ঢাকা
১৫ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
সকাল ১১:২৮
logo
প্রকাশিত : জুলাই ১৫, ২০২৬

বিদেশে শ্রমবাজার চ্যালেঞ্জের মুখে

সৌদি আরবসহ হাতে গোনা কয়েকটি দেশ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের জন্য শ্রমবাজার অনেকটা বন্ধ। সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরবেও কর্মী নিয়োগ কমে যাওয়ায় সামগ্রিক জনশক্তি রপ্তানি নিম্নমুখী।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, নতুন ভিসা অনুমোদনে ধীরগতি এবং কাগজপত্র যাচাইয়ে কড়াকড়িতে শ্রম অভিবাসন খাত এখন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে প্রবাস আয়ের প্রবৃদ্ধি এবং সরকারের শ্রম রপ্তানির লক্ষ্য বাস্তবায়নও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

চলতি বছরের শুরু থেকে বিদেশে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর ধারায় স্পষ্ট ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজের উদ্দেশ্যে গেছেন এক লাখ ৬৬ হাজার ৩৪৫ জন বাংলাদেশি কর্মী।

১ এপ্রিল থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত বিদেশে গেছেন এক লাখ ২৭ হাজার ২২০ জন। অর্থাৎ আগের সময়ের তুলনায় ৩৯ হাজার ১২৫ জন কম কর্মী বিদেশে গেছেন।

দেশভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রথম তিন মাসে সৌদি আরবে গেছেন এক লাখ ৩৪ হাজার ৬৫৪ জন, কাতারে ১৩ হাজার ৬৮৯ জন, কুয়েতে ছয় হাজার একজন, জর্দানে চার হাজার ৫৮৬ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে তিন হাজার ৬১৭ জন, ইরাকে দুই হাজার ৮৮৩ জন, লেবাননে ৮৭৫ জন, ওমানে ১৭ জন, তুরস্কে ১৬ জন ও ইয়েমেনে চারজন।

অন্যদিকে ১ এপ্রিল থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত সৌদি আরবে গেছেন ৮৯ হাজার ৬১ জন, কাতারে ১৮ হাজার ৩১৪ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ছয় হাজার ৬০৩ জন, কুয়েতে পাঁচ হাজার ৮০৮ জন, জর্দানে চার হাজার ৮৯০ জন, ইরাকে এক হাজার ৭৫২ জন, লেবাননে ৭৫০ জন, ওমানে ২০ জন, তুরস্কে ১৮ জন ও বাহরাইনে তিনজন।

এতে দেখা যায়, কাতার ও আরব আমিরাতে কর্মী যাওয়া কিছুটা বাড়লেও সৌদি আরবে বড় ধরনের পতন হয়েছে। এদিকে ফেব্রুয়ারি থেকে প্রতি মাসে বিদেশে কর্মসংস্থানের ছাড়পত্র পাওয়া কর্মীর সংখ্যা ৪৪ হাজার থেকে ৬৫ হাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। অথচ করোনা মহামারির পর কয়েক বছর ধরে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় এক লাখ কর্মী বিদেশে যাচ্ছিলেন। ফলে শ্রম অভিবাসনের গতি আবার অনেকটা কভিড-পূর্ব পর্যায়ে নেমে এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে বিদেশে কর্মসংস্থানের ছাড়পত্র পেয়েছেন ৬৫ হাজার ৬৩৪ জন কর্মী।

মার্চে তা কমে দাঁড়ায় ৪৪ হাজার ৬৫৮ জনে। এপ্রিলে ছাড়পত্র পান ৪৮ হাজার ৮৫৯ জন, আর মে মাসে এই সংখ্যা বেড়ে ৬০ হাজার ১১৯ জন হলেও তা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪৩ শতাংশ কম।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধীরগতি অব্যাহত থাকলে আগামী অর্থবছরে ১৪ লাখ কর্মী বিদেশে পাঠানোর সরকারি লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি মানুষের বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করার নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নেও চাপ তৈরি হবে।

বিদেশে কর্মী যাওয়া কমার কারণ : অভিবাসন খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে মূলত দুটি কারণ কাজ করছে। প্রথমত, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর পর আঞ্চলিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এতে গন্তব্যের তালিকায় থাকা কয়েকটি দেশে নতুন ভিসা অনুমোদন ধীর হয়ে যায় এবং নিয়োগপ্রক্রিয়া বিলম্বিত হতে থাকে।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরব ভিসা ইস্যু ও কর্মী নিয়োগে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। কিছু বাংলাদেশি কর্মী ভুয়া চাকরির চাহিদাপত্রের ভিত্তিতে ভিসা নিয়ে দেশটিতে প্রবেশ করলেও পরে প্রতিশ্রুত চাকরি পাননি। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকারও গন্তব্য দেশের নিয়োগকর্তাদের দেওয়া চাকরির চাহিদাপত্র সংশ্লিষ্ট দেশে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে সত্যায়িত করার শর্ত আরোপ করেছে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশি নিয়োগকর্তারা অনেক সময় বাংলাদেশি কর্মীদের দক্ষতা, ভাষাজ্ঞান ও কাগজপত্র নিয়ে অভিযোগ করেন। এসব সমস্যা সমাধানে সরকার, রিক্রুটিং এজেন্সি এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

