বহন করতে হবে।

এটি একবারের প্রকল্প ব্যয় নয়। বেতনকাঠামো কার্যকর হলে ভবিষ্যতের বাজেটেও এর প্রভাব থাকবে। বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে ইনক্রিমেন্ট, পেনশন ও সংশ্লিষ্ট সুবিধার ব্যয়ও সময়ের সঙ্গে বাড়তে পারে।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, নতুন পে স্কেল ঘোষণা করতে গিয়ে সরকারকে বছরে অতিরিক্ত এক লাখ পাঁচ হাজার ৫৮০ কোটি টাকার স্থায়ী ব্যয়ের দায় নিতে হয়েছে। এই অর্থের পরিমাণ একটি বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ব্যয়ের তুলনায়ও অনেক বেশি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ঢাকার এমআরটি লাইন-৬ প্রকল্পের বর্তমান ব্যয় প্রায় ৩২ হাজার ৭১৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ নতুন পে স্কেলের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় দিয়ে তিনটিরও বেশি মেট্রো রেল প্রকল্পের সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় করা সম্ভব।

তাঁর মতে, সরকার মূলত ধাপে ধাপে পে স্কেল বাস্তবায়নের কথা বলেছে। কিন্তু ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করাই এই বিশাল ব্যয়ের চাপ মোকাবেলার একমাত্র উদ্যোগ হতে পারে না। সরকারের অন্যান্য খাতে ব্যয় সাশ্রয় করে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ কতটা কমানো সম্ভব হবে, সেটিও এখনো নিশ্চিত নয়।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর সঙ্গে তাঁদের সেবার মান কিভাবে বাড়বে, তার কোনো সুস্পষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে কি না? প্রজাতন্ত্রের অর্থ থেকেই এই অতিরিক্ত বেতন-ভাতা দেওয়া হবে। ফলে এর বিনিময়ে জনগণকে আরো কার্যকর, দ্রুত ও জবাবদিহিমূলক সেবা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। তিনি আরো বলেন, বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি সেবার মানোন্নয়নে কী ধরনের প্রশাসনিক সংস্কার, কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন এবং জবাবদিহির ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, সেটিও স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

ধাপে ধাপে বাস্তবায়নে সাময়িক স্বস্তি : সরকার অবশ্য পুরো ব্যয় একবারে চাপিয়ে দিচ্ছে না। নতুন পে স্কেল ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে দুই ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। মূল বেতন তিন ধাপে কার্যকর হবে। বিভিন্ন ভাতা ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে কার্যকর হবে। পেনশন বৃদ্ধিও ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে।

সরকারের যুক্তি, ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করলে মূল্যস্ফীতির ওপর আকস্মিক চাপ কমবে এবং বাজেট ব্যবস্থাপনাও তুলনামূলক সহজ হবে।

রাজস্বে বড় চাপ : ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে নতুন পে স্কেলের বাড়তি বার্ষিক ব্যয় এক লাখ পাঁচ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। অর্থাৎ বাড়তি ব্যয়টি বর্তমান রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ১৫.২ শতাংশ।

এখানেই সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ : রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কঠিন হয়ে উঠেছে। কর-জিডিপি অনুপাতও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নয়। এর মধ্যে প্রতিবছর নতুন করে এক লাখ কোটি টাকার বেশি স্থায়ী ব্যয় যুক্ত হলে সরকারের ফিসক্যাল স্পেস আরো সংকুচিত হবে।

ব্যয় কমালে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত : রাজস্ব বাড়ানো কঠিন হলে সরকারের সামনে থাকবে ব্যয় পুনর্বিন্যাসের পথ। কিন্তু সেখানেও ঝুঁকি কম নয়।

বেতন ও পেনশন হচ্ছে সরকারের তুলনামূলকভাবে অনমনীয় ব্যয়। একবার বাড়ালে তা সহজে কমানো যায় না। ফলে রাজস্ব আদায় কম হলে সরকারকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো কিংবা অন্যান্য উন্নয়ন খাতের বরাদ্দ কমানোর দিকে যেতে হতে পারে। এতে আজকের বেতন ব্যয়ের চাপ সামলানো গেলেও ভবিষ্যতের উৎপাদনশীল বিনিয়োগ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

বিশেষ করে অবকাঠামো ও উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় কমে গেলে অর্থনীতির সরবরাহ সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগও সীমিত হতে পারে। ফলে একদিকে সরকারি কর্মীদের আয় বাড়বে, অন্যদিকে অর্থনীতির উৎপাদনক্ষমতা কাঙ্ক্ষিত হারে না বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

ঋণ নিলে বাড়বে সুদের বোঝা : তৃতীয় পথ ঋণ। চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি মেটাতেও সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করছে। ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা।

নতুন পে স্কেলের বাড়তি ব্যয়ের জন্য সরকার যদি এর বাইরে আরো ব্যাংকঋণ নেয়, তাহলে সরকারি ঋণের চাপ বাড়বে। একই সঙ্গে বাড়বে ভবিষ্যতের সুদ পরিশোধের দায়। আজকের ঋণ আগামী দিনের বাজেটে জায়গা দখল করবে। ফলে ভবিষ্যতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা কিংবা উন্নয়ন খাতে ব্যয়ের জন্য সরকারের হাতে কম অর্থ থাকতে পারে।

বেসরকারি বিনিয়োগে ‘ক্রাউডিং আউট’ : সরকারের অতিরিক্ত ব্যাংকঋণের আরেকটি ঝুঁকি বেসরকারি খাতে। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অর্থের সরবরাহ সীমিত থাকলে সরকার বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের সুযোগ কমে যেতে পারে। অর্থনীতিতে এই পরিস্থিতিকে বলা হয় ‘ক্রাউডিং আউট’।

এমনিতেই উচ্চ সুদহার, জ্বালানিসংকট, উৎপাদন ব্যয় এবং দুর্বল বিনিয়োগ পরিবেশের কারণে বেসরকারি খাত চাপে রয়েছে। এর মধ্যে সরকারের ঋণ চাহিদা বাড়লে শিল্প স্থাপন ও ব্যবসা সম্প্রসারণ আরো কঠিন হতে পারে।

বাড়বে বাজারের চাহিদা : তবে নতুন পে স্কেলের ইতিবাচক প্রভাবও রয়েছে। সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের হাতে বাড়তি অর্থ গেলে ভোগব্যয় বাড়বে। খাদ্য, পোশাক, বাসস্থান, পরিবহন, শিক্ষা, চিকিৎসা, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য সেবা খাতে চাহিদা বাড়তে পারে।

এতে অভ্যন্তরীণ বাজারে ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি বাড়ার সুযোগ রয়েছে। ভোগ বাড়লে ভ্যাট ও অন্যান্য পরোক্ষ করের মাধ্যমে সরকারের রাজস্বও কিছুটা বাড়তে পারে। তবে এই সুফল নির্ভর করবে বাড়তি চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন ও সরবরাহ কতটা বাড়ানো যায় তার ওপর।

চাহিদা বাড়বে, দামও? : সরবরাহ একই হারে না বাড়লে বাড়তি অর্থের প্রবাহ মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে খাদ্য, নিত্যপণ্য, পরিবহন ও সেবা খাতে সরবরাহব্যবস্থা দুর্বল থাকলে বাড়তি চাহিদা দ্রুত পণ্যের দামে প্রতিফলিত হতে পারে। তখন সরকারি কর্মচারীদের নামমাত্র বেতন বাড়লেও প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার একটি অংশ মূল্যস্ফীতিতে হারিয়ে যেতে পারে। এ কারণেই সরকার পে স্কেল ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, এতে জাতীয় পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।

‘বেতন বাড়ানোর অজুহাতে দাম বাড়ানো যাবে না’ : ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা খুব বেশি নয়। তাঁদের বেতন বাড়ানো হয়েছে। তবে বেতন বাড়ানোর বিষয়টিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে কেউ যেন বাজারে পণ্যের দাম বাড়াতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

তিনি বলেন, বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সরকারের দায়িত্ব। গ্যাস, বিদ্যুৎ, পরিবহনসহ সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খাতে স্বাভাবিক কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদেরও ব্যবসার পাশাপাশি সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব পালন করতে হবে।

এফবিসিসিআই প্রশাসক আরো বলেন, বড় পাইকারি বাজারে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয় সরকারকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। পণ্যের দাম যাতে অযৌক্তিকভাবে না বাড়ে, সে জন্য এফবিসিসিআইয়ের বাজার নজরদারি অব্যাহত থাকবে।

স্বস্তি কর্মীদের, পরীক্ষা রাষ্ট্রের : নতুন পে স্কেলে সর্বনিম্ন মূল বেতন আট হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। এতে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন।

সরকার বলছে, নতুন কাঠামোর লক্ষ্য সরকারি কর্মীদের আর্থিক নিরাপত্তা, কর্মোদ্দীপনা এবং জনবান্ধব প্রশাসন নিশ্চিত করা। কিন্তু অর্থনীতির দৃষ্টিতে এখন বড় প্রশ্ন অন্য জায়গায়। বছরে এক লাখ পাঁচ হাজার ৫৮০ কোটি টাকার এই বাড়তি দায়ের অর্থ কোথা থেকে আসবে?

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram