

আগামী অক্টোবরের মাঝামাঝি জাপান সফরে যেতে পারেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ঢাকা ও টোকিওর একাধিক কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে দুই দেশ সফরের সম্ভাব্য সময়সূচি ও বৈঠকের এজেন্ডা চূড়ান্ত করার কাজ করছে।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, এই সফরে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, মেগাপ্রকল্পে স্বল্প সুদে ঋণ, জ্বালানি সহযোগিতা, বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ, রোহিঙ্গা সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের প্রভাবসহ বিভিন্ন কৌশলগত বিষয় গুরুত্ব পাবে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, জাপান সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে গত ৬ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ)। এই চুক্তির ফলে জাপানের বাজারে দেশের প্রায় সাত হাজার ৪০০টি পণ্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পেয়েছে। বৈশ্বিক সংরক্ষণবাদী বাণিজ্যনীতির মধ্যেও এই চুক্তিকে বাংলাদেশের রপ্তানি ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে একটি গেম চেঞ্জার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
একই সঙ্গে এটি ভবিষ্যতে ইইউ, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিরও ভিত্তি তৈরি করবে। বর্তমানে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য তিন বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি, যা দ্রুত পাঁচ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি কৌশলগত সহযোগিতায়ও টোকিওর আগ্রহ বেড়েছে। বর্তমান সরকার ঘোষিত বাজেটে একাধিক বড় ও মাঝারি প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে, যার উল্লেখযোগ্য অংশে বিদেশি স্বল্প সুদে ঋণের প্রয়োজন হবে।
সে কারণে জাপানের সরকারি উন্নয়ন সহায়তা (ওডিএ) এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করার বিষয়টি সফরের অন্যতম অগ্রাধিকার হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে দেশে জ্বালানির দাম সমন্বয় করতে হয়েছে সরকারকে। কূটনৈতিক সূত্র বলছে, এই প্রেক্ষাপটে জাপানের সঙ্গে এলএনজি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ অবকাঠামো খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।
সফরে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় আসবে।
যদিও এই সফরে নতুন কোনো জনশক্তি চুক্তি সই হওয়ার সম্ভাবনা কম, তবে দক্ষ কর্মী নিয়োগে বাংলাদেশকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অনুরোধ জানাবে ঢাকা। কূটনৈতিক সূত্র জানায়, ২০২৪ সালে জাপানে বাংলাদেশির সংখ্যা ছিল ৪৪ হাজার ৯৩৮। চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত তা বেড়ে প্রায় ৫৭ হাজারে পৌঁছেছে। বছরের শেষে এই সংখ্যা ৬২ হাজার এবং ২০২৭ সালের শেষে ৮৫ থেকে ৯০ হাজারে উন্নীত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো নেপাল ও ভিয়েতনামের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। বর্তমানে জাপানে প্রায় তিন লাখ নেপালি এবং চার লাখ ভিয়েতনামি নাগরিক বসবাস করছেন।
সফরে রোহিঙ্গা সংকটও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে। বাংলাদেশ রাখাইন রাজ্যে নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে জাপানের আরো সক্রিয় ভূমিকা চাইবে। ২০১৭ সালের পর থেকে রোহিঙ্গা সংকটে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও মানবিক সংগঠনের মাধ্যমে ২৫ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি সহায়তা দিয়েছে জাপান। চলতি বছরের মার্চেও রোহিঙ্গা ও আশ্রয়দানকারী স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য এক কোটি ৬৫ লাখ ডলারের নতুন মানবিক সহায়তা ঘোষণা করে টোকিও।
গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপদেষ্টা উনো ইয়োশিমাসা সৌজন্য সাক্ষাৎ করলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দক্ষ বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ বাড়ানো, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং জাপানি বিনিয়োগ সম্প্রসারণের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের মতো আরো একটি শিল্প পার্ক স্থাপনে জাপান আগ্রহী হলে সরকার সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।
জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সেক্রেটারি মারিয়া হাওলাদার বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। গত দুই বছরে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ভাটা পড়েছে। আমি বিশ্বাস করি, এই সফর জাপানি বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং নতুন বিনিয়োগের একটি শক্তিশালী ধারা সৃষ্টি করবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘এই সফরের মাধ্যমে জ্বালানি, অবকাঠামো, কৃষি ও খাদ্য, উৎপাদন শিল্প, প্রযুক্তি, লজিস্টিকসসহ বিভিন্ন খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে, যা বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারিকে সুদৃঢ় করবে।’