শ্রমবাজারের নিম্নমুখী হওয়ার কারণ সম্পর্কে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সাবেক মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান বলেন, ‘আমাদের শ্রমবাজার কখনোই স্থির থাকে না। এটি পুরোপুরি নির্ভর করে বিভিন্ন দেশের শ্রমিক চাহিদার ওপর। সব দেশের চাহিদা সব সময় এক রকম থাকে না। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণেও সেখানে অনেক চলমান প্রকল্প ধীরগতিতে চলছে। ফলে নিয়োগকর্তারা নতুন কর্মী নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক হয়েছেন এবং রিক্রুটমেন্ট প্রক্রিয়াও কিছুটা স্থবির হয়ে পড়েছে।’

তিনি বলেন, ‘সৌদি আরব কয়েক বছর ধরে আমাদের সবচেয়ে স্থিতিশীল শ্রমবাজার। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির কারণে সেখানে কর্মী চাহিদা কিছুটা কমেছে। এটি সাময়িক। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে চাহিদা আবার বাড়বে বলে আমরা আশা করছি।’

শামিম চৌধুরী নোমান বলেন, কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দীর্ঘ মেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়াসহ বন্ধ বা সীমিত শ্রমবাজারগুলো দ্রুত চালু করার পাশাপাশি বিদ্যমান ১০-১২টি প্রধান শ্রমবাজার সচল রাখার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

নোমান বলেন, এখন শুধু বেশি কর্মী পাঠানোর দিকে নয়, দক্ষ কর্মী পাঠানোর দিকে জোর দিতে হবে। দক্ষ কর্মী গেলে তারা বেশি বেতন পাবেন, বেশি রেমিট্যান্স পাঠাবেন। এ জন্য প্রশিক্ষণব্যবস্থাকে সময়োপযোগী করতে হবে। একই সঙ্গে ইন্দোনেশিয়ার মতো উচ্চমূল্যের শ্রমবাজারে প্রবেশের জন্য ভাষা ও দক্ষতায় গুরুত্ব দিতে হবে।

তিনি বলেন, ‘বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য প্রায় ২০ থেকে ২২ লাখ মানুষ প্রস্তুত। কিন্তু বছরে যদি ১০ থেকে ১১ লাখ কর্মী পাঠানো যায়, তাহলে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক বেশি হয়ে যায়। তখন দালালচক্র সক্রিয় হয় এবং অনেকেই অনিয়মিত পথে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করেন।’

নোমান বলেন, শ্রম অভিবাসনের সঙ্গে পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র, অর্থ, কারিগরি শিক্ষা, জনশক্তিসহ একাধিক মন্ত্রণালয় ও সংস্থা জড়িত। তাই একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার নেতৃত্বে আন্ত মন্ত্রণালয় সমন্বয় সেল গঠন করলে মাঠ পর্যায়ের সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব হবে।

সরকারের লক্ষ্য ১৪ লাখ কর্মী বিদেশে পাঠানো : প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর গত ৮ জুন সংসদে জানান, চলতি অর্থবছরে ১৪ লাখ কর্মী বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। তিনি বলেন, দক্ষ ও পেশাজীবী কর্মী পাঠানোর মাধ্যমে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণে কাজ করছে সরকার। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রধান শ্রমবাজারগুলোতে নিয়োগকর্তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, ভিসাপ্রক্রিয়া সহজ করা এবং নতুন বাজার উন্মুক্ত করা না গেলে বিদেশে কর্মসংস্থানের বর্তমান ধীরগতি কাটবে না। এর প্রভাব ভবিষ্যতে শুধু শ্রম অভিবাসন নয়, দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, ‘বাংলাদেশের শ্রমবাজার দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক, বিশেষ করে সৌদি আরবনির্ভর। কিন্তু বিকল্প বাজার তৈরি ও বাজারে বৈচিত্র্য আনার ক্ষেত্রে কাঠামোগত অগ্রগতি তেমন হয়নি। ফলে একটি বড় শ্রমবাজারে ধাক্কা লাগলেই এর প্রভাব পুরো জনশক্তি রপ্তানি খাতে পড়ে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি নতুন বাজার সম্প্রসারণ, দক্ষ কর্মী তৈরি এবং শ্রম কূটনীতি জোরদার না হলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের ঝুঁকি থেকে যাবে।

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram